আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি ঈশ্বরদী লোকোমোটিভ শেডে

অনলাইন ডেস্ক:

ব্রিটিশ আমলের ম্যানুয়াল ওয়ার্কিং পদ্ধতিতেই চলছে পশ্চিমাঞ্চল রেলের সর্ববৃহৎ ঈশ্বরদী ডিজেলচালিত লোকোমোটিভ রানিং শেডের কার্যক্রম। ১৯২৯ সালে নির্মিত শতবর্ষী এ লোকোমোটিভ শেডে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। তীব্র জনবল সংকট, দুর্ঘটনার শংকা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শ্রমিক-কর্মচারীদের পদোন্নতি স্থগিতের অসন্তোষসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এ লোকামোটিভ শেড।

সরেজমিনে লোকোমোটিভ শেডে গিয়ে দেখা যায়, বৃহৎ এ লোকোমোটিভ শেডে ১২টি ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইঞ্জিনের মেরামত কাজ চলছে। ছয়টি মেরামতের জন্য অপেক্ষমাণ। আর একটি ইঞ্জিন ফুয়েল সংগ্রহের জন্য শেডে অবস্থান করছে। এ লোকোমোটিভ শেডে পাঁচটি ডকপিট রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ডকপিট ব্রিটিশ আমলে নির্মিত অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ডকপিটে একসঙ্গে ৮টি ব্রড গেজ ও একটি মিটার গেজ ইঞ্জিন পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও মেরামত করা যায়।

পুরো লোকোমোটিভ শেডজুড়ে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া চোখে পড়েনি। পুরোনো আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে ইঞ্জিন মেরামতের কার্যক্রম চলছে। এখানে ফ্রগ লিফট, ওভারহেড ক্রেন, হাইড্রোলিক জ্যাক, আধুনিক টুলস অ্যান্ড ইকুইপমেন্টের মতো আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই।

পুরোনো দুইটি ডকপিটের ভেতরে গিয়ে দেখা গেলো দুটি ডকপিটই জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা। ডকপিটের মেঝে ইঞ্জিনের তেল-কালিতে পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই পিচ্ছিল ডকপিটে শ্রমিকরা পড়ে গিয়ে আহত হন। বৃষ্টির দিনে এখানে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে থাকে। তখন ইঞ্জিন মেরামতে ব্যাপক সমস্যা হয়।

এখানে কাজ করতে গিয়ে সম্প্রতি আবদুল্লাহ আল মামুন নামের একজন সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে পা হারিয়েছেন। পুরোনো দুটি ডকপিটে যেকোনো বড় দুর্ঘটনার আশংকা করছেন শ্রমিকরা।

লোকোমোটিভ শেডের অফিস সূত্রে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলের ১০৮টি পাওয়ার ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) রয়েছে। এখানে সেই ইঞ্জিনগুলো পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও মেরামত করা হয়। ১০৮টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৭৪টি সচল রয়েছে। ঈশ্বরদীসহ পশ্চিমাঞ্চলের মোট ছয়টি লোকোমোটিভ শেডে ২১টি ইঞ্জিন মেরামত চলছে। মেরামতের অপেক্ষায় আরও ১৩টি ইঞ্জিন।

এ লোকোমোটিভ শেডে সি, ডি ও ই পদ্ধতিতে (৬, ৮ ও ১৬ ঘণ্টা পরপর রোটেশনারী ইঞ্জিন পরীক্ষা-নীরিক্ষা) ইঞ্জিনের দৈনন্দিন ট্রিপ (ইনকামিং ও আউটগোয়িং) ইন্সপেকশন, প্রাথমিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা, মেরামত, ফুয়েলিং ও পানি সরবরাহ করা হয়।

ঈশ্বরদী লোকোমোটিভ শেডে মোট ৪৯৪ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২৪২ জন। প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিকসহ এখানে ২৫২টি পদ খালি। ২৪ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী এখানে কর্মরত থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র চারজন। লোকোমোটিভ শেডে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের জন্য ওয়ার্কশপ ট্রেনিং ইউনিট (ডব্লিউ টি ইউ) রয়েছে। চারজন প্রশিক্ষকসহ ১০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিপরীতে মাত্র একজন প্রশিক্ষকসহ চারজন কর্মচারী রয়েছেন। লোকবল সংকটের ফলে প্রশিক্ষণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। নতুন শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ না হওয়া ও অবসরজনিতকারণে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা দিন দিন কমেই যাচ্ছে।

লোকোমোটিভ শেডের ফিটার মিস্ত্রি মো. রওশন আলী জাগো নিউজকে বলেন, এই লোকোমোটিভে এত বেশি সমস্যা, কোনটি রেখে কোনটি বলবো বুঝে পাচ্ছি না। এখানে আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই, যা কিছু আছে সবই ব্রিটিশ আমলের। ২০১৫ সালের পর ৮ বছর ধরে এ শেডের কোনো কর্মচারী ও শ্রমিকের পদোন্নতি হয়নি। বেতন বাড়েনি। লোকবল সংকটের কারণে প্রতিটি শ্রমিকের প্রায় প্রতিদিনই ওভারটাইম করতে হয়। ৮ ঘণ্টার ডিউটি কখনো কখনো ১৬ ঘণ্টা এমনকি বেশি চাপের কারণে দিনরাত এক টানা ডিউটি করতে হয়। সাপ্তাহিক ছুটি বলে এখানে কিছু নেই। প্রতিদিনই কাজ করতে হয়। লোকবল সংকট, অধিক পরিশ্রম ও পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েই যাচ্ছে।

লোকো মেকানিক্যাল ফিটার জয়নাল আবেদীন বলেন, আমরা যারা ডকপিটে কাজ করি তারা সব সময়ই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকি। ধোঁয়া, কালি, ডিজেল, কাদা-পানির দূষিত পরিবেশের মধ্যেই দিনরাত কাজ করতে হয়। এছাড়াও নিরাপত্তা ঝুঁকি তো রয়েছেই। কিন্তু আমাদের সুচিকিৎসার তেমন ব্যবস্থা নেই। রেলের হাসপাতালগুলোর ভগ্নদশা। ওখানে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। দূষিত পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের শেষ জীবনে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে হয়। সর্বশেষ এখানকার তিনজন অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে। দূষিত ও নোংরা পরিবেশে কাজ করে আমাদের জীবনের শেষ পরিণতিও হয়তো এমনই হবে।

লোকোমোটিভের ইনচার্জ ও সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী শারেক ইকবাল জাগো নিউজকে বলেন, লোকোমোটিভ শেডের প্রধান সমস্যা লোকবল সংকট। এছাড়াও লোকোমোটিভ শেড আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। ওভারহেড ক্রেন, হাইড্রোলিক জ্যাকসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। এছাড়াও শেডে লাইনের সংখ্যা বৃদ্ধি, পুরোনো ডকপিটের স্থানে নতুন ডকপিট নির্মাণ ও বাউন্ডারি প্রাচীর উঁচুসহ আরও বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।

পাকশী বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) আশিষ কুমার মন্ডল জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে রেলের সর্বোচ্চ উন্নয়ন কাজ চলমান। ঈশ্বরদী লোকোমোটিভ শেডে নতুন দুইটি ডকপিট নির্মাণসহ বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ হয়েছে। আরও কিছু উন্নয়ন কাজ চলমান। লোকোমোটিভ আধুনিকায়নের বিষয়টি রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, লোকবল সংকটের কারণে কাজের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। তবে ছুটির দিনে কাজ করে ও ওভারটাইম করে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এখানে লোকবল নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। লোকবল নিয়োগ হলে সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হয়ে যাবে।

Please follow and like us:
fb-share-icon
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)