কলারোয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট কুণ্ডু পরিবারের জমি আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে হরিলুটের বাতাসা

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা :

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় কুণ্ডু পরিবারের সম্পত্তি যেন আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে হরিলুটের বাতাসা। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট কাগজপত্রের মুলে নেওয়া জমির উপর আদালতে মামলা ও নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও চলছে জবরদখল ও নির্মাণ কাজ। জবরদখলে বাধা দেওয়ায় হামলার শিকার হয়েও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা না পেয়ে তারা নিরাপত্তা-হীনতায় ভুগছেন।

কলারোয়া উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের রণজিৎ কুমার কুণ্ডু জানান, তার জ্যাঠামহাশয় গৌরপদ কুণ্ডুর ছেলে জয়দেব কুণ্ড ও সুজয় কুণ্ডু পৈতৃক সূত্রে ১০০ শতক জমির মালিক। যা বর্তমান প্রিন্ট পড়চায় তাদের নামে রেকর্ড হয়েছে। অথচ স্থানীয় কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে জাল জালিয়াতির মাধ্যকে কাগজপত্র তৈরি করে জয়দেব এর ছেলে সুব্রত কুণ্ডু ২০১১ সালে তাদের দু’ একর ৫৬ শতক জমিসহ ৩ দশমিক ৫৬ একর জমি তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত সহকারি ভূমি কমিশনার) তরিকুল ইসলামের কাছ থেকে জয়দেব কুণ্ডুর নামে নামপত্তন করায়।

ওই জমি নিয়ে জয়দেব কুণ্ডু ২০১২ সালে সাতক্ষীরার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে দেঃ ২৪/১২ পার্টিশান মামলা করলে তার খারিজ হয়ে যায়। একই আদেশে বিচারক রিপতি কুমার বিশ্বাস জয়দেব কুণ্ডুর কাগজপত্র জাল উল্লে­খ করে নিজেই বাদি হয়ে ৪৬৫,৪৬৭,৪৬৮,৪৭১ ধারায় মামলা করেন। কিন্তু মামলা দায়ের করার একদিন আগেই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে ওই জয়দেব জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ৯/১৯ নং আপিল মামলা করে।

জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালত থেকে মামলাটি সরিয়ে প্রথম আদালতে নিয়ে গেলে ওই আদেশ তিনি হাইকোর্টে স্থগিত করেন তিনি(রণজিৎ)। অপরদিকে তিনিসহ তার তিন ভাই বাদি হয়ে এসএ খতিয়ান মুলে নামপত্তন করে নেওয়া উলে­খিত অতিরিক্ত জমি হস্তান্তর ও তার উপর কোন স্থাপনা নির্মাণ না করার জন্য যুগ্ম জজ প্রথম আদালতে দেঃ ৩৯/১৫ মামলা করলে ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর আদালত স্থায়ী রিষেধাজ্ঞা দেয়। একইভাবে নামপত্তন বাতিলের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও পরে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের আদালতে গেলে জয়দেব ওই জমি নিয়ে আদালতে আপিল মামলা দেখিয়ে নামপত্তন খারিজ সংক্রান্ত মামলা স্থগিত করে।

রণজিৎ কুণ্ডু আরো জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে জয়দেব কুণ্ডুকে নামপত্তন করিয়ে দেওয়ার সহযোগিতা করায় নামমাত্র টাকা দিয়ে বা বিনা টাকায় ২১ শতক জমি লিখে নেয় উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহবায়ক কাজী আসাদুজ্জামান শাহজাদা, জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আরাফাত হোসেনের ভাই আমজাদ হোসেন শাহীন ১০ শতক, আওয়ামী লীগ কর্মী মুরারীকাটির তৌহিদ শেখ ১৪ শতক, গোপীনাথপুরের খোদাবক্স সাত শতক, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু ১৪ শতক, গোপীনাথপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম ৬ শতক, একই গ্রামের জাফর পাটনি ১৪ শতক, দাউদ সরদার ৪ শতক মুরারীকাটি গ্রামের উজ্জ্বল গাজী ৮ শতক, ঝিকরার ওমর আলী চার শতক, শুকুর আলী চার শতক আনোয়ার হোসেন চার শতক ও মুজিবর রহমান চার শতক জমি কিনেছেন বলে পরে তারা জানতে পারেন।

সব মিলিয়ে রণজিৎ কুণ্ডু ও তার সহোদরদের দু’কোটি টাকার সাড়ে চার বিঘা জমি বেদখল করেছে ওই চক্রটি। কাজী শাহাজাদা, আমজাদ হোসেন, তৌহিদ, জাফরসহ কয়েকজন আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত জমিতে জোরপূর্বক পাকা স্থাপনা নির্মাণ শুরু করলে তারা বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জয়দেতব কুণ্ডুর গোয়াল ঘরে পরিকল্পিত আগুন দেওয়ার নাটক করে তাকেসহ ছয় জনের নামে মামলা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই মামলা খারিজ হয়ে যায়। মিথ্যা মামলা দায়ের করায় সুব্রত কুণ্ডুর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন যাহা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

এ হেন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টু ওই দাগে জয়দেবের শতক জমি থাকলেও ১৪ শতক দখলে নিয়ে সেখানে পানের বরজ করেছেন। যুবলীগ নেতা শাহাজাদা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ কাজ অব্যহত রেখেছে। জয়দেবের কাছ থেকে শ্মশানের পাশের জায়গা নিয়ে তাদের রাস্তার পাশের জায়গায় পাকা ভবন বানিয়ে তাতে নামাজের স্থান ও নবজীবন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে আমজাদ হোসেন শাহীন। একইভাবে রবিউল ইসলাম, ওমর আলী, শুকুর আলী, তৌহিদ, জাফরসহ কয়েকজন নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে পাকা ভবন নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

মুজিবর রহমান জোরপূর্বক ঘর বানানোর চেষ্টা করলে থানায় অভিযোগ করলে রোববার থানায় বসাবসি হলে সে কোন কাগজপত্র দেখাতে না পারলেও পুলিশ কোন ভূমিকা না রাখায় আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম লাল্টুর সহযোগতিায় সোমবার ঘর বানানোর চেষ্টা চালায়। সোমবার সকালে মুজিবর ও আমান ডাক্তার সন্ত্রাসী ফজলু, কালু শেখসহ কয়েকজনকে নিয়ে জমি দখল করতে আসছে এমন খবর পেয়ে বিষয়টি সাংসদ অ্যাড. মুস্তাফা লুৎফুল্লাহকে অবহিত করা হলে তিনি বিষয়টি সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারকে তাৎক্ষণিক অবহিত করেন।

এরপরও পুলিশ না আসায় একই সাথে আমান ডাক্তারও তাদের জমিতে জোরপূর্বক মাটি ফেলে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে ভাই রবিন ও তার স্ত্রী পপি, অরবিন্দ কুণ্ডু ও অপর্ণা কুণ্ডুকে পিটিয়ে জখম করে জবরদখলকারিরা। স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে কলারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এ ঘটনায় তার ভাই রবিন কুণ্ডু বাদি হয়ে সোমবার থানায় এজাহার দায়ের করলেও মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা নেয়নি পুলিশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুজিবর রহমান ও আমান ডাক্তার জানান, তারা টাকা দিয়ে জয়দেবের কাছ থেকে জমি কিনেছেন তাই সেখানে ঘর শুরু করেছেন। এতে বাধা দেওয়ায় কুণ্ডু বাড়ির কয়েকজনের সাথে তাতের হাতহাতি হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম লাল্টুর কথা মত ঘর করছেন বলে জানান তারা।

সুব্রত কুণ্ড আওয়ামী লীগ নেতারা তার সঙ্গে আছেন দাবি করে জানান, তার বাবার নামে নামপত্তন ও খাজনা অনুযায়ি বিক্রি করেছেন। আদালতের রায় বিপক্ষে গেলে তখন কি হবে সেটা দেখা যাবে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টু জানান, রণজিৎ কুণ্ডুর সঙ্গে কথা বলে জয়দেব এর প্রায় ১৪ শতক পৈতৃক জমি কিনে চার দাগের স্থলে একদাগে দখলে নিয়ে পানের বরজ করছেন। তিনি কাউকে জমি জবরদখল করতে বলেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ তার নাম ভাঙালে কিছু করার নেই।

যুবলীগ নেতা কাজী আসাদুজ্জামান শাহজাদা বলেন, কাগজপত্র মুলে জমি কিনে সেখানে বাড়ি করছেন। একই ভাবে কথা বলেন আওয়ামী লীগ কর্মী আমজাদ হোসেন শাহীন।

কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর খায়রুল কবীর জানান, রবিন কুণ্ডুর এজাহার পেয়ে তদন্তের জন্য উপপরিদর্শক মাসুদকে পাঠানো হয়েছিল। তার সঙ্গে কথা বলার পর মামলার বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরার তালা-কলারোয়া-১ আসনের সাংসদ অ্যাড. মুস্তাফা লুৎফুল্লাহ জানান, গোপীনাথপুরের রণজিৎ কুণ্ডু ও তার কয়েক ভাই তাদের জমি জবরদখলের অভিযোগ এনে তার কাছে এসেছিলেন। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বলেছিলেন। পরবর্তীতে তাদের উপর হামলা হয়েছে শুনেছেন। তবে মামলা হয়েছে কিনা তিনি জানেন না।

Please follow and like us:
fb-share-icon
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)