ইতিহাসের এইদিনে নির্মম গণহত্যার কালোরাত

পৃথিবীর ইতিহাসে নির্মম গণহত্যার কালোরাত ২৫ মার্চ। ১৯৭১ সালের এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুধু রাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হত্যাকাণ্ড ছিল না। এটা ছিল মূলতঃ বিশ্ব সভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক জঘন্যতম গণহত্যার সূচনা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই গণহত্যার কাহিনী পৃথিবীর সব জঘন্যতম নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে। 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ সব বর্ণনা দিয়ে সচিত্র তুলে ধরেছেন অনেক প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিভিন্ন লেখক, কবি-সাহিত্যিক, বিশ্বের অনেক সুনামধন্য সাংবাদিকরা।

অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিলো। সেখানে লেখা হয়েছিল- শুধুমাত্র পঁচিশে মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। পরবর্তী নয় মাসে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে ৩০ লাখ নিরাপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পূর্ণতা দিয়েছিল সেই বর্বর ইতিহাসকে।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ রাত সর্ম্পকে লিখেছেন, সে রাতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সৈন্যরা চলাতে থাকলো হত্যাযজ্ঞ। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট। লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক- শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।

এই গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকারের প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তনের সঙ্কট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।’

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ২৫ মার্চ কালোরাতে নিরহ বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। চলে নির্মম গণহত্যা। যা সভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক গণহত্যা। সেই হানাদার বাহিনী বাঙালির কাছে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হয়েছে।

১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বাঙালিরা আশা করেছিল ক্ষমতার পালাবদল হবে। আওয়ামী লীগ ছয় দফা অনুসারে সরকার গঠন করবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান পিপিপি (পাকিস্তান পিপলস পার্টি)-এর জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্ররোচনা ও চাপে প্রাদেশিক পরিষদের কার্যাবলি মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করলে বুঝতে সমস্যা হয় না, এবার প্রতিরোধের সময় এসেছে। এরইমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। বাংলার মানুষ প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলে তাদের মানসিক সামর্থ্য গুঁড়িয়ে দিতে পরিকল্পনা হয় ২৫ মার্চ হত্যাযজ্ঞের।

রাজধানী ঢাকায় নিরীহ মানুষেরা যখন ঘরে ফিরেছে, তখনই তাদের হত্যার জন্য পথে নেমে আসে পাকিস্তান আর্মির ট্যাংক। ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানায় ইপিআরের বাঙালি জওয়ানরা। পাশাপাশি টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, টেলিগ্রাফসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া, যাতে ঢাকাকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা যায়।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমেই পুরো ঢাকায় হামলা চালায়। সেদিন রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারা প্রথমে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং এরপর একে একে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এর চারপাশ, ধানমন্ডি, পিলখানায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দফতরসহ রাজধানীর সর্বত্র নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঢাকার বাইরে হত্যাযজ্ঞ চালায় চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরেও।

বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হত্যা করে জগন্নাথ হল, রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন জায়গায় গণকবর দেয়া হয়। ওই রাতে অনেক শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক এ এন এম মনীরুজ্জামান, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. ফজলুর রহমান খান, ড. এ মুকতাদির, শরাফাত আলী, এ আ কে খাদেম, অনুদ্ধেপায়ন ভট্টাচার্য, সা’দত আলী, এম এ সাদেক প্রমুখ।

এছাড়াও ওই রাতে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল, ফজলুল হক, ঢাকা হল, এস এম হলের অনেক আবাসিক ছাত্রকে হত্যা করা হয়। শুধু ঢাকা শহরে সেদিন কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। কারণ অনেক দেহ পুড়ে গিয়েছিল বা গণকবর দেয়া হয়েছিল। তবে সে সংখ্যা ১০ হাজারের কম হবে না। গণহত্যার এই বীভৎস দৃশ্য দেখলে পাগল হওয়ার উপক্রম হবে বলে অনেকেই উল্লেখ করেন।

২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সুলতান মাহমুদ রানার একটি লেখা থেকে জানা যায়, ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চুপিসারে করাচির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। এই নির্দেশের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। এটি বাঙালিদের জন্য ছিল একটি ‘কালোরাত্রি’। কারণ সৈন্যরা মধ্যরাতের পর থেকেই নির্বিচারে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে।

‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের এই পরিকল্পনাটি কার্যকর করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার টিক্কা খান। তারই নির্দেশে ২৫ মার্চের মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকবাহিনী বাংলাদেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই রাতে শুধু সাধারণ মানুষের ওপর নয়, প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয় বাঙালি নিরাপত্তাকর্মীদের উপরও। সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইপিআর এবং পুলিশদের হত্যা করা ছিল পশ্চিমাদের একটি বড় লক্ষ্য। ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানায় এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি পুলিশ, ইপিআর এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (ইবিআর)-এর সৈন্যদের গণহারে হত্যা করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চেয়েছিলো।

Please follow and like us:
fb-share-icon
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)