তালায় কোটি টাকা গ্রাহক প্রতারণা সুধীন ও এলিটকে গ্রেপ্তার করে টাকা ফেরতের দাবি গ্রাহকদের

রঘুনাথ খাঁ:

ডাক বিভাগের সাতক্ষীরার তালা শাখা ব্যবস্থাপক সুধীন বৈদ্য ও ব্যাংক এশিয়া লিঃ সাতক্ষীরা শাখার তালা ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রের এজেন্ট মোঃ আতাউর রহমান এলিটের বিরুদ্ধে ডাক বিভাগের গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংক এশিয়া সাতক্ষীরা শাখার পক্ষ থেকে আতাউর রহমান এলিটকে পলাতক দেখিয়ে মামলা দেওয়া হলেও সুধীন বৈদ্যর নাম বাদ দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তালা উপজেলার গোপালপুর সরকারি প্রাথািমক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা ও ঘোনা গ্রামের অপর্ণা রানী পাল জানান, ২০২১ সালের ২৪ আগষ্ট ডাক বিভাগের তালা শাখা ব্যবস্থাপক সুধীন বৈদ্যের কাছে তিনি এক লাক টাকার স য়পত্র কিনতে যান। সুধীন বৈদ্য টাকা জমা না নিয়ে ব্যাংক এশিয়া লিঃ এর তালা ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রের এজেন্ট মোঃ আতাউর রহমান এলিটের কাছে জমা দিতে বলেন। একপর্যায়ে এলিটকে অফিসে ডেকে এনে টাকা নিজে নিয়ে এলিটের হাতে দেন। মাসিক এক হাজার ১১৬ টাকা মুনাফা দেওয়ার কথা উলে­খ করে এলিট তার কাছে একটি ১০০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০২২ সালের পহেলা মার্চ ও ৯ জুলাই এক লাখ টাকা করে একই প্রক্রিয়ায় আরো দুই লাখ টাকা জমা দেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত জমাকৃত টাকার অনুকুলে এলিট তার অফিস থেকে লাখ প্রতি এক হাজার ১১৬ টাকা করে তাকে মুনাফা দেন। মুনাফা দেওয়ার সময় একটি মেশিনে আঙুলের ছাপ নেয় এলিট। পরে তিনি জানতে পারেন তার কোন টাকা পাস বইতে জমা করা হয়নি। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের মাধ্যমে জানতে পেরে ১৬ ফেব্র“য়ারি ব্যাংক এশিয়া লিঃ সাতক্ষীরা শাখার এজেন্ট ব্যাংকিং এর জেলা ব্যবস্থাপক মোঃ শরাফাত হোসেন ও কর্মকর্তা মোঃ অহিদুজ্জামানের সামনে তালায় ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রে দেখা করেন। সুধীন বৈদ্য ও আতাউর রহমানের যোগসাজসে তিনি প্রতারিত হয়েছেন মর্মে ওই ব্যাংক কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। ৭ মার্চ তিনি আতাউর রহমান এলিটের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন। বিষয়টি অবহিত করেন তালা উপজেলা চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমারের কাছে।

তালা উপজেলার সাহাপুর গ্রামের হারুণ শেখের স্ত্রী ও তালা পোষ্ট অফিসের ঝাড়–দার সুফিয়া খাতুন বলেন, গত ৮ ফেব্র“য়ারি মেয়াদউত্তীর্ণ এফডিআর এর আট লাখ ২৭ হাজার ৩০০ টাকা তালা পোষ্ট অফিস থেকে উত্তোলন করেন। ওই টাকা নতুন করে আবার পোষ্ট অফিসে রাখতে চাইলে পোষ্ট মাষ্টার সুধীন বৈদ্য বলেন, দুই লাখ টাকার বেশি একসাথে পোষ্ট অফিসে জমা নেওয়া হয় না। তাই দুই লাখ পোষ্ট অফিসে ও বাকী সাত লাখ টাকা ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রে জমা দেওয়ার কথা বলে এলিটকে ডেকে সাত লাখ টাকা তার হাতে তুলে দেন। পাস বই চাইলে ৫ দিন পর দেওয়ার কথা বলে এলিট। ১৫ ফেব্র“য়ারি পাওয়া পোষ্ট অফিসের পাস বইয়ে প্রথমবারের মতো জমা দুই লাখ টাকা উলে­খ থাকায় তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েন। একপর্যায়ে ২৩ ফেব্র“য়ারি এলিট স্বপরিবারে পালিয়ে গেছে মর্মে তিনি জানতে পারেন। ২৭ ফেব্র“য়ারি পোষ্ট মাস্টার বলেন, চিন্তা করো না এলিটের বাবা শফিকুল তোমাদের টাকা দেবে। পরদিন পোষ্ট মাষ্টার সুধীন বৈদ্য বাগেরহাটে বদলী হয়ে গেছে মর্মে তিনি জানতে পারেন। এখন সুধীন বৈদ্য আর ফোন রিসিভ করেন না।

চরগ্রামের ফারজানা খ্তাুন জানান, মা আলেয়া খাতুনের নামে তালা পোষ্ট অফিসে তিন বছর মেয়াদে পৃথক সময়ে সাত লাখ ৭০ হাজার টাকার তিনটি বই খোলেন। গত ৫ ফেব্র“য়ারি মেয়াদ উত্তীর্ণ দুটি বইয়ের সাত লাখ টাকা তুলে আবার এফডিআর করার জন্য পোষ্ট মাষ্টারকে বলেন। পোষ্ট মাষ্টার দুই লাখ টাকা তার অফিসে জমা করে বাকী ৫ লাখ টাকা ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রের এজেন্ট এলিটকে ডেকে তার হাতে তুলে দেন। ১৮ ফেব্র“য়ারি এলিট পারিয়ে গেছে মর্মে তিনি জানতে পারেন। ২৩ মার্চ তিনিসহ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা ডিজিটাল ডাক কেন্দ্র ঘেরাও করেন।

গোনালী নলতার অনিতা বিশ্বাস জানান, পোষ্ট অফিস থেকে মেয়াদ শেষে গত বছরের ১৬ মে পাওয়া নয় লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে আবার তিন বছর মেয়াদী বই করতে চাইলে, পোষ্ট মাষ্টার সুধীন বৈদ্য দুই লাখ টাকা জমা করতে বলে বাকী টাকা ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রের এজেন্ট এলিটের কাছে জমা দিতে বলেন। পোষ্ট অফিসে ডেকে এনে এলিটের কাছে আট লাখ টাকা তুলে দেন সুধীন বৈদ্য। ২২ মে নকল জমা স্লিপ ও গত বছরের ২০ ফেব্র“য়ারি ব্যাংক এশিয়ার তিন লাখ টাকার একটি চেক দেয় এলিট। ব্যাংকে নিয়ে কোন টাকা পাওয়া যায়নি। এরপর তিনি জানতে পারেন এলিট স্বপরিবারে পালিয়ে গেছে। একইভাবে হরিশ্চন্দ্রকাটি গ্রামের মান্নান গাজী ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি পোষ্ট অফিসে এক লাখ টাকা ও তার স্ত্রী কামেলা ওই বছরের ২৫ মার্চ তিন লাখ ৭০ হাজার ৭৫০ টাকা, ১২ জুলাই ৩০ হাজার টাকা পোষ্ট অফিসে রাখতে এলে পোষ্ট মাষ্টার সুধীন বৈদ্য এর কথামত এলিটের হাতে তুলে দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। দোহার গ্রামের কাদের শেখের ছেলে সোহাগ ও আসমা তালা পোষ্ট অফিস থেকে মেয়াদ শেষে তোলা তিন লাখ ৯০ হাজার টাকার সঙ্গে ১০ হাজার টাকা যুক্ত করে গত ৮ ফেব্র“য়ারি পোষ্ট অফিসে জমা করতে বলেন সুধীন বৈদ্যকে। জোরালো আপত্তির একপর্যায়ে যুক্ত করে গত ৮ ফেব্র“য়ারি পোষ্ট অফিসে জমা করতে বলেন সুধীন বৈদ্যকে। জোরালো আপত্তির একপর্যায়ে তিন লাখ টাকা জমা করে এক লাখ টাকা ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রের এজেন্ট এলিটের হাতে তুলে দেন। এ ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা তারা প্রতারিত হয়েছেন।

এভাবে তিন বছর মেয়াদী এফডিআর করতে এসে পোষ্ট মাষ্টার সুধীন বৈদ্যের মাধ্যমে এলিটের জাল স য়পত্রের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা প্রতারিত হয়েছেন তালা মুক্তিযোদ্ধা কলেজের এক হিন্দু শিক্ষক দম্পতি, সাত লাখ টাকা প্রতারিত হয়েছেন গোপালপুরের উজ্জল হরি, গোনালী নলতার যমুনা বিশ্বাস ৩০ হাজার ১০০ টাকাসহ ৩৫/৪০ জন সুধীন বৈদ্য ও এলিটের যোগসাজসে পোষ্ট অফিসের গ্রাহক এক কোটি টাকারও বেশি প্রতারিত হয়েছেন। গত বৃহষ্পতিবার ব্যাংক এশিয়ার দুই কর্মকর্তা এসে ডিজিটাল ডাক কেন্দ্রে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংক এশিয়া কর্তৃপক্ষ থানায় যে মামলা করেছেন তাতে তালা পোষ্ট অফিসের ম্যনেজার সুধীন বৈদ্যের নাম নেই। এটা পরিকল্পিত। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে টাকা জমা নিয়ে এলিট আত্মসাৎ করেছে জানতে পেরেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে মামলা করেছে।

এ ব্যাপারে তালা পোষ্ট অফিসের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক মধুসুধন বাছাড় বলেন, ২৮ ফেব্র“য়ারি সুধীন বৈদ্য বাগেরহাটের চিতলমারি পোষ্ট অফিসে যোগদান করেছেন। তবে সুধীন বৈদ্যের বিরুদ্ধে অনেক গ্রাহক তার কাছে প্রতিনিয়ত অভিযোগ নিয়ে আসছেন বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে আতাউর রহমান এলিটের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

তালা পোষ্ট অফিস থেকে চিতলমারিতে সদ্য বদলী হওয়া সুধীন বৈদ্য এর সঙ্গে সোমবার দুপুর ১২টায় মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। একই সময়ে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে এশিয়া ব্যাংক সাতক্ষীরা শাখার জেলা ব্যাংকিং এজেন্ট মোঃ শরাফাত হোসেন ফোন ধরেননি। তবে তারই সহযোগি কর্মকর্তা অহেদুজ্জামান ফোন রিসিভ করার পর সাংবাদিক পরিচয় জেনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চৌধুরী রেজাউল করিম জানান, ১২ জনের ৪৮ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রতারণার অভিযোগে ব্যাংক এশিয়া লিঃ এর এজেন্ট ব্যাংক ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার মোঃ সরাফাত হোসেন বাদি হয়ে গত ১৬ মার্চ এজেন্ট আতাউর রহমান এলিট, ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী রারুইহাটির নাজমুল বিশ্বাস ও জেঠুয়া গ্রামের টুটুল দেবনাথকে আসামী করে একটি প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন। নাজমুল ও টুটুলকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। এলিটকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।#

Please follow and like us:
fb-share-icon
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)