সর্বস্তরে বাংলা সন প্রচলন হোক

0
242

বরুণ ব্যানার্জী: বাংলা সন। বাঙ্গালী সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। আবহমান বাংলার গৌরবোজ্জল বাঙ্গালী সংস্কৃতির গর্ব বাংলা সন। বিশ্বের অনেক ভাষা-সংস্কৃতির নিজস্ব সন বা বর্ষপঞ্জী নেই। আমরা বাঙ্গালীরা গর্বিত এ কারনে যে আমাদের একান্ত নিজস্ব একটি বর্ষপঞ্জী আছে। বাঙ্গালীর নিজস্ব বর্ষপঞ্জী হলো বাংলা সন। বাংলা সন বাঙ্গালীর সংস্কৃতিকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। বাংলা ভাষা- সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি-জাতি গঠনের ভীতকে মজবুত করেছে। তাই একবাক্যে বলা যায় বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে বাংলা সন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলা সনের উদ্ভবের ইতিহাস নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত করে তথ্য-উপাত্ত দেয়া সম্ভব না হলেও মোঘল সম্রাট আকবরের ব্যাক্তিগত উদ্যোগ-পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সনের উদ্ভব হয়েছে বলে অধিকাংশ পন্ডিত গবেষক একমত পোষন করে। ’আকবরনামা’ ও ’ আইনী আকরবী’তে ভারতীয় সনের ইতিহাস আলোচনায় বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের উল্লেখ আছে। যার উদ্যোক্তা হিসাবে সম্রাট আকবরের কথাই বলা হেয়ছে। ব্যাপক গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তণ করেছেন। হিজরী চান্দ্রসনে ৩৫৪ দিন ৮ঘন্টা ৪৮ সে. এ বছর গননা করা হয়। অন্য দিকে সৌরসনে বছর গননা হয় ৩৬৫ দিন ৫ঘন্টা ৪৮ মি. ৪৬ সে. এ অর্থাৎ দুই সনের বছর গননায় প্রায় ১০/১১ দিনের পার্থক্য থাকায় রাস্ট্রীয় কাজে গরমিল দেখা দেয়। সম্রাট আকবর বছর গননার এই সমস্যা সমাধানের জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রবীদ পন্ডিত আমীর ফতেহউল্যাহ সিরাজীকে দায়িত্ব দেন একটি ক্রটিমুক্ত বিজ্ঞানভিত্তিক সর্বজন গ্রহনীয় বর্ষপঞ্জীর সন উদ্ভাবনের। ফতেহউল্যাহ সিরাজীর উদ্ভাবিত সেই বর্ষপঞ্জী হলো বাংলা সন। যা প্রকৃত পক্ষে চান্দ্র ও সৌর সনের মিলিত নতুন হিসাব, নতুন উদ্ভাবিত বাংলা বর্ষপঞ্জী। বাংলা সনে মাসের নামগুলো নেয়া হয়েছে বাঙ্গালীর পরিচিত নক্ষত্রসমুহের নাম থেকে যেমন- বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ মাসের নামকরন করা হয়েছে তেমনি জ্যেষ্ঠ নক্ষত্রের নামে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেজে আষাঢ়, শ্রাবনা থেকে শ্রাবন, ভাদ্র পদা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, পূষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র। তবে একমাত্র বাংলা মাস অগ্রাহায়ন কোন নক্ষত্রের নাম থেকে নেয় হয়নি।

মোঘল আমলে বাংলা সনের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ইংরেজরা আসার পর সরকারি কাজে বাংলা সনের প্রচলন কমিয়ে দেয়া হয়। তারা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন করে। তখন থেকে বাংলা অঞ্চলে বাংলা সন প্রচলনে শিথিলতা আসে। পাকিস্তান আমলেও বাংলা সন সরকারীভাবে উপেক্ষিত ছিল। বাংলা বর্ষপঞ্জীকে সমেয়োপযোগী করার লক্ষ্যে১৯৬৬ সালে জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে সভাপতি করে তৎকালীন বাংলা একাডেমী বাংলা বর্ষপঞ্জী সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সেই কমিটি কর্তৃক প্রণীত সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জী যা শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জী নামে পরিচিত। শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জী আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের ন্যায় একটি আদর্শ বাংলা সনের বর্ষপঞ্জী। আজকে আমাদের স্বাধীন ভূ-খন্ড আছে, পতাকা আছে, মানচিত্র আছে ভাষা-সংস্কৃতি আছে। নেই সর্বস্তরে বাংলা সনের প্রচলন। সরকার প্রঞ্জাপনের মাধ্যমে সর্বস্তরে বাংলা সনের প্রচলনের নির্দেশ দিলেও তা সর্বত্র মানা হচেছ না। এটা দুঃখজনক। আইনের প্রয়োগে জাতীয় চেতনাবোধকে জাগ্রত করাতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বে-সরকারী উদ্যোগেও পদক্ষেপ নিতে হবে। ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ, বাংলা সন বাস্তবায়ন পরিষদ, হৃদয়ে ৮ ফাল্গুনসহ বেশকিছু সংগঠন গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। আমরা আমাদের নিজেদের পরিবারে যদি বাংলা সনের প্রচলনের অভ্যাস গড়ি। স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে,পত্রিকা-মিডিয়ার সংবাদে এবং সকল চিঠি-পত্রের স্বাক্ষরে বাংলা সনের চর্চা করি। তাহলেই বাংলা সন প্রচলনের ব্যাপকতা বাড়বে। দেশ- জাতির জাতীয় প্রয়োজনেই সর্বস্তরে বাংলা সনের প্রচলন জরুরী।