শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ

0
74

আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাঙালি জাতির জীবনে একটি স্মরণীয় ও কলঙ্কের দিন। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী নিধনের মর্মন্তুদ স্মৃতিঘেরা বেদনাবিধূর একটি দিন। বাঙালির মেধা-মনন-মনীষা শক্তি হারানোর দিন আজ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস রক্তগঙ্গা পেরিয়ে গোটা জাতি যখন উদয়ের পথে দাঁড়িয়ে, ঠিক সেই সময়ই রাতের আঁধারে পরাজয়ের গ্লানিমাখা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে হত্যা করে। বিজয়ের মাত্র দুইদিন আগে এই দিনে দেশকে মেধাশূন্য করার পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে ঘর থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বাঙালি জাতির সেরা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ দেশের বরেণ্য কৃতী সন্তানদের।

খুনিদের মূল লক্ষ্য ছিল লড়াকু বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করলেও যেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু, দুর্বল ও দিকনির্দেশনাহীন হয়ে পড়ে। মেধা ও নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়লে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না-এমন নীল-নকশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই হায়েনারা বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল।

গোটা বাঙালি জাতি আজ গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে দেশের শহীদ কৃতী সন্তানদের। আজ শোকাহত মানুষের ঢল নেমেছে সেদিনের সেই হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিবিজড়িত রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিস্তম্ভে। অর্পণ করা হচ্ছে পুষ্পার্ঘ্য। দেশের সর্বত্র আজ জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। শোকের প্রতীক কালো পতাকাও উড়বে। রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় নেয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী।

এদের মধ্যে রয়েছেন ড. জি সি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দীন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমেদ লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, নতুন চন্দ্র সিংহ, আর পি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, হাবিবুর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীন, সায়ীদুল হাসানসহ আরো অনেকে।

সে সময়ের এই কৃতী বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকা তুলে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র ক্যাডার কুখ্যাত আলবদর ও আল শামস বাহিনীর হাতে। পেছন থেকে মদদ যোগান পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্বে থাকা পাক জেনারেল রাও ফরমান আলী। ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত সে তালিকা ধরে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘৃণ্যতম অপকর্মটি করে এ ঘাতক চক্র। সান্ধ্য আইনের মধ্যে রাতের আঁধারে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বিজয় অর্জনের পর স্বাধীন বাংলাদেশে রায়েরবাজার, মিরপুরসহ কয়েক জায়গায় পাওয়া যায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ক্ষতবিক্ষত বিকৃত লাশ। পৃথিবীর অনেক জাতি যুদ্ধ করে, অনেক জীবন ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে; কিন্তু এত প্রাণ কোনো জাতিকে দিতে হয়নি।

স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ চার দশক পর বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী হিসেবে বেশ কয়েকজনের বিচারের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরা হলেন মতিউর রহমান নিজামী, গোলাম আযম, চৌধুরী মইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান। গোলাম আযম ছাড়া সবার ফাঁসির রায় হয়েছে। ফাঁসির আসামি চৌধুরী মইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান পলাতক রয়েছেন। জানা গেছে, চৌধুরী মইনুদ্দীন যুক্তরাজ্য এবং আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক রয়েছেন। এদিকে মানবতাবিরোধী হত্যা মামলায় দণ্ডিত বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম হোতা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়েছে। এছাড়া বুদ্ধিজীবী হত্যার আরেক হোতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।

এদিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। তাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারবগের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথকে অনুসরণ করে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সমাজ গড়তে পারলেই তাদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মহান ত্যাগকে স্মরণ করে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতামুক্ত জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, সুখী সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হব।’ তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ইতোমধ্যে অধিকাংশ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত বাকি যুদ্ধাপরাধীদের রায়ও কার্যকর করা হবে।

জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে সকলকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।