হলোনা মিলনমেলা! ইছামতিতে অশ্রুসিক্ত নয়নে দেবী দূর্গাকে বিসর্জন দিল সনাতন ধর্মাবলম্বীরা

মোমিনুর রহমান:

দেবী দূর্গার বিসর্জনকে ঘিরে বিজয়া দশমীতে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী ইছামতি নদীতে যুগ যুগ ধরে অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশ-ভারত দুদেশের ঐতিহাসিক মিলনমেলা এবারও করোনা পরিস্থিতিসহ নানা জটিলতায় পন্ড হয়ে গেছে। ফলে ইছামতি নদীর দু পাড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে অবশেষে সন্ধ্যার পর অশ্রুসিক্ত নয়নে দেবী দূর্গাকে বিদায় জানিয়েছেন প্রতিবেশী দুই দেশের অপেক্ষমান হাজার হাজার মানুষ।

প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে সোমবার সকাল থেকে ইছামতির দুপাশে স্ব স্ব সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। এরআগে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে ইছামতি নদীর বাংলাদেশ অংশে এবছর কোনো প্রতিমাবাহী কিংবা মানুষবাহী নৌকা চলাচল করবে না বলে জানিয়ে দেয় বিজিবি। পাশাপাশি বেলা বাড়ার সাথে সাথে ইছামতি নদীর নোম্যান্স ল্যান্ডে দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সিদ্ধান্তে সারিসারি নৌকা দিয়ে ভাসমান ব্যারিকেড দেয় বিএসএফ। শুধু তাই নয়, নদীর স্ব স্ব সীমারেখায় স্পিডবোর্ট ও অন্যান্য নৌযানে টহল জোরদার করে বিজিবি ও বিএসএফ।

এদিকে দুপুরের মধ্যেই ইছামতির বাংলাদেশ ও ভারতের দু পাড়েই জমতে থাকে গেল কয়েক বছরের মতো মিলন মেলার আশায় নদী তীরে আসা দু দেশের হাজার হাজার উৎসুক মানুষের ভিড়।

একপর্যায়ে দুপুরের পর ইছামতি নদীর ভারতের টাকী ও আশপাশের এলাকা দিয়ে সেদেশের কিছু প্রতিমাবাহী ও মানুষবাহী নৌকা নদীতে নামতে পারলেও, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র কঠোর অবস্থানের কারনে বাংলাদেশ অংশে নামতে পারেনি কোনো নৌকা। কেবলমাত্র প্রতিমা বিসর্জনের সংবাদ সংগ্রহের জন্য দেবহাটা প্রেসক্লাবের সংবাদকর্মীদের একটি নৌকাকে স্বল্প সময়ের জন্য ইছামতি নদীতে নামার অনুমতি দেয় বিজিবি। অন্যদিকে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য ইছামতি নদীর বেড়ীবাধ থেকে শুরু করে মোড়ে মোড়ে দেবহাটা থানা পুলিশের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো।

একপর্যায়ে ঘন্টার পর ঘন্টা নদীতে নৌকা ভাসানের অপেক্ষায় বেড়িবাধে দাড়িয়ে থাকার পর সন্ধ্যায় অশ্রুসিক্ত নয়নে ইছামতি নদীতে দেবী দূর্গার প্রতিমা বিসর্জন শেষে হতাশ হয়ে ঘরে ফেরে দুই বাংলার হাজার হাজার মানুষ।

বিগত কয়েক বছর ধরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে স্ব স্ব সীমারেখায় দুই বাংলার দূর্গা প্রতিমা বিসর্জন এবং ভাসমান ব্যারিকেডের দুপাশে উভয় দেশের মানুষের কিছুটা হলেও আনন্দ উৎসব অনুষ্ঠিত হলেও, এবছর মহামারী করোনা পরিস্থিতি এবং সীমান্ত সংশ্লিষ্ট না জটিলতার কারনে সেটুকুও প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে বললে চলে। এতে করে ্উভয় দেশের সবচেয়ে বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা বিসর্জনাস্থল দেবহাটার ইছামতি নদী দশমীর দিনে দু দেশের অজস্র মানুষের হতাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে।

যুগযুগ ধরে চলে আসা দেবী দূর্গার বিসর্জনকে ঘিরে ইছামতি নদীতে দুদেশের মানুষের এই মিলন মেলা দেশ বিভক্তির পরও বন্ধ হয়নি। কিন্তু বিগত কয়েক বছর আগে প্রতিমা বিসর্জনের সময় ভারতের এক শিক্ষক গবেষকের সলীল সমাধি এবং তৎপরবর্তী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে এবং এক দেশ থেকে অন্যদেশে অবৈধ পারাপার, সন্ত্রাসী, পলাতক আসামী, দৃষ্কৃতিকারীদের অবাধ যাতায়াতসহ নিরাপত্তা জনিত বিভিন্ন বিষয় মাথায় নিয়ে মিলনমেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় দুদেশের প্রশাসন। যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠিন সিদ্ধান্তে বিগত প্রায় ৬/৭ বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে প্রতিবেশী দেশ দুটির লাখো মানুষের কাঙ্খিত ঐতিহ্যবাহী মিলন মেলা।

Please follow and like us:
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)