“রোহিঙ্গাদের দুর্দশার অবসান কোথায়? “

217
870

আব্দুল্লাহ্-আল-মামুন:

আসলেই রোহিঙ্গা কারা? কি তাদের পরিচয়? বিষয়টা একটু পরিস্কার করা প্রয়োজন মনে করছি,নবম-দশম শতাব্দীতে আরাকান রাজ্য ‘রোহান ‘কিংবা ‘রোহাঙ’নামে পরিচিত ছিল। সেই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবেই রোহিঙ্গা শব্দের উদ্ভব। রোহিঙ্গারা পুরাতন বর্মা, অধুনা মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন (আরাকান) প্রদেশের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়। আরাকানি মুসলিমরা হাজার বছর ধরে সেখানে বসবাস করলেও মুসলমান ও বাংলাভাষী হওয়ার কারণে তারা বছরের পর বছর ধরে নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। এমনকি মিয়ানমার সরকার ও নাগরিকরা রোহিঙ্গাদেরকে’ বিদেশি’, ‘বাঙালি’ ও অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। সাম্প্রতিক সময়ে পাঠক সমাজের অনেকেই ভাবতে পারেন, রোহিঙ্গা সংকট মনে হয় ইদানিং মিয়ানমার সরকার কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যা। কিন্তু ইতিহাস তার ব্যতিক্রমধর্মী কথা বলে, রোহিঙ্গারা প্রথম নির্যাতনের স্বীকার হয় ১৭৮৪ খ্রীস্টাব্দে, যখন বার্মার রাজা আরাকান দখল করে নেন। এরপর রোহিঙ্গারা হত্যা, ধর্ষণসহ নানা নির্যাতনের স্বীকার হয়। এসব নির্যাতনের সব মাত্রা ছাড়িয়ে যায় ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পরে। এ ছাড়া ১৯৭০ দশকের পর থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ বন্ধ করা হয়। ১৯৭৪ সালে কেড়ে নেয়া হয় তাদের ভোটাধিকার। আর ‘৭০ ও ‘৭৪ সালে উল্লেখিত আইনের মাধ্যমে মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার অচল হয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও শোষনের হাতিয়ারে পরিণত হয় এ নতুন আইন। এরপর ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বড় ধরণের গোষ্ঠী নির্মূল অভিযান শুরু হয়। ‘অপারেশন নাগা মিন’ নামের ঐ কার্যক্রমে ‘অবৈধ অভিবাসী’ দের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ঐ সময়ে রোহিঙ্গাদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন নেমে আসে। তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়, মসজিদগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়, অনেক নারীকে হতে ধর্ষণের শিকার হয়। এরপর দ্বিতীয় অভিযান শুরু হয় ১৯৯১ সালে। এছাড়া ২০১২ সালে সংঘটিত হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেখানে নিহত হয় ২শ জন রোহিঙ্গা। এর পরবর্তী ঘটনা ২০১৬ সালে যা মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জীবন থমকে গিয়েছিল। এখানে যদি তাদের নির্যাতনের মাত্রা থেমে থাকত তা হলেও রোহিঙ্গারা কোনো মতে দিনানিপাত করতে পারতো। কিন্তু এটা যেন শেষ হওয়ার নয়। আবার এ অব্যাহত ধারার সূত্রপাত শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত চৌকিতে ‘রোহিঙ্গা জঙ্গি’দের হামলার জেরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। আর এ সংঘর্ষের ফলে প্রাণ বাচাতে বিপুল রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। তাদের মতে, দেশটির সেনাবাহিনীসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্র“পের মধ্যে সংঘাত বেড়েই চলছে। নির্যাতন সয়ে সয়ে এবার প্রতিরোধ করছে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা, এ বার তারা প্রতিরোধ শুরু করেছে। কেন তারা প্রতিরোধ করবে না? আরাকান রোহিঙ্গা ‘সালভেশন আর্মি ‘জানিয়েছে, সেনাবাহিনী কর্তৃক তারা আক্রান্ত হওয়ার পরে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেছে। আর সেনাবাহিনী এ আক্রমণ শুরু করেছে রাখাইন রাজ্য ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাতিসংঘের কফি আনান রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে মায়ানমার সরকারের কাছে পেশের চার ঘন্টা পরেই। যদিও মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী বলছে, ‘রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি’ তথা সরকার কর্তৃক ঘোষণাকৃত জঙ্গিগোষ্ঠী মূলত আগে সেনা চৌকিতে আক্রমণ করছে। তাদের কথায় মেনে নিলাম। আর রোহিঙ্গাদের আক্রমণ বা প্রতিরোধ যুদ্ধের পিছনে বরং লজিক ঢের বেশি। কেননা বিগত দশকগুলোতে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের উপর যা করছে তা সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। যেমন-রোহিঙ্গাদের নাগরিক সুবিধা না দেয়া, চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, নাগরিকত্ব বাতিল, বিভিন্ন রকম অন্যায় ও অবৈধ পন্থায় কর আরোপ, জমি জবর দখল, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, শক্তি প্রয়োগ করে শ্রমে নিয়োগ, বিচারবহির্ভূতভাবে গ্রেপ্তার করা, বিবাহের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেয়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান তথা মৌলমানবিক চাহিধা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে শেষ সীমাটুকু অতিক্রম করেছে। সম্প্রতি নরকীয় হত্যাকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই জাতিসংঘ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, তুরস্ক সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা মিয়ানমার সরকারের এহেন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা প্রকাশ করে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও তৎসংশ্লিষ্ট অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে অনুরোধ করেছে। কিন্তু তাদের কথায় বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে রোহিঙ্গাদের উপর নিপিড়ন প্রক্রিয়া সচল রেখেছে। আর এ ভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে রোহিঙ্গাদের জনজীবন ক্রমাগত অনিষ্ট থেকে অনিষ্টকর হয়ে উঠবে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের বসে থাকলে চলবে না। তাদের কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন-বর্তমানের চেয়ে আরও আদর্শগত ভিত্তিতে সুসংগঠিত হওয়া, কোন জোঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ততা না থাকা, নিজেদের মৌলমানবিক চাহিদা পুরণে জাতিসংঘের সাথে একযোগে কাজ করা, নিজেদের প্রয়োজনীয় দাবিসমূহ বিশ্ব দরবারে যৌক্তিকতার সাথে উপস্থাপন করা, প্রয়োজনীয় দাবি-দাওয়ার নিরিখে শান্তিপূর্ণভাবে সামরিক ও বেসামরিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া। এতে বিশ্ববাসীর টনক নড়বে। আর রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ আসলেই বাংলাদেশ নামটা চলে আসে। কেননা মিয়ানমার বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। শুধু তাই নয়, আরাকান অধ্যুষিত রোহিঙ্গারা জাতিগতভাবে মুসলিম। আর এ কারণে বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান। আর একে পুঁজি করে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা পরতে পরতে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের এদেশে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। কেননা স্বল্প আয়তনের দেশে যদি ক্রমাগতভাবে উদ্বাস্তরা আসতে থাকে তাহলে তাদের ব্যবস্থাপনা এ দেশের পক্ষে কষ্টসাধ্য। বাংলাদেশ সরকারের উচিত যারা ইতিমধ্যে নিয়মের বেড়াজাল অতিক্রম করে দেশে এসেছে তাদের উপযুক্তভাবে দেখভাল করা, আর মিয়ানমারের সাথে সঠিক কুটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে রোহিঙ্গাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। মূল কথা, এমতাবস্থায় মিয়ানমার সরকারেকে বিষয়টাকে সামরিকভাবে বিবেচনায় না এনে রাজনৈতিকভাবে সামনের দিকে অগ্রগামী হওয়া, যাতে করে বিষয়টা দ্রুত সুরাহা হয়।এছাড়া মানবিক বিবেচনায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের জন্য যে টুকু প্রয়োজন, সেটুকু রোহিঙ্গাদের প্রদান করা উচিত। সর্বশেষে সৃষ্টিকর্তার কাছে এ টুকু মিনতি, আর কত রোহিঙ্গা মুসলিমদের আগুনে পুড়তে হবে, মা-বোন ধর্ষিত হবে, নিরীহ মানুষকে বুলেটের সামনে মাথা নত করতে হবে, নিষ্পাপ শিশুদের বলি হতে হবে, মজলুমের আহাজারিতে পৃথিবী কম্পিত হবে…..হে প্রভু ওদের সুমতি দাও!!ওদের সুমতি দাও!!!ওদের সুমতি দাও!!…..।

 লেখকঃ
আব্দুল্লাহ্-আল-মামুন
সমাজকর্ম বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

217 COMMENTS