৩ ডিসেম্বর সাতক্ষীরার বৃহৎ অঞ্চল পাক-হানাদার মুক্ত হয়

অরবিন্দ মৃধা

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অসীম সাহস ও মনোবল নিয়ে মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে। এই যুদ্ধে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের নবম সেক্টরের ভূমিকা এবং গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ সুন্দরবন ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমাগত আক্রমনে হানাদার পাক-বাহিনী ভীতো হয়ে তাঁদের সুরক্ষিত ঘাটি ছেড়ে চূড়ান্ত বিজয়ের অনেক পুর্বেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের মুক্তিবাহিনীর ক্রমাগত আক্রমনে সীমান্ত ঘেষা সাতক্ষীরার শ্যামনগর কালিগঞ্জ দেবহাটা ভোমরা অঞ্চল ৭১ এর ২৩ নভেম্বরের মধ্যে পাক হানাদার মুক্ত হয় এবং ৩ ডিসেম্বর সাতক্ষীরার বৃহৎ অঞ্চল পাক-হানাদার মুক্ত হয়।

নবম সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের দীর্ঘদিনের ভারতীয় ঘাঁটি হাসনাবাদ, টাকী, হিঙ্গলগঞ্জ, শমশেরনগর ছেড়ে নিজদেশের মুক্ত অঞ্চল দেবহাটায় অস্থায়ী অগ্রবর্তী ক্যাম্প ও সদর দপ্তর স্থাপন করতে সক্ষম হয় ৭১ এর নভেম্বরের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি. ওসমানী দেশের সীমান্তবর্তী এই প্রথম মুক্ত অঞ্চল দেবহাটা পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গেছিলেন বঙ্গবন্ধু পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপটেন শেখ কামাল, অভ্যর্থনা জানান, সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ জলিল, ক্যাপটেন নূরুল হুদা সহ অন্যান্য কমান্ডানারগণ।

পরবর্তীতে দেশি-বিদেশী সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের ত্রান ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এম কামরুজ্জামান নিজ মাতৃভূমিতে গঠিত দেবহাটা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ জলিল তাঁর ‘সীমাহীন সমর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘এবার-সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী সাহেব মুক্তাঞ্চল সফল করতে এলেন। তাঁকে আমি রণাঙ্গনের অগ্রবর্তী এলাকায় নিয়ে গেলাম। কতগুলো অসুবিধার জন্য সাতক্ষীরা থেকে আট মাইল দূরে আমাদের থামতে হয়েছিল।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফোর্স হেড কোয়াটার এর (২৩ নভেম্ব^র/৭১) যুদ্ধ বুলেটিং এ উল্লেখ করা হয়েছে, In Khulna Sector Mukti Bahini yesterday captured enemy position at BHOMRA and KHULNA. Fearing to be cutoff the Pakistani Army has vacated Satkhira town. During their raid in Kulia area-Mukti Bahini killed 12 enemy soldiers. (সূত্র: স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র-১১খন্ড, পৃষ্ঠা-১৬০)

এ তথ্য থেকে প্রমাণিত হয় যে এম.এ.জি ওসমানী যখন মুক্তাঞ্চল পরিদর্শন করেছেন তখন শ্যামনগর থেকে কুলিয়া এবং ভোমরা অঞ্চল হানাদার মুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে মেজর জলিল বলেছেন, ‘ক্যাপ্টেন হুদা দীর্ঘ বারো মাইল পথ হেটে (কালিগঞ্জ থেকে) তাঁর বাহিনী সহ মি. শাহজাহানের লোকজনের কাছে পৌঁছে হানাদারদের সম্মুখ থেকে আঘাত হানলো, তখন ওরা পারুলিয়ার দিকে পালাতে শুরু করে।

ওদিকে মি. শাহজাহান হানাদার বাহিনীর একটি দলকে মাঝপথে অবোরধ করে ফেললো।…হানাদাররা সেতু উরিয়ে দিয়ে ওপারে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সেতুর চার মাইল দূরে অবস্থান নিয়ে ক্যাপ্টেন হুদা দ্রুত মি. চৌধুরী ও শাহজাহানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনী ও তাঁর লোকজনের সাথে একত্র করে…সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আটটি কোম্পানিতে বিভক্ত করে। লে: মোহাম্মদ আলী, লে: আহসানউল্লাহ, লে: শচীন্দ্র ও চৌধুরীকে নেতৃতব্রে দায়িত্ব দিয়ে রাতের অন্ধকারে ব্রীজের দিকে (কুলিয়া) অগ্রসর হতে লাগলো।

…২৩ নভেম্বর পারুলিয়া থেকে চার মাইল দূরে আর একটা ব্রিজের পেছনে হানাদাররা সরে গেল। আমাদের সৈন্যরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো।’ এ তথ্য প্রমাণ করে যে ২৩ নভেম্বরের মধ্যে কুলিয়া পর্যন্ত পাক হানাদার মুক্ত হয়। পরবর্তীতে সাতক্ষীরা অপারেশন বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিকল্পনা মোতাবেক হাবিলদার আফজালের নেতৃত্বে দু’শ’ মুক্তিযোদ্ধার একটি দলকে সাতক্ষীরার পথে পাঠিয়ে দিলাম।…তাঁর পর লে: আহসানউল্লাহর নেতৃত্বে দু’শ’ মুক্তিযোদ্ধার একটি দলকে ওই একই পথে পাঠানো হলো।

… ডান দিক থেকে এক’শ মুক্তিযোদ্ধার আর একটি দলকে মি: শাহজাহানের নেতৃত্বে সাতক্ষীরা দৌলতপুর রাস্তায় ওৎপেতে শত্রুকে আঘাত করার জন্য পাঠিয়ে দিলাম। ক্যাপ্টেন হুদাকে বললাম যে, রাতের বেলায় আক্রমনাত্মক পাহারা দিয়ে শত্রুদের উপর চাপ সৃষ্টি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাতক্ষীরা অধিকার এবং তার সৈন্যদের দ্রুত পুণ:গঠন করে পলায়নপর শত্রুদের পিছু ধাওয়া করতে হবে।’ (তথ্য সূত্র সীমাহীন সমর, মেজর এম.এ জলিল)।

এরপর থেকে সাতক্ষীরায় ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। মুক্তি গেরিলারা হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প এবং সাতক্ষীরা-যশোর ও সাতক্ষীরা-খুলনা রাস্তার দুপাশে ব্যাংকারে লুকিয়ে থাকা পাকসেনাদের উপরে বিচ্ছিন্ন ভাবে গাছের আড়াল থেকে, ধান ক্ষেতের মধ্যে থেকে বা কোনো পরিত্যক্ত ঘরবাড়ির আড়াল থেকে বা জলাশায়ে গা ডুবিয়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ ক্রমাগত গেরিলা হামলা চালিয়ে বিশাল দেহধারী পাকসেনাদের একদিকে ভীত সন্তস্ত্র করে তোলে, অন্যদিকে ট্যাংক বিধ্বংসী মাইন পেতে শত্রুদের চলাচল বন্ধ করে দেয়

এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে- In this engagement 3 enemy soldiers including one captain were killed and the jeep was destroyed. SATKHIRA Town is nwo Isolated from the rest of KHULNA District, it is learnt.. (সূত্র: পূবোক্ত, পৃষ্ঠা নং-১৬৩)।

এ পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে সাতক্ষীরার রাজাকাররা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। বাংকারে অবস্থানকারী পাকসেনারা রাজাকারদের সাহায্য পাচ্ছিলনা। অন্যদিকে আট নম্বর সেক্টর সীমানায় মেজর মাহবুবের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী প্রবলভাবে আক্রমন চালিয়ে সাতক্ষীরা অঞ্চলে ঢুকে পড়ে। এমন একটা পরিস্থিতিতে অসহায় পাকবাহিনী সুরক্ষিত বাংকার থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত সাতক্ষীরার এই রণাঙ্গনের খবর সেই সময়ে ভারতের যুগান্তরসহ বিভিন্ন কাগজে এবং রনাঙ্গনে বার্তায় প্রকাশিত হয়। এ অঞ্চলের পাক-সামরিক জান্তারা গেরিলা হামলায় রীতিমতো হিসশিম খেয়ে উঠলো।

এর আগে ১৯ নভেম্বর সুন্দরবনের বৃহৎ অঞ্চলসহ শ্যামনগর হানাদার মুক্ত হয়। ২০ নভেম্বর/৭১ ঈদের দিনে ক্যাপ্টেন নূরুল হুদার নেতৃত্বে প্রচন্ড যুদ্ধের মধ্যেদিয়ে বসন্তপুর, নাজিমগঞ্জ, কালিগঞ্জ অঞ্চল পাক-হানাদার মুক্ত হয়। এই যুদ্ধে পাক বাহিনীর বহু ক্ষয়-ক্ষতি হয়। অস্ত্র গোলাবারুদ ও মজুদ খাদ্য ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ক্যাপ্টেন হুদা মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ করে জয়বাংলা ধ্বনি এবং তোমার নেতা, আমার নেতা শেখ মুজিব; শেখ মুজিব-স্লোগানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। কালিগঞ্জ থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ফোর্স হেড কোয়ার্টার বুলেটিং এ শ্যামনগর এবং কালিগঞ্জ হানাদার মুক্ত হওয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে-

Mukti Bahini is nwo in control of Kaligong on November 19, Mukti Bahini Advanced towards SHYAMNAGAR and after minor exchange of fire Mukti Bahini captured it…

…Mukti Bahini raided the occupation troops position in BASANTAPUR of Kaligong Police Station under Satkhira Sub-division on 20th November. After the whole day fight Mukti Bahini captured BASANTAPUR. On the same day Mukti Bahini continued advancing the occupation troops retreated from Kaligonj. . (সূত্র: পূর্বোক্ত, একাদশ খন্ড, পৃষ্ঠা নং-১৫৯)

২১ এবং ২২ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর বিধ্বংসী আক্রমনে কালিগঞ্জ থেকে আলিপুর পর্যন্ত পাকবাহিনীর যাবতীয় ক্যাম্প ঘাটি গুটিয়ে আলীপুর সংলগ্ন নদীর ব্রিজ পার হয়ে রেজিমেন্টসহ অবস্থান গ্রহণ করে। মুক্তিবাহিনী কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে সাতক্ষীরাকে কেন্দ্র করে গেরিলারা হামলা চালাতে থাকে। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল কোন মাধ্যমে হানাদার সৈন্যরা যদি শুনতে পেতো মুক্তি তাদের ঘিরে ফেলেছে।

তখনই তারা সুরক্ষিত বাংকার থেকে বেরিয়ে কিছু না দেখলেও এলোপাতাড়ি গুলি চালাতো। নবম সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাগণ গেরিলা হামলা এবং বীরত্বের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করে সাতক্ষীরা শহরসহ জেলার বৃহৎ অঞ্চল অর্থ্যাৎ শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনী উপজেলা জল-স্থল-আকাশ সীমা থেকে দখলদার পাকবাহিনীকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছিল। নবম সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাগণ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে ১৬ ডিসেম্বর/৭১, চূড়ান্ত বিজয়কে তরান্মিত করেছেন। মেজর এম.এ জলিল তাঁর সীমাহীন সমর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘আমাদের মুক্তিবাহিনী ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখে সাতক্ষীরা অধিকার করে সাতক্ষীরা-দৌলতপুর রোড ধরে অগ্রসর হতে লাগলো।’

লেখক: প্রবন্ধিক, গবেষক

Please follow and like us:
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)