২১ আগস্ট : ১৫ আগস্টের দ্বিতীয় এপিসোড

1
174

ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম :
বর্তমান লেখাটির যে শিরোনাম ঠিক হলো তা যথার্থ হয়েছে কি না সে সন্দেহ আমারো আছে। কারণ, গণমাধ্যমের কল্যাণে সমগ্র জাতি আজ অবগত আছে যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্নিকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র বারবার হয়েছে- এযাবৎ তাকে হত্যা করার চেষ্টাই হয়েছে অন্তত ১৯ বার। সুতরাং ‘দ্বিতীয় এপিসোড’-এর স্থলে হতে পারতো ভিন্ন কোনো শব্দবন্ধ। তবু, হত্যাকাণ্ডের ধরন এবং বহুমাত্রিকতা দৃষ্টে এরূপ নামটি গৃহীত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যেমন বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারসহ সকলকেই ঘাতকেরা ‘টার্গেট’ করেছিল তেমনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে টার্গেট’ ছিলেন প্রধানত শেখ হাসিনা এবং তার রাজনৈতিক অনুসারীগণ। যারা এই বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য ছিলেন সংগ্রামশীল। যারা এদেশের খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অংশ হিসেবে বর্তমান।

বিদেশে অবস্থানের কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রক্ত ধারার শেষ দুটি প্রাণ বেঁচে ছিল ১৫ আগস্ট ট্রাজেডির পর। কিন্তু ঘাতকের রক্তচক্ষুর দিক-নিশানার লক্ষবিন্দু থেকে এ প্রাণ দুটি কীভাবে বেঁচে থাকবে! রাষ্ট্রই যখন ঘাতকের পৃষ্ঠপোষকরূপে বহাল থাকে তখন শেখ হাসিনা কিংবা শেখ রেহানার জীবন যে গভীর বিপন্নতায় নিমজ্জিত তা বুঝতেও কষ্ট হয় না এদেশের সাধারণ নাগরিকের। সাধারণ মানুষের সহজাত উপলব্ধি ছিল বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরী শেখ হাসিনার কাছেই বাংলাদেশ নামক এই জাতি-রাষ্ট্র নিরাপদ, নিরাপদ সাধারণ নাগরিক।

১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত দেশবাসী সে প্রমাণ পেয়েছিল। কিন্তু, শেখ হাসিনার ওপর রাষ্ট্র ও নাগরিকের এরূপ আস্থা তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত (২০০১-২০০৬) জোট শাসকের ভালো লাগেনি- ভালো লাগবার কথাও নয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি আদর্শে বিশ্বাসী শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার আগমন ও আবির্ভাবকে সহজে মেনে নিতে পারেনি- সহজভাবে গ্রহণও করতে পারেনি। বিশেষত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানি মানসিক ভাবাপন্ন শাসকগোষ্ঠী যখন মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি শাসনযন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল, প্রগতির পথ পরিহার করে পুনরায় পাকিস্তানি স্টাইলে পশ্চাতের পানে যাত্রা শুরু করেছিল তখন গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকামী বাঙালি সমাজ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী বাঙালি সমাজ, ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতাবোধে উজ্জীবিত বাঙালি সমাজ মানসিক সংকটে নিপতিত হয়ে যায়।

অন্ধকারে নিমজ্জনের ঘোর সেই সংকটের আবর্ত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে জননী সাহসিকার ভূমিকায় অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়ে সকলের পাশে দাঁড়ান জননীর মমতায় জননেত্রী শেখ হাসিনা। বৃহত্তর বাঙালি সমাজকে একত্রিত করে জননেত্রীর ঘুরে দাঁড়ানোর এই ভঙ্গি ও দীপ্ত রূপ বিএনপি-জামাত জোটের ভালো লাগেনি মোটেই। তাই সাহসী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাঙালির যে জাতীয় ঐক্য সংহত রূপ লাভ করেছিল অন্ধকারের অপশক্তি-তাড়িত হত্যাকারীরা সেই সংহত ঐক্যের মূলে আঘাত করতে চেয়েছিল করেছিলও। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগকে নির্মূল করতে যারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে ৩২ নম্বরে চালিয়েছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞ তাদেরই উত্তরসূরিরা প্রায় তিন দশক পর হামলা চালায় জননেত্রী শেখ হাসিনার উত্তাল জনসভায়। এবার ঘাতক চক্রের উদ্দেশ্য একটিই- তা ছিল শেখ হাসিনাকে নির্মূল করা- হত্যা করা। কিন্তু এই আক্রমণে তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ঘাতকেরা সর্বাংশে সাফল্য না পেলেও তাদের নিক্ষিপ্ত বিশেষায়িত গ্রেনেডের আঘাতে আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করে, আহত করে প্রায় চার শতাধিক নেতা ও কর্মীকে। এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত গণমাধ্যমের কল্যাণে জনসম্মুখে প্রকাশ পেয়েছে তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রীয় শক্তির মদদেই এ হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।

একদিকে জননেত্রী সৃষ্ট জাতীয় সেই সংঘটিত ও সুসংহত ঐক্য এবং অপরদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত ধারার শেষ প্রবাহকে নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে এই জাতি-রাষ্ট্রে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার অভিপ্রায়েই বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১ আগস্ট সৃষ্টি করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের প্রেতাত্মারূপে ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট সৃষ্টি করা হয়েছিল। অর্থাৎ ১৫ আগস্টের অসমাপ্ত (শেখ হাসিনার প্রাণ সংহার) কাজটুকু সমাপ্ত করার জন্যই ২১ আগস্টকে বেছে নেওয়া হয়। সুতরাং ১৫ আগস্টের নারকীয় ঘটনার দ্বিতীয় এপিসোড ২১ আগস্ট। মধ্যিখানে ব্যবধান শুধু দৃশ্যের বদল- ধানমন্ডী থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। ১৫ আগস্টের ধানমন্ডীর সেই রক্তের স্রোতধারা ২১ আগস্টের রক্তধারার সঙ্গে মিশে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হয়ে সমগ্র বাংলাদেশ সয়লাব হয়ে যায়। সমগ্র বিশ্ব এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় পুনরায় স্তম্ভিত হয়ে যায়!

ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটিয়ে একে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার রাষ্ট্রের নাটকীয় কৌশলও বাংলাদেশের ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। কি কৌশলে তৎকালীন হাওয়া ভবন’ এক অসাধারণ নাটক তৈরি করেছিল! জজ মিয়া’ নামের সেই নাটককেও দেশবাসীর প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল বেদনার্ত হৃদয়ে। জজ মিয়া’ নামের সেই নাটক দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল ২১ আগস্টে নিহত হওয়া ২৪ জন মানুষের আত্মীয় পরিজনের। বিস্মিত বিশ্ব নেতৃবৃন্দ যখন একের পর এক নিন্দা জানিয়ে আসছিল তখন কুচক্রিরা কথিত সেই হাওয়া ভবনে বসে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিষন্ন বদনে বসে আফসোস করছিল! অন্তহীন আফসোস বুকে নিয়েই বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোট সরকার ১৫ আগস্টের খুনিদের ন্যায় ২১ আগস্টের খুনিদেরকেও রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয় প্রদান এবং কাউকে কাউকে বিদেশে পাঠিয়ে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। সুতরাং নানা কারণে ২১ আগস্ট হলো ১৫ আগস্টের দ্বিতীয় এক করুণ এপিসোড।

আগস্টের সকল ভয়, আতংক, শংকা ও দুর্যোগ থেকে বাঙালিরাই তাদের জননী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সুরক্ষা দিবে। কোন অপশক্তি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

1 COMMENT