সংকট সমাধানে রাজনীতিতে সুবাতাস

0
48

বরুণ ব্যানার্জীঃ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে জোর প্রস্তুতি। রাজনীতির ময়দানে কেবল নির্বাচনী ডামাডোল। সাধারণ মানুষও নির্বাচনের হিসাব কষতে শুরু করেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি, তাই আগামী নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আলাদা এক উৎফুল্লতা বিরাজ করছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অতীত এবং বর্তমান কর্মকাণ্ডের নানা দিক উঠে আসছে মানুষের কথোপকথনে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় আগামী নির্বাচন সবার কাছেই অতি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন পছন্দের প্রতীকে সিল মেরে নিজেদের সুস্থ চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটানোর জন্য।গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বর্ধনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন সবার চাওয়া-পাওয়ার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিএনপির নানা অপকর্ম দলটিকে রাজনীতির মাঠে খলনায়কে পরিণত করে। এই সুযোগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন চৌদ্দদলীয় মহাজোট সরকার গঠন করে ভালোভাবেই দেশের শাসন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি সরকারের দমন-পীড়ন ও নিজেদের নানা অন্তর্কোন্দলে পড়ে রাজনৈতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আত্মতুষ্টিতে দিন পার করছে। নির্বাচন বিচ্ছিন্ন বিএনপি নিজেদের আরো পরিশুদ্ধ করে আগামী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে, এমনটিই ধারণা সবার। সবকিছু বিবেচনায় মনে হচ্ছে আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। সামনের নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক শক্তিশালী নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র তার পূর্ণরূপ ফিরে পাবে বলে বিশ্বাস করছে এ দেশের সুশীলসমাজ।

একাদশ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে বর্তমান সরকার তাদের দায়িত্বশীল কর্মতৎপরতা দেখাবে এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ইলেকশন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে-যা সবার প্রত্যাশা। সবদিক মাথায় রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজেদের নির্বাচনমুখী করে গড়ে তুলতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্র থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত চলছে নির্বাচনী মহড়া। সাধারণ মানুষের মন জয় করতে দলের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে দেওয়া হচ্ছে নানা দিক নির্দেশনা। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন নির্বাচনী তৎপরতা সব শ্রেণিপেশার মানুষকে দিয়ে যাচ্ছে প্রস্তুত হওয়ার তাগাদা। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত সব নেতাকর্মী সমর্থক গোষ্ঠীর মাঝে আলাদা চাঙ্গা মনোভাব ফুটে উঠছে।গত ৭ মে জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সভাকক্ষে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এ বৈঠক ছিল নির্বাচন সংশ্লিষ্ট। বৈঠকে দলীয় সংসদ সদস্যসহ স্বতন্ত্র আরো ১১ জনের আওয়ামী লীগে যোগদানবিষয়ক সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কঠিন চ্যালেঞ্জের। নিজেকে দায়িত্ব নিয়ে জনগণের ভোটে জিতে আসতে হবে।’ তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে আরো বলেন, ‘আমার কাছে নিয়মিত জরিপ প্রতিবেদন আসছে। এলাকায় কার কী অবস্থা জানি। যার প্রতিবেদন খারাপ, যারা এলাকায় দলাদলি করছেন, দলে বিভক্তি তৈরি করছেন, তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জোয়ারে এমপি হয়েছেন, তারা জানেন না, নির্বাচন কত কঠিন। যারা এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের কর্র্মীদের নিয়ে চলেন, জনসম্পৃক্তহীন হয়ে পড়েছেন, ত্যাগী কর্মীদের থেকে দূরে সরে গেছেন, তারা মনোনয়ন পাবেন না।’

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, নির্বাচন বর্জনের মতো বৃহৎ ভুল বিএনপি আর করবে না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিও পিছিয়ে নেই। তারাও চালিয়েছে প্রস্তুতির ব্যাপক তৎপরতা। ২০৩০ সালে দেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা’সহ ৩৭টি বিষয়ে ২৫৬ দফা সংবলিত ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গত ১০ মে বুধবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে রাজনীতিতে নতুন ধারা ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ ভিশন তুলে ধরেন তিনি। যা নির্বাচনী প্রস্তুতির একটা বড় অংশ। বিএনপি চেয়ারপারসনের ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণার পর দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ঘোষিত এ ভিশনকে সামনে রেখে তারা আগেভাগেই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অসংখ্য নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে এমন প্রতিক্রিয়া ও তথ্য জানা গেছে।সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এমন প্রত্যাশা সবার মনে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগাম প্রস্তুতিতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অতীতের হযবরল নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে ক্ষমতাসীন হলেও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে মাঝে মাঝে অতৃপ্তি লক্ষ করা গেছে। তাই বর্তমান নির্বাহী প্রধান কোনো মতেই চাইবেন না দেশে আরেকটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর ভাবনায় রয়েছে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী বেশে আবারও ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এর জন্য প্রয়োজন শেখ হাসিনা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনমুখী করতে হবে। যাতে করে আগামী নির্বাচন সর্বজন গ্রহণযোগ্য হয়। এক্ষেত্রে বিএনপিকেও নমনীয় হতে হবে। কাঁধে পা রেখে বড় বড় কথা বললে চলবে না। নির্বাচন বর্জনের ফল মিষ্টি না তেতো তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে বিএনপি। এখন প্রয়োজন সুস্থ চিন্তা ও সঠিক সিদ্ধান্তে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

LEAVE A REPLY