১৫ বছর নিজ ফ্ল্যাটেই মরে মমি হয়ে রয়েছেন নারী

নিয়মিত তার ফ্ল্যাটের মেইনটেনেন্স ফি, নতুন ছাদের জন্য অতিরিক্ত খরচ, পানির বিল এবং ভবনের অন্যান্য চার্জ পরিশোধ হচ্ছিলো। অথচ ইসাবেলা রিভেরা ১৫ বছর আগেই মারা গেছেন। তারপরও তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেই প্রতি মাসে এসব বিল পরিশোধ হয়ে যেত।

ওই অ্যাকাউন্টেই তার পেনশনের টাকা জমা হতো। এমনকি ভোট জরিপ অফিস থেকে তাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে আগামী ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে কোন কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে হবে সে বিষয়ে। অথচ তিনি ১৫ বছর আগেই মরে পড়ে আছেন তার অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুমে। কিন্তু তার প্রতিবেশিরা কেউ তা টের পায়নি। স্পেনের মাদ্রিদের সিউদাদ লিনিয়েল জেলায় ঘটেছে এই বিস্ময়কর ঘটনা।

গত ২২ অক্টোবর মঙ্গলবার পুলিশ ওই নারীর ফ্ল্যাটের বাথরুম থেকে তার মমি হয়ে যাওয়া লাশটি উদ্ধার করে। ওই নারীর এক ভাতিজি পুলিশকে তার ফুফির অদৃশ্য হওয়ার বিষয়টি জানানোর পর পুলিশ তার বাসায় ঢোকে। রিভেরার ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজাটি ভেতর থেকে লাগানো ছিলো। ফলে ব্যালকনি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ উদ্ধারকর্মীরা।

ধারণা করা হয়, গোসল করার সময় বাথরুমেই তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এরপর গত ১৫ বছর ধরে তার লাশ সেখানেই পড়ে তার দেহটি মমিতে রুপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলো। বাথরুমের তাপমাত্রা ও পরিবেশ তার দেহকে মমিতে রুপান্তরে সহায়ক হয়েছে।

ডাক্তাররা জানিয়েছেন, ১৪-১৬ বছর আগে তার মৃত্যু হয়েছে। ৮০ বছর বয়স পূর্ণ হয়নি তার। ১৯২৬ সালে জন্ম হয় রিভেরার। আর হোসে ডেল হিয়েরো নামের সড়কের ওই অ্যাপার্টমেন্টে ১৯৬৫ সাল থেকে বসবাস করতেন তিনি। মৃত্যুর চার-পাঁচ বছর আগের সময়টা তার সঙ্গে জুয়ান মোলিনা মুনোজ নামের এক ডিভোর্সী নারী নিজের সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। এক পর্যায়ে মোলিনা ওই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের কমিউনিট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব নেন। এসময় প্রতিবেশিদের সঙ্গে তাদের ঝগড়া-ঝাটি হয়। যার ফলে তারা অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

এই বাড়িতেই ১৫ বছর মরে বাথরুমে পড়েছিলেন ওই নারী

এই বাড়িতেই ১৫ বছর মরে বাথরুমে পড়েছিলেন ওই নারী

মোলিনার মৃত্যুর পর রিভেরা একা হয়ে পড়েন। পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গেও তার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিলো না। এমনকি ভবনের কারো সঙ্গেও কথা বলতেন না তিনি। আর তার পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সঙ্গেও দুর্গন্ধ এবং শব্দদূষণ ছাড়া কোনো কিছু নিয়ে কথা হতো না। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে সর্বশেষ প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিলো। ওদিকে এর আগেই তাদের বাসায় ইন্টারকম ফোন লাগানো হয়। ফলে দারোয়ান ডন অ্যান্টোনিওকেও তার চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হয়। আর নয়তো দারোয়ান থাকলে হয়তো তার মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতে পারতো।

আজ থেকে পাঁচ বছর আগে জানুয়ারি মাসে ক্রিসমাসের লাইট নামিয়ে ফেলার পর রিভেরার ব্যালকনি এবং রাস্তার লাইটের মধ্যে একটি তার রয়ে গিয়েছিলো। ওই তার বেয়ে কোনো চোর-ডাকাত রিভেরার ঘরে ঢুকতে পারে এই ভয় থেকে প্রতিবেশি এমিলিও মুনোজ (৭৮) পুলিশে খবর দেয়।

মুনোজ বলেন, আমি পুলিশকে খবর দেই। পুলিশ এসে তারটি কেটে দিয়ে যায়। আমি পুলিশ অফিসারকে বলি রিভেরার অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে একটু খোঁজ নিতে। কেননা আমরা অনেক দিন ধরেই তাকে দেখিনি। হয় সে মরে গেছে নয়তো কিছু একটা ঘটেছে। আমরা পোস্ট বক্সে তার বিদ্যুৎ বিলের কাগজ দেখতাম। কিন্তু প্রতিবারই দেখতে পেতাম আগের সব বিল পরিশোধ করা হয়ে গেছে। এতে আমরা ধারণা করতাম তিনি হয়তো বেঁচেই আছেন। আমাদের সঙ্গে হয়তো তার দেখা হচ্ছে না।

প্রতিবেশি মুনোজই শুধু নন একই সড়কের পাশে অবস্থিত লা কেইক্সা ব্যাংকের অফিস প্রধানও রিভেরির কী হয়েছে তা জানতে উৎসুক ছিলেন। কেননা তার এই ক্লায়েন্ট শুধু বিল পরিশোধ করে যাচ্ছে কিন্তু অন্য কোনো কাজে টাকা ওঠাচ্ছেন না। একদিন তিনি রিভেরার ফ্ল্যাটে গিয়ে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে চলে যান। এরপর রিভেরার প্রতিবেশিদের কয়েকজনও পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ রিভেরার ননদকে ফোন দিলে তিনি জানান রিভেরা হয়তো কোনো বৃদ্ধাশ্রমে আছেন এবং বেঁচে আছেন।

এরপর রিভেরার পাশের ফ্ল্যাটের অ্যান্টোনিও নামের এক প্রতিবেশি জেলা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তার সন্ধান বের করতে চায়। কিন্তু তথ্যের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে জেলা কর্তৃপক্ষ তাকে সহায়তা করতে পারেনি। ওদিকে রিভেরা বাথরুমে মরে পড়ে থাকে এবং তার লাশ মমিতে রুপান্তরিত হতে থাকে।

Please follow and like us:
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)