সম্ভাবনার বাংলাদেশ বাংলা ভাষায়

0
153

বরুণ ব্যানার্জী:

আমরা মূলত প্রাণের দিক থেকে, অন্তরের দিক থেকে ভাষাহীন। কারণ আমাদের নিজেদের কোনো চিন্তা নেই। আর চমস্কির সূত্র ধরে বলতে চাই, ‘ভাষা এখন আর যোগাযোগের জন্য নয়, ভাষা মূলত চিন্তার জন্য।’ দৃষ্টান্ত? একজন বাঙালি, বা বহু আবাঙালিই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছেন, সে দেশের ভাষা তারা শিখছেন কেবল কাজ চলানোর জন্য। অফিসের কাজ, দোকানের কাজ, বাজারসদাইয়ের জন্য। এটা দিন, ওটা নিন- এর ইংরেজি বা জার্মান শিখছেন। কিন্তু সেই ভাষা দিয়ে যেহেতু তারা কোনো চিন্তা করেন না, তাই সেই ভাষা আসলে তাদের হয়ে ওঠেনি। সেই ভাষা থেকে তারা না নিজের জন্য কিছু নিতে পারছেন, না আমাদের কিছু দিতে পারছেন। সেই ভাষা তাদের আসলে কোনো কাজেই আসে না। ফলে যার চিন্তা নেই তার ভাষা নেই, বা যার ভাষা নেই তার চিন্তা নেই। ‘আমি ভাত খাবো’, ‘আমাকে এক পোয়া ডাল দিন’- এটা তো ভাষা নয়। ভাষা হলো চিন্তার, ভাষা হলো অস্তিত্বের চিন্তাময়-স্মারক।
হুমায়ুন আজাদ তার ‘বাংলা ভাষার শত্রু-মিত্র’ বইতে যা বলেছেন তাতে আমরা প্রায় সবাই এখনও আর যাই হোক বাংলা ভাষার মিত্র হয়ে উঠতে পারিনি। আমাদের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নাম ইংরেজিতে, আমাদের পণ্যদ্রব্যের নাম ইংরেজিতে। বাংলা যে নেই তা নয়। কিন্তু তাতে বাংলা ভাষার যে দৈন্যদশা সেটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় না। আমরা খুব জাপানের কথা বলি। তারা তাদের ভাষায় সব কিছু সারছে। আমাদের এও দেখতে হবে প্রায় মরে গিয়েছিল এমন একটি ভাষা হিব্রুকে একেবারে জীবন্তভাবে ব্যবহার করছে ইসরায়েলিরা। যেটা সংস্কৃত, ল্যাটিনের ব্যাপারে এখনও চিন্তা করা যায় না। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সর্বত্র ও বিচিত্রগামী হয়ে ওঠার ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের জনগণকে মূলত শিক্ষার দিকে নিয়ে যেতে পারব। নইলে যেটা হবে, সেটা হলো ভাষাটা একটি যান্ত্রিক অবস্থায় পড়ে থাকবে। এর সঙ্গে অন্তরের কোনো যোগ তৈরি হবে না। আর যন্ত্র কখনও শেষ সত্য নয়, এ পৃথিবীটা প্রাণের আর মানুষের। বস্তু মানুষেরই নিয়ন্ত্রণে চলে। কিন্তু যেহেতু আমাদের ভাষা এখন ভাষার স্তরে যেতে পারেনি, উচ্চতর জ্ঞানবিদ্যা চর্চার ভাষা হয়ে ওঠেনি, তাই পণ্যশাসিতদের চালেই আমরা চলছি। নিজেরাও পণ্যশাসিত হয়ে গিয়েছি। বিচিত্র সব এজেন্সি বা দালালচক্র আছে, যারা সুকৌশলে বাংলাকে সরিয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে তাদের খুব ভয়।  বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে অনেক ছক ভেঙে তৈরি হওয়া। শুরুতেই এর সম্ভাবনা ছিল বিরাট। কিন্তু সেটি হলে অনেকের অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেই ব্যবসাটা যাতে চালু থাকে, তাই বাঙালির চেতনা ও প্রাণের মূলশক্তি বাংলা থেকে বাঙালিকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমরাও অনেকে জেনে ও না জেনে ‘বাংলাছাড়ো’ নামে এক নীরব আন্দোলনে সমবেত।  তারপরও এর বিপরীতে বিদ্যা ও জ্ঞান চর্চায় বাংলায় ফেরার ভেতরেই আমাদের বাংলাদেশের প্রকৃত সম্ভাবনাটিকে কেউ কেউ ভালোবেসে জারি রাখছেন। একুশের বইমেলায় তার কিছু নমুনা পাওয়া যায়। কিন্তু সেসব আড়ালে আবডালে পড়ে থাকে। ওই আড়াল থেকে বের হয়ে বেশি পরিমাণ মানুষের কাছে যখন বাংলা ভাষার সুফল পৌঁছবে, তখন সত্যি সত্যিই আবার জমবে মেলা বাংলার পথে-প্রান্তরে। বাংলার কথা, গানে, জ্ঞানে এবং প্রজ্ঞায়, বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে বিশ্বের আঙিনা মুখর হবে।