সামনে এসএসসি পরীক্ষা তবুও আশাশুনিতে ওসিকে ম্যানেজ করে মেলায় চলছে নগ্ননৃত্য ও জুয়া

0
1055
বিশেষ প্রতিনিধি:
আশাশুনিতে চলছে নগ্ননৃত্য ও রমরমা জুয়ার আসর। কোন ক্রমেই এ নগ্ন নৃত্য ও জুয়ার আসর বন্ধ হচ্ছে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি প্রভাবশালী কিছু নেতা ও থানা প্রশাসনের সহযোগিতায় একের পর এক যাত্রার নামে নগ্ন নৃত্য ও জুয়ার আসর পরিচালনা করছে। প্রতিদিন মোটা অংকের লেন-দেনের চুক্তিতে প্রশাসন প্রকাশ্যে নগ্ননৃত্য ও জুয়ার আসর চলতে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে একটি প্রভাবশালী মহলও জাড়িত আছে এই জুয়া ও যাত্রা পালায়। স্কুল-কলেজের ছাত্র, শিশু, যুবকসহ বয়ঃবৃদ্ধরা ভিড় করছেন এ মেলায়। জুয়ার আসরে দাঁড়িয়ে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার।
আশাশুনির খাজরাবাজার সংলগ্ন বালির মাঠে চলছে চরম অশ্লীল নগ্ন নৃত্য ও জুয়ার আসর। খোলা জায়গাটি রাতের গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকত। কিছুদিন ধরে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানটিই ঝলমলে আলোতে আলোকিত হয়ে উঠেছে। আর এই আলোর মধ্যেই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে অনেকের স্বপ্ন। আলোর ঝলকানিতে জুয়ার আসরে সব হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। হাহাকার করছে পরিবারের সদস্যরা। তাদের এই হাহাকার দেখে মুচকি হাসি হেসে পকেট ভরছে প্রশাসনের অসাধু কর্মর্তারা ও প্রভাবশালী একটি মহলসহ অনেকেই।আর এ জুয়া ও যাত্রা শ্রীউলা,আশাশুনি,বড়দল,কাদাকাটি এলাকায় একের পর এক চলে আসছে।
গ্রামের সহজ-সরল খেটে খাওয়া মনুষগুলো লোভের বর্শ্ববর্তী হয়ে এখানে আসছে ,জুয়া খেলে সর্বশান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।। এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মেলা কর্তৃপক্ষ। মেলা মাঠের এক কোনায় সারি সারি জুয়ার কোট। সাধারণ মানুষ ভিড় করছে এই কোটগুলোকে ঘিরে। এক একটি কোটে পড়ছে হাজার হাজার টাকা, একজন গুটি চালছে। কেউ হয়ত কিছু টাকা পাচ্ছে বাকি টাকা চলে যাচ্ছে কোট পরিচালনাকারীর হাতে। পাশেই চলছে যাত্রার নামে নগ্ন নৃত্য। এখানে ভিড় করে আছে শিশু, কিশোর, যুবক এমনকি বৃদ্ধরাও। ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, নামেই যাত্রা । যাত্রার পরিবর্তে সেখানে নাচছে কিশোরী মেয়েরা। প্রথমে পোশাক পরে স্টেজে আসলেও ধীরে ধীরে পোষাক খুলতে শুরু করে এই কিশোরীরা। শেষটা এমন পর্যায় নিয়ে যায় যেন এটা নগ্ননৃত্যের একটি আসর। আর এ দেখে উল¬øাসিত হয়ে উঠছে শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধরা। চিৎকার দিয়ে কিশোরীদের নগ্ন হতে উৎসাহ দিচ্ছেন তারা। যে যত বেশি খোলা মেলা হচ্ছে দর্শকরা তার দিকেই ছুড়ে দিচ্ছেন তত বেশি টাকা। কেউ কেউ কিশোরীদের স্পর্শকাতর স্থানে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন টাকা। শিশু কিশোররা নগ্ননৃত্য দেখার জন্য ও অশ¬ীল নৃত্য শিল্পীদের টাকা দেয়ার জন্য বাড়ি থেকে বাবা মায়ের কাছ থেকে জোড় করে টাকা নিয়ে আসছে। কেউ কেউ বাড়ি থেকে টাকা বা মালামাল চুরি করছে। এমনকি অনেকই আবার অন্যের জিনিস চুরি করে তা বিক্রি করে জোগান দিচ্ছে এই টাকার। প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করার এই খেলায় ধ্বংস হচ্ছে শিশু কিশোরদের ভবিষ্যৎ। ঘরে ঘরে বাড়ছে অশান্তি। নিঃস্ব হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ।
একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রশাসন, মিডিয়াকর্মী সহ বিভিন্ন দফতরকে মোটা অংকের টাকা দিচ্ছে মেলা ও জুয়া কর্তৃপক্ষ। এছাড়া স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সাথে তাদের একই চুক্তি হয়েছে। তারাও মেলাটিকে চালিয়ে নিতে সাহায্য করছে। মেলা ও জুয়ার লোকজন প্রচার করছে প্রশাসন ও মিডিয়া কর্মীরা আমাদের হাতে বাঁধা। আমাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অনেকই জানান, এই জুয়া ও যাত্রাপালার আসর তাদের পরিবারে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অনেক বাড়িতেই শুরু হয়েছে অশান্তি। বেড়ে গেছে চুরি। সামনে এস,এস,সি ও এইচএসসি পরীক্ষা,তাছাড়া স্কুল গুলোতে শুরু হয়েছে বার্ষিক পরীক্ষা। ছাত্ররা সন্ধ্যা হলেই পড়ালেখা বাদ দিয়ে চলে যায় মেলায়। বাড়িতে ফেরে গভীর রাতে। কিছু বললেই সংসারে অশান্তি শুরু করে।স্থানীয় কৃষক আবদুল গফুর জানান, আমি অনেক কষ্টে আমার ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছি। সামনে ছেলের পরীক্ষা। এই মেলা শুরু হওয়ার পর ছেলে সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, আর আসে গভীর রাতে। কিছু বললেই আমাদের সাথে রাগারাগি করে। কান্না জড়িত কণ্ঠে কৃষক আরও বলেন, এই ছেলেকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। আমাদের সেই স্বপ্ন ভাঙতে বসেছে।
একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তি বলেন, বাংলা সংস্কৃতির যে ঐতিহ্য, যে সুস্থ ধারা তার যেকোনো বিচ্যুতিই হচ্ছে অপসংস্কৃতি। যা সমাজকে একটি ভুল পথে চালিত করবার জন্য অন্যতম কারণ হতে পারে। দুই দশক আগেও যাত্রাপালা ও পুতুল নাচ কিংবা পালা গান, কবি গান পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে উপভোগ করতাম। যা আমাদের প্রতিদিনের আত্মার খোরাক যোগাতো। কিন্তু এখন লক্ষ্যণীয় যে, সেই যাত্রাপালার নামে যে সমস্ত অশ্লীলতা প্রদর্শন করা হয় তা একটি জাতির সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করার অভিপ্রায় বলে আমাদের মনে হয়। যারা এই যাত্রাপালার নামে অশ্লীল নৃত্যের আয়োজন করছে বা আয়োজন করতে সহযোগিতা করছে তারা প্রত্যক্ষভাবে এই ধ্বংস যজ্ঞকেই সহযোগিতা করছে। প্রত্যাশা করি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। সুস্থ সংস্কৃতি ধারায় ফিরে আসুক। আমাদের বাংলার চিরায়ত সেই ঐতিহ্যে।
আশাশুনির খাজরায় জুয়া বোর্ডের মূল হোতা শহিদুল ইসলামের সাথে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, সাতক্ষীরার সব প্রত্রিকাকে ৫০০০ করে টাকা দিয়েছি আমার নামে কোন নিউজ হবে না। আর ওসি সারকেও ম্যানেজ করে আমরা খেলা করছি।
আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিদুল ইসলাম শাহীন জানান, জুয়া ও অশ্লীল নৃত্যের ব্যপারে আমার জানা নেই। যদি এ ধরণের কর্মকান্ড হয়ে থাকে তাহলে আমরা মেলা বন্ধ করে দিব এবং যারা এই কর্মকান্ডের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থ্যা নিব।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুষমা সুলতানা জানান, এ বিষয়ে আমার জানা নেই । বিষয় টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন জানান, এ ব্যপারে আমার কাছ থেকে কোন অনুমতি নেওয়া হয়নি । খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

দৈনিক সাতক্ষীরা/জেড এইচ