নিরাপদ খাবার পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন এখন সময়ের দাবী

নিজস্ব প্রতিনিধি:

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আগরদাড়ী, বল্লী, ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়ন, সাতক্ষীরা ও কলারোয়া পৌরসভা ৫৪ টি ওয়ার্ডের প্রায় ৬১,১৫৮ পরিবারের ২৫৭,২৮৫ জন লোক নিরাপদ খাবার পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার সংকটে ভুগছে।

নেদারল্যাণ্ড সরকারের অর্থায়নে, সিমাভীর সহযোগিতায় বেসরকারী সংস্থা উত্তরণ ওয়াশ এসডিজি ওয়াই বাংলাদেশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে জুলাই ২০১৮ থেকে বর্তমান পর্যন্ত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারী বিভিন্ন সেবা প্রদানকারীদের সার্বিক সহযোগিতায় উক্ত এলাকায় নিরাপদ খাবার পানি,স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগে করনীয় বিষয়ে বিভিন্ন ধরণের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

কার্যক্রম পরিচালনার সময় কমিউনিটির নিকট থেকে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারী সেবা প্রদানকারীদের নিকট বিভিন্ন ধরণের চাহিদা যেমন- নিরাপদ খাবার পানি, পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন, কালভার্ট ও পাইপ নির্মাণ, রাস্তা মেরামত, ডাষ্টবিন স্থাপন, ময়লা যত্রতত্র না ফেলা ইত্যাদি বিষয় উত্থাপিত হয়েছে। যা অনেকাংশ পূরণ হয়েছে। কারণ সরকারী বাজেটের তুলনায় কমিউনিটির চাহিদা অনেক বেশী। তবে পর্যায়ক্রমে এই সকল চাহিদা পূরণ হচ্ছে। কারণ পূর্বের তুলনায় বর্তমানে ঐ সকল খাতে বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে অদুর ভবিষ্যতে বাজেট আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে সরকারের প্রো-পুওর স্টাটিজি অনুসারে এখনও অনেক পরিবার আছে যারা দরিদ্র এবং যাদের পক্ষে নিজস্ব অর্থায়নে নিরাপদ খাবার পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন করা সম্ভব নয়। এই সকল ক্ষেত্রে সরকারী বরাদ্দ একান্ত প্রয়োজন। এছাড়াও সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লী এবং ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে ডিপ টিউবওয়েল সাকসেস হয় না। কারণ, মাটির নিচে বড় বড় পাথর রয়েছে যা এই এলাকার ব্যবহৃত মেশিনে ড্রিল করা সম্ভব হয় না। তাই এই এলাকার জন্য বিকল্পভাবে নিরাপদ খাবার পানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা অতীব জরুরী।

বল্লী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ্যাড. মহিতুল ইসলাম জানান, তার এলাকায় খাবার পানির সমস্যা প্রকট। এখানে ডিপ টিউবওয়েল সাকসেস হয় না। খাবার পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবস্থা করতে সরকারি বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরী। উত্তরণ দীর্ঘদিন ধরে অত্র এলাকায় হতদরিদ্র ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে এবং মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি বিভিন্ন এ্যাডভোকেসী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তারা মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে যেখানে ডিপটিউবওয়েল সাকসেস হয় সেখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে খাবার পানি সরবরাহ করলে এলাকার মানুষ আরও বেশী উপকৃত হত এবং নিরাপদ খাবার পানি পান করতে পারতো।

ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ ইদ্রিস আলি বলেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ডিপিএইচই এর মাধ্যমে ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের ওয়ারিয়া গ্রামে একটি রিভার্স অসমোসিস (আর ও) স্থাপন করা হয়েছে যা সাকসেস এবং প্রায় ১৮শ’ থেকে ২ হাজার মানুষ নিরাপদ খাবার পানি পান করতে পারছেন। এছাড়াও সরকারী অর্থায়নে এই এলাকায় রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টার স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকেও অনেক পরিবার নিরাপদ খাবার পানি পান করতে পারছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

ঝাউডাংগা ইউনিয়নের পাথরঘাটা গ্রামের শাহানারা বেগম, গোবিন্দকাটি গ্রামের মর্জিনা বেগম, বল্লীর ভাটপাড়া গ্রামের সামছুন্নাহার বেগম, কুশোডাঙ্গা গ্রামের জেসমিন বেগম, সাতক্ষীরা পৌরসভার বাঁকাল সরদার পাড়ার ফিরোজা বেগম, কাটিয়া গদাইবিলের সাহিদা বেগম, কামালনগরের খাদিজা খাতুনসহ অনেকেই নিরাপদ খাবার পানির সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, আমাদের এলাকায় সরকারীভাবে খাবার পানির কোন ব্যবস্থা নেই। যা আছে তা এক ড্রাম ৩০ টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয় এবং এই অর্থ যোগাড় করা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর।

আগরদাড়ির চুপরিয়া গ্রামের তানিয়া বেগম বলেন, আমাদের অনেক দুর থেকে খাবার পানি আনতে হয় যা কষ্টকর। যেহেতু আমাদের এলাকায় ডিপটিউবওয়েল সাকসেস হয় তাই আমাদের এলাকায় একটি ডিপটিউবওয়েলের ব্যবস্থা করলে প্রায় ৫০ পরিবার নিরাপদ খাবার পানি পান করতে পারবে এবং পানিবাহিত রোগ থেকে মুক্তি পাবে।

তারা আরও বলেন, বেতনা নদী ভরাট হওয়া এবং অপরিকল্পিত মাছের ঘেরের কারণে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতে না পারায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ সময় তারা নিরাপদ খাবার পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সন্মুখীন হয় এবং পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। এই সমস্যা সমাধানে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

উত্তরণ ওয়াশ এসডিজি ওয়াই বাংলাদেশ প্রোগ্রামের প্রকল্প সমন্বয়কারী হাসিনা পারভীন বলেন, এলাকার মানুষের নিরাপদ খাবার পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য আরও বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি এসডিজির ৬নং গোল অর্জনের জন্য সরকারী পদক্ষেপ জরুরী।

তিনি বলেন, অত্র এলাকার খাবার পানি সংগ্রহ করা বিশেষ করে মহিলাদের জন্য বড় ধরণের একটি কঠিন কাজ। এক কলস খাবার পানি সংগ্রহের জন্য ১ থেকে ২ কিমি দূরে যেতে হয়, দীর্ঘলাইনে দাঁড়াতে হয় এবং দিনের একটা বড় অংশের শ্রমঘন্টা ব্যয় হয় এ কাজে। এছাড়া অনেকেই বাধ্য হয়ে আয়রণ, আর্সেনিক ও ইকোলাইযুক্ত টিউবওয়েলের পানি পান করে থাকেন। ফলে তারা পেটের পীড়া, আমাশয়, ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হয়।

তিনি আরও বলেন, উত্তরণ ওয়াশ এসডিজি ওয়াই বাংলাদেশ প্রোগ্রামের ম্যাধ্যমে নিরাপদ খাবার পানি পান করা, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করা, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা করা, দুর্যোগের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ, দুর্যোগের সময় ও পরবর্তী করনীয়, বাল্যবিবাহের কুফল এবং মানুষের প্রাকটিস লেভেল উন্নয়ন করার কমিউনিটিকে সচেতনত করা এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ন্যাপকিন কর্ণার স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের ওয়াশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাকটিস লেভেল উন্নয়ন করার জন্য কাজ করে আসছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মফিজুর রহমান জানান, বল্লী, ঝাউডাঙ্গাসহ কয়েকটি এলাকায় লেয়ার না পাওয়ায় ডিপটিউবওয়েল বসানো সম্ভব হয়ে উঠছেনা। তবে নিরাপদ পানি ও পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা আগের চেয়ে বর্তমানে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।

সাতক্ষীরা পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র কাজী ফিরোজ হাসান বলেন, সুপেয় পানির জন্য যে পাওয়ার ট্রিটমেন্ট প্লান রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় পানি উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে না।

Please follow and like us:
fb-share-icon
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)