শিমুল বিশ্বাসকে নিয়ে বিএনপিতে অসন্তোষ

2
206

অনলাইন ডেস্ক :

গত শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপির সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল। সেই সাত সদস্যের বাইরে চেয়ারপারসনের একজন বেতনভুক্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি নিয়ে দলে চলছে চাপা অসন্তোষ। আগেও এ কর্মকর্তা দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করেছেন। তার কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার দেখা হওয়ার সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায়। অনেকে বলছেন, পরিকল্পনা করেই এমন আচরণ করেছেন শিমুল বিশ্বাস। কাউন্সিলের পর কমিটি ঘোষণায় তার প্রভাবের কারণেই তারেক রহমানের পছন্দের লোকজনও বাদ পড়েন। আবার ঘোষিত কমিটিতে সেই কর্মকর্তার হস্তক্ষেপের কারণে সিনিয়র-জুনিয়রিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি উপেক্ষিত হয়। যে কারণে বিএনপি নেতাদের বড় একটি অংশ এখনো নিষ্ক্রিয় রয়েছে। এমন অনেক অভিযোগ আছে চেয়ারপারসনের এই বিশেষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

দলের একটি সূত্র জানায়, বিএনপি প্রতিনিধিদলে চেয়ারপারসনের একজন কর্মকর্তার রহস্যজনক উপস্থিতিতে এক ধরনের অজানা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈঠক শুরুর সময় আচমকাই তাকে দেখতে পান উপস্থিত নেতারা। বিএনপি নেতাদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসে আছেন শিমুল বিশ্বাস। অথচ বাসা থেকে রওনা হওয়ার সময় তিনি চেয়ারপারসনের সঙ্গে ছিলেন না। খালেদা জিয়ার সঙ্গে আরো তিনজন কর্মকর্তা থাকলেও কেউ মিটিংয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু কী কারণে প্রতিনিধিদলে নাম না থাকা সত্ত্বেও সেই কর্মকর্তার উপস্থিতি ঘটে। তা নিয়ে চলছে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক। তা ছাড়া নেতারা তার স্পর্ধা দেখেও রীতিমতো ‘থ’ বনে যান।

বৈঠক শেষে বিএনপির সিনিয়র নেতারা একে অন্যের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন। এতে তারা এক ধরনের অজানা আশঙ্কায় ভুগছেন বলে জানা যায়। নাম না থাকা সত্ত্বেও তার উপস্থিতি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তা ছাড়া চেয়ারপারসন আসার আগেই তিনি কীভাবে হোটেলে প্রবেশ করলেন তারও হিসাব মেলাতে পারছেন না সিনিয়র নেতারা। তারা প্রত্যেকেই শিমুল বিশ্বাসের উপস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে রাজি নন। প্রায় ২৯টি মামলার মধ্যে ১০টির পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি হাইসিকিউরিটির ব্যূহ বেধ করে কীভাবে গেলেন তা নিয়েই যত প্রশ্ন। বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এতদিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার প্রভাবের কাহিনি আমরা দেখেছি। তা ছাড়া চেয়ারপারসনের অফিসের কর্মকর্তা হিসেবে তিনি আগ থেকেই যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এটাকে স্বাভাবিকভাবে দেখলেও গত শুক্রবারের ঘটনা কোনোভাবেই হালকা করে নেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারি এজেন্সির সহযোগিতায় কাজ করার অভিযোগ এতদিন থাকলেও তা মনে হয় হাতে-কলমে এবার প্রমাণ হলো। এভাবে বিএনপির বৈঠকে যদি সরাসরি সরকারের এজেন্ট উপস্থিত থাকে তাহলে কাজ করাও তো বিপজ্জনক হচ্ছে। আমরা যতদূর দেখেছি, সরকার বিএনপি নেতাদের তৎপরতা দেখে মামলার গতি বাড়ায় ও কমায়। এভাবে সরকারের এজেন্ট যদি খোদ চেয়ারপারসনের অফিস এবং বাসায় থাকে তাহলে দলটির সিক্রেসি বলে আর কিছু থাকে না।

শি চিনপিংয়ের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকে শিমুল বিশ্বাসের অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দিন ধরে তোলপাড় চলছে বিএনপির গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও। দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এ ঘটনায় রীতিমতো বিস্মিত। তিনি এ নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারেন বলে জানায় একটি সূত্র। চীনের প্রেসিডেন্টের সফর ঘিরে যেখানে পুরো ঢাকা শহর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছিল, সেখানে বিএনপির প্রতিনিধিদলের সদস্য না হয়েও কী করে পুরো ৪০ মিনিট ওই বৈঠকে শিমুল বিশ্বাস বসে থাকতে পারলেন, এর হিসাব মেলাতে পারছেন না বিএনপির তৃণমূল থেকে অন্য অনেক নেতা। দলের এক নেতা জানান, আইনের চোখে শিমুল একজন পলাতক আসামি। তার নামে মামলা আছে ৪৭টি। এসবের মধ্যে অন্তত ১০টিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি আছে। কিন্তু পুলিশ তাকে ধরার উদ্যোগ নেয়নি একবারো। অথচ আদালতে হাজির হয়ে জামিন না নিলে বিএনপির অন্য নেতাদের বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে থাকে পুলিশ। বিএনপি নেতাদের মতে, রহস্যময় কারণে ওই ধরনের কোনো চাপ নেই শিমুল বিশ্বাসের ওপর। তার কারণেই খালেদা জিয়ার অফিস থেকে ফিরে আসেন প্রধানমন্ত্রী। এজনই এবারের কমিটিতে ঘটে যত রকমের গোল। তিনি চেয়ারপারসনের বাসায় থেকে যা করছেন বিএনপির জন্য তা রীতিমতো আত্মঘাতী। যদিও বারবার সে অভিযোগ অস্বীকার করছেনে শিমুল বিশ্বাস। রোববারও তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

নেতাদের কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে এ কথাও বলছেন, খালেদা-চিনপিং বৈঠকের তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার জন্যই শিমুলকে আগেভাগেই বৈঠকস্থলে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। এ কারণে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাকে ঢুকতে সাহায্য করেছেন। গত তিন দিন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, শীর্ষপর্যায়ের বৈঠকে দলীয় প্রতিনিধি ছাড়া কর্মকর্তা পর্যায়ের কারো উপস্থিতির এমন ঘটনা নজিরবিহীন।

খালেদা জিয়া ছাড়াও বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য নাম দেওয়া হয়েছিল দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, নজরুল ইসলাম খান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান সাবিহউদ্দিন আহমেদ ও রিয়াজ রহমানের। যানজটে আটকা পড়ায় রিয়াজ রহমান সময়মতো বৈঠকে উপস্থিত হতে পারেননি। ফলে তার আসনটি খালি থাকে এবং ওই আসনে গিয়ে প্রথম সারিতেই বসে থাকেন শিমুল বিশ্বাস। প্রটোকলে না মিললেও গুলশান কার্যালয়ের ক্ষমতাবান ব্যক্তি শিমুল বিশ্বাসকে উপস্থিত বিএনপি নেতারা আসন ছাড়ার কথা বলতে পারেননি। অন্যদিকে চেয়ারপারসনও তাকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেননি।

এদিকে প্রভাবশালী দেশগুলো গুরুত্ব দেওয়ায় হাইকমান্ডে স্বস্তি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো বিএনপিকে গুরুত্ব দেওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে দলটির হাইকমান্ড। বিরোধী দলে না থাকলেও প্রভাবশালী দেশগুলোর সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিনিধি দেশে এলেই বিএনপির সঙ্গে বৈঠক করছেন তারা। অথচ প্রটোকলে না থাকলেও বিএনপিকে গুরুত্ব দেওয়ায় স্বস্তি আছে বিএনপির সব পর্যায়ে। বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বৈঠককে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, সরকার যতই বলুক আর নাটক করুক সরকারের পাতানো বিরোধী দলকে সুযোগ না দিয়ে বিএনপিকেই সে চেয়ারে বসিয়েছে। সরকার শত চেষ্টা করেও পারেনি বিএনপিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে আলাদা করার জন্য। ভবিষ্যতেও আর পারবে না তারা।