জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুদক

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে আসবাবপত্র কেনার নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে নথি সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিতে দুদক কর্মকর্তারাই যাচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। কাল রোববার দুদকের একটি দল সেখানে যাবে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য দুদকের চট্টগ্রাম–২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মাহবুবুল আলমকে দলনেতা ও সহকারী পরিচালক রতন কুমার পালকে সদস্য করে দুই সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান দলের প্রধান মাহবুবুল আলম এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়, দুদকের দলটি ১২ মে সকাল ১০টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উপস্থিত হবে। ওই সময় ২০১৬–১৭ অর্থবছরে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে আসবাবপত্র ক্রয়সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত কপি, মেডিকেল কলেজে ফার্নিচার ক্রয়সংক্রান্ত আইন–বিধি ও নীতিমালার কপি দুদক দলের কাছে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদসহ ছয় কর্মকর্তার বক্তব্য নেবে দুদকের দলটি। তাই তাঁদের সবাইকে ওই দিন উপস্থিত থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছাড়া আরও যাঁদের বক্তব্য নেওয়া হবে তাঁরা হলেন অধিদপ্তরের চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন বিভাগের সাবেক পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর আবদুর রশীদ, কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মো. ইউনুস, উপ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক কামরুল কিবরিয়া, প্রধান সহকারী আবদুল মালেক ও উচ্চমান সহকারী খায়রুল আলম।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আসবাবপত্র কেনার জন্য ২০ কোটি ৮৫ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ টাকার প্রশাসনিক অনুমোদনসহ বরাদ্দ চান। চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন বিভাগের প্রশাসনিক প্ল্যানে তাদের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না। তারপরও মন্ত্রণালয়ের থোক বরাদ্দ থেকে ওই পরিমাণ টাকা বরাদ্দ দেওয়াসহ প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য পাওয়া প্রস্তাব সুপারিশসহ অগ্রবর্তী করা হয়। নথিতে ওই ছয়জন কর্মকর্তা–কর্মচারী সই করেন।

তাঁদের মধ্যে সাবেক পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর আবদুর রশীদ গত মাসে দুদকের দায়ের করা একটি মামলার আসামি। মামলাটি করা হয় কক্সবাজার মেডিকেলের যন্ত্রপাতি কেনার নামে দুর্নীতির অভিযোগে। ওই মামলায় আরও আসামি করা হয়েছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ সুবাস চন্দ্র সাহা ও সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রেজাউল করিমসহ আটজনকে।
ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে যন্ত্রপাতির প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই সাবেক অধ্যক্ষ রেজাউল করিম যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেন। এ জন্য তিনি ক্রয়সংক্রান্ত কাজ করার জন্য কমিটি গঠনের অনুমতি চেয়ে চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন বিভাগের সাবেক পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর আবদুর রশীদ বরাবর চিঠি দেন। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়ার আগেই অধ্যক্ষ বিভিন্ন কমিটি গঠন করেন। চিঠি দিয়ে বিভাগীয় প্রধানদের কাছ থেকে চাহিদাপত্র চান। পরে বিভাগীয় প্রধানদের কাছ থেকে চাহিদাপত্র না পেয়েও তিনি পছন্দের ঠিকাদার রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ দেন।

রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানম। রুবিনা খানম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন প্রকল্পে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে যোগ দেন ১৯৯৮ সালে। ২০০০ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়ে রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে ব্যবসা শুরু করেন। আবজালের সঙ্গে বিয়ের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একচেটিয়া ব্যবসা করার জন্য তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রুবিনা খানম কার্যাদেশ অনুসারে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করে ভুয়া ও ব্যবহার অনুপযোগী যন্ত্রপাতি বিভিন্ন দেশের লেবেল লাগিয়ে কক্সবাজার মেডিকেলে সরবারাহ করেন। পরে ৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিল জমা দিয়ে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। ওই সব যন্ত্রপাতি এখনো ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে আছে।

দুদক বলেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন বিভাগের সাবেক পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর আবদুর রশীদ অবৈধ ওই কর্মকাণ্ড বন্ধ না করে চাহিদাপত্র না পাওয়া সত্ত্বেও আর্থিক ক্ষমতার বাইরে ভেঙে ভেঙে প্রথমে ৩০ কোটি ও পরে সাড়ে ৭ কোটি টাকা রহমান ট্রেডকে দিয়ে দেন। এর মাধ্যমে তিনি রুবিনাকে ওই টাকা আত্মসাতে সহায়তা করেন।

Please follow and like us:
fb-share-icon
Tweet 20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)