ঢাকা, সোমবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং | ১৪ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ কমানোর নেপথ্যে রহস্যময় বিকাশ এজেন্টরা

দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ কমানোর নেপথ্যে রহস্যময় বিকাশ এজেন্টরা

0
73

হুন্ডির কারবারে জড়িত সাত বিকাশ এজেন্টকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, সন্দেহভাজন লেনদেনে জড়িত দুই হাজার ৮৮৬ জন বিকাশ এজেন্টের তথ্য পাওয়ার পর ২৫ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের লেনদেন বেশি সন্দেহজনক। গত বুধবার রাজশাহী, পাবনা ও চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা সাতজন শনাক্তকৃতদের তালিকাভুক্ত।

সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট (সংঘবদ্ধ অপরাধ দল) তথ্য পেয়েছে যে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হুন্ডিতে অর্থ পাচারের জন্য দেশে ও বিদেশে একই সঙ্গে কাজ করছে সংঘবদ্ধ চক্র। তারা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দেশে স্বজনদের স্থানীয় মুদ্রায় সেই অর্থ পরিশোধ করছে। তারা সেটা করছে বিকাশের মাধ্যমে। সরাসরি লেনদেন ঝুঁকিপূর্ণ মনে করায় হুন্ডিচক্র মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যম বিকাশের ক্যাশ-ইন পদ্ধতিতে লেনদেন করছে। বিদেশ থেকে চক্রের সদস্যরা ইলেকট্রনিক বার্তা পাঠালে দেশে থাকা সহযোগীরা নির্দিষ্ট এজেন্টের মাধ্যমে ক্যাশ-ইন করে টাকা দেয়। গভীর রাতে বিকাশে লেনদেন নিষিদ্ধ হলেও অসাধু এজেন্টরা ওই সময়ই কাজ করছে।

সিআইডি গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে লেনদেনের তালিকা, মোবাইল ফোনসহ কিছু আলামত জব্দ করেছে। রাতে বিকাশে লেনদেন করা ৬০টি ক্যাশ-ইন মেশিনও শনাক্ত করেছেন সিআইডির তদন্তকারীরা। বিকাশে হুন্ডি করা চক্রগুলো সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বেশি সক্রিয়। গ্রেপ্তারকৃত বিকাশ এজেন্টরা রাজশাহী, মাদারীপুর, পাবনা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি এলাকায় কাজ করে।
এর আগে গত মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া থেকে বিকাশ এজেন্টসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের পর সিআইডি বলেছে, গ্রেপ্তারকৃতরা বিকাশের মাধ্যমে ইয়াবা বিক্রির টাকা লেনদেন করত। তারা সেই ইয়াবা কারবারি চক্রেও জড়িত।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্ল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ায় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল সিআইডির কাছে। সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট প্রতিবেদনটি বিস্তারিত অনুসন্ধান করে জানতে পারে, একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র রেমিট্যান্স কমানোর পেছনে কাজ করছে। এ চক্রের কারণে সঠিক নিয়মে বিদেশ থেকে অর্থ না আসায় সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব থেকে। চক্রের কিছু সদস্য বাংলাদেশে এবং কিছু সদস্য বিদেশে অবস্থান করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে তা অবৈধ পথে বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুদ্রায় পরিশোধ করছে। বিকাশের নিয়ম অনুযায়ী, গভীর রাতে কোনো লেনদেন করা যায় না। তবে বিকাশে শতভাগ ক্যাশ-ইনের মাধ্যমে তারা গভীর রাতেও লেনদেন করছে। যেসব বিকাশের ক্যাশ-ইন হচ্ছে তার মধ্যে ৬০টির মতো মেশিন পেয়েছে সিআইডি।
নজরুল ইসলাম আরো বলেন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ থেকে ইলেকট্রনিক বার্তায় বাংলাদেশে জানানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম, পাবনা বা মাদারীপুরে টাকা পাঠাতে হবে বলে বেশি বার্তা আসছে। হুন্ডি দলের কিছু সদস্য এরপর প্রবাসীদের স্বজনদের দেশে বিকাশ অ্যাকাউন্টে ক্যাশ-ইনের মাধ্যমে টাকা পাঠায়। এর ফলে বিদেশ থেকে সরাসরি টাকা বাংলাদেশে না আসায় রেমিট্যান্স কমছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যসহ লেনদেনে।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকে সারা দেশে দুই হাজার ৮৮৬ বিকাশ এজেন্টের বিরুদ্ধে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ২৫ এজেন্টের নম্বর থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা অবৈধভাবে লেনদেন হয়েছে বলে জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএফআইইউ একটি প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে শনাক্ত করা বিকাশ এজেন্টের মধ্যে ২৫ জনকে নিয়ে তদন্ত শুরু করে সিআইডি। তদন্তে নেমে আট এজেন্টকে শনাক্ত করে তারা। তাদের বিরুদ্ধে আটটি মামলা দায়ের করা হয়। অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাবনার আমিনপুরের বাঘলপুরের মানোয়ার হোসেন মিন্টু (২৯) নামের এক এজেন্ট সটকে পড়ে। অন্যদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলো রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাদারপুরের আব্দুল মান্নান (৩০), পাবনার ডাঙ্গগুরার সংগীত কুমার পাল (৪৫), একই জেলার সাঁথিয়ার হাড়িয়া গ্রামের জামিনুল হক (৩৮), আমিনপুরের মোজাম্মেল মোল্লা (৩৩), সারাসিয়ার হোসেন আলী (৪৫), চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার দিদারুল হক (৩১) ও আবু বকর সিদ্দিক (৫০)।
জানা গেছে, বাংলাদেশে এখন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিলেও এই খাতের বড় অংশের লেনদেন ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিকাশের মাধ্যমে হয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির এক লাখ ৮০ হাজার এজেন্ট রয়েছে। সব ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট রয়েছে পাঁচ লাখের বেশি।
ইয়াবা কারবারের লেনদেনও বিকাশে :
সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, গত মঙ্গলবার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন আল আজাদের নেতৃত্বে একটি দল মিরপুরের শেওড়াপাড়া থেকে বিকাশ এজেন্ট স্বপন ও সালাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে। স্বপনের কাছ থেকে ১০টি মোবাইল ফোন, ১৭টি সচল সিম কার্ডসহ মোট ১৯টি সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে। যার সবই বিকাশের অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্ল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ২৯ আগস্ট কক্সবাজারের টেকনাফ থানায় দায়ের করা মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত শুরু করে দুজনকে শনাক্ত করে সিআইডি। ওই মামলার আসামি নুরুল হক ওরফে ভুট্টো (৩২) নামের এক ইয়াবা কারবারি। তার সঙ্গে যোগসাজশে ইয়াবা কারবারের টাকা লেনদেন করত বিকাশ এজেন্ট স্বপন। ভুট্টো বাহকদের মাধ্যমে আফজাল হোসেন ইমন (গ্রেপ্তারকৃত সালাউদ্দিনের বাবা) নামের আরেকজনের কাছে দীর্ঘদিন টেকনাফ থেকে ইয়াবা বিক্রি করে আসছে। আফজাল হোসেন ইমন মাদকের টাকা তার ছেলে সালাউদ্দিনের মাধ্যমে বিকাশ এজেন্ট আসামি স্বপনের কাছে পাঠাত। স্বপন তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে টেকনাফের বিকাশ এজেন্টের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাত, যা পরবর্তী সময়ে নুরুল হক ওরফে ভুট্টো উত্তোলন করত।
মোল্ল্যা নজরুল আরো জানান, বিকাশ এজেন্ট স্বপনের বিকাশ অ্যাকাউন্টে প্রায় ১০ লাখ ৩০ হাজার ২০ টাকা লেনদেন হয়েছে।