সাতক্ষীরায় প্রাণসায়ের প্রাণ বিলীনের পথে

0
390

মুনসুর রহমান: সুলতানপুর মাছ বাজার ব্রীজের নিচে তাকিয়ে পানির কোনো অস্তিত্ব চোখে পড়লো না, কেবল রাশি রাশি ময়লা-আবর্জনা। যেনো এখানে নিয়ম করে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়! প্লাস্টিকের বোতল, লোহা-লক্কড়, পুরনো জিনিসপত্র, ময়লা কাপড়, বিস্কুটের-চিপসের প্যাকেট, পায়খানা, প্রস্রাব ইত্যাদি- কী নেই তাতে। কঠিন, তরল, বায়বীয়- সব ধরনের ময়লা  সহ  মুরগি, শাকসবজি, চা, হোটেল, কাঠ, জ্বালানি কাঠ, মুদি দোকান, হাঁড়িপাতিল, দরজি দোকান, রিকশা-সাইকেল সারাই, সেলুন, বিস্কুটের কারখানা, রিকশা-সাইকেল গ্যারেজ, ভাঙাড়ি, মাছের দোকান, পান-সুপারি, বেড-বালিশ প্রভৃতির  ময়ল‍া ফেলতে ফেলতে স্তূপাকার রূপ নিয়েছে। এ পাড়ের দোকানপাট ও বাড়িঘরের যতো ময়লা-আবর্জনা, সবকিছুর ঠিকানা এই খাল। যেনো খালটি গণ ডাস্টবিন। ময়লা ফেলতে ফেলতে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে রোজ ফেলতে লাগলে, ময়লা-আবর্জনাতেই খাল বুজে যাবে শঙ্কা সচেতন স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে সুলতানপুরের হাসান বলেন, খালতো এখন শুধুই স্মৃতি। যে খাল দিয়ে বড় বড় পাল তোলা নৌকা আসতো আর বর্ষা মৌসুমে প্রচুর মাছ ধরা যেতো সেটি এখন দখল আর দূষণে মৃত। কোথায় নদী আর কোথায় খাল কিছুই নেই। এক শ্রেণির  অসাধু ব্যবসায়ীরা এর পরিবেশ দিন দিন নষ্ট করে ফেলছে।

রাধানগরের স্থানীয় বাসিন্দা রনক বাসার বলেন, খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ ব্যবসায়ীদের। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বাজারের পানি নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং অনেক দোকানে পানি প্রবেশ করে লাখ লাখ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এদিকে, খালটি যে শুধু দখল হচ্ছে তা নয়। বড় বাজারের হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসা বাড়ির অধিকাংশ বর্জ্য ফেলা হয় এ খালে। ফলে ময়লা আবর্জনা দুগন্ধে পরিবেশ মারাত্মক হুমকি মুখে। প্রথমে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় ।পরে তার ওপর দোকানের পেছনের অংশ বৃদ্ধি হয় দখল প্রক্রিয়া চলে। পৌরসভার মধ্যে এর অবস্থান তাই এর দায় পৌরসভা কৃর্তপক্ষের ওপর পড়ে। আর তাই সচেতন ব্যবসায়ী ও পৌর নাগরিকের দাবির মুখে পৌর প্রশাসন খালের আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষে কঠোর অবস্থানে যাবেন।

এ বিষয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আ.স.ম আব্দুর রব বলেন, ঝুড়িতে করে নদীতে ময়লা ফেলছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তিনি বলেন, পানও কাঁচা বাজারের প্রচুর ময়লা। পৌর কতৃপক্ষের কোন জায়গা না থাকায় তাঁরা খালে আবর্জনা ফেলছেন। তাদের মতো অন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও খালে আবর্জনা ফেলতে দেখা যায়৷ এছাড়া খালে শহরের ময়লা আবর্জনা ফেলার ফলে খালের পানি ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পৌর এলাকায় হোটেল, বাসা-বাড়ির সকল আবর্জনা ফেলছে এলাকাবাসি। কিন্তু পৌরসভাসহ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের কোন নজরদারি নেই।

জাসদের কেন্দীয় কমিটির সহ-সভাপতি কাজী রিয়াজ বলেন, নদী দখল হওয়া ও নদীর জল কমে যাওয়ার ফলে এবং অন্য নানা কারণে ক্রমেই মাটির তলায় জলের ওপর চাপ বাড়ছে, নামছে ভূগর্ভস্থ জল। ফলে মাটির তলা থেকে নদীতে তরতরিয়ে যে জল আসত, তাও হারিয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিকই যে, পরিবেশের আরও নানান বিপদ ঘনায়মান। কিন্তু এটাও ঠিক যে, সেই সংকটের চালচিত্রে প্রথম সারিতেই নদী। নদীমাতৃক বাংলা তো নদীকে বাদ দিয়ে বাঁচতে পারে না। রাজনৈতিক দল গুলো অতীত চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ । তাই রাজনৈতিক মনোভাব  পরিবর্তনের ফলে এ ময়লা অপসারণ দ্রুত নির্মুল করা সম্ভব। এছাড়া নদীতে বিভিন্ন জলজ প্রাণী বসবাস করে যারা পরিবেশের সাথে ওৎপ্রতো ভাবে জড়িত। নদী ভরাট হয়ে যাওয়া ও নানা ভাবে দখল হয়ে যাওয়ার কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে এসব প্রাণী। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে এক সময় পরিবেশ চরম হুমকির মুখে পড়বে।

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির যুগ্ন সম্পাদক এ্যাড.ফাইমুল হক কিসলু বলেন, এক সময় কত চঞ্চল ছিল এর গতি। লঞ্চ, ট্রলার, গয়না নৌকা, সাম্পানসহ সব ধরনের নৌযান অবিরাম চলাচল করত এই খাল দিয়ে, যা এখন রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। এখন লঞ্চ তো দূরের কথা, ময়লা ও দুগন্ধের কারণে কলার ভেলা চলারও উপায় নেই। তিনি আরও বলেন, ‘ভরাট নদীতে ময়লা আবর্জনা ও পলিথিন ছড়িয়ে থাকার ফলে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।’ তাই যারা খালে প্রতিনিয়ত ময়লা ফেলছে। তাদের চিহিৃত করে শাস্তির ব্যবস্থা করলে প্রাণসায়ের ফিরে পাবে তার হারানো প্রাণ। স্থানীয় প্রশাসন সহ সকলের কাছে সচেতন সমাজের এ কামনা।

এ বিষয়ে পৌরসভার সাবেক মেয়র এম এ জলিল বলেন, বলেন, ‘এক সময় প্রাণসায়ের নদী  শহরে প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। আর এখন জায়গাটি প্রায় মৃত্যুপুরী। আর শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলে নদীর তলদেশ ভরাট করছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।’ শহরের ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য কোন জায়গা নেই। তাই ব্যবস্থায়ী তথা স্থানীয় বাসিন্দারা খালে ময়লা ফেলছে। তিনি দাবি করেন, কারা ময়লা ফেলছে তা খোঁজ নিয়ে তাদের শাস্তি ‍নিশ্চিত করতে পারলে এ অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারবে।

এ বিষয়ে পৌর মেয়র এর সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্ঠা করলে তা সম্ভব হয়নি।

LEAVE A REPLY