রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ত্রিকালমুখী

0
287

বরুণ ব্যানার্জী:

উনবিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তাঁর পিতার নাম জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ও মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ার দুই বোন করিমুননেসা ও হুমায়রা, আর তিন ভাই। এক ভাই শৈশবে মারা যায়। পিতা ছিলেন প্রভাবশালী ভূ-স্বামী। তৎকালীন মুসলিম সমাজ ব্যবস্থা অনুসারে রোকেয়া ও তাঁর বোনদের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়নি। ঘরে আরবি ও উর্দু শেখানো হয়। এখনকার মত তখনও ধর্মীয় গোঁড়ামি, অবাস্তব সমাজ ব্যবস্থা, মোল্লাদের অবৈজ্ঞানিক ধর্মীয় তত্ত্ব, পশ্চাদপৎ চিন্তাচেতনা ছিল ভীষণ ও ভয়ঙ্কর। মুসলিম মেয়েদের বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা ছিল নিষিদ্ধ। রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের ছিলেন উদার ও গোড়ামিমুক্ত। তিনি ধর্মের যুক্তিহীন ব্যবস্থা ও মানবতা বিবর্জিত নির্দেশনার বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। তাই তিনি রোকেয়া ও করিমুননেসাকে ঘরের মধ্যে গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখাতে শুরু করেন। এভাবে রোকেয়া আরবির পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজিতেও দক্ষতা অর্জন করেন। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় । বিয়ের পর তিনি ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর স্বামী ছিলেন মুক্তমনা মানুষ। রোকেয়াকে তিনি সাহিত্যকর্মে নিয়োজিত হবার উৎসাহ দেন। অধিকন্তু একটি স্কুল নির্মাণের জন্য অর্থ আলাদা করে রাখেন। স্বামীর উৎসাহে রোকেয়া সাহিত্যচর্চা শুরু করেন।  যে সময়ে নারীদের শিক্ষা অর্জনের কথা ভাবাই যেত না, সেই সময়ে বেগম রোকেয়া পরিবার ও সমাজের সমস্ত প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে শিক্ষার্জনে ব্রতী হন। তার সেই সাধনার পথ ধরেই রচিত হয় নারী শিক্ষার পথ। তারপর দিনে দিনে প্রশস্ত হয় সেই পথ। তারই ফলশ্রুতিতে আজ শিক্ষা ও সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে নারীদের সদম্ভ পদচারণা।  মহিয়সী এই নারীর জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাসের মধ্য দিয়ে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গ সমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা Sultana’s Dream, যার অনূদিত রূপের নাম ‘সুলতানার স্বপ্ন’। এটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক ধরা হয়। এ ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য বই হলো- ‘পদ্মরাগ’, ‘অবরোধবাসিনী’ ও ‘মতিচুর’। এ ছাড়া তার লেখা প্রবন্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বোরকা’। সে সময় তিনি ‘নারীর অধিকার’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। অসচেতন নারী সমাজকে সচেতন করার জন্য তিনি আহ্বান করেছেন, ‘ভগিনীরা! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন, অগ্রসর হউন! মাথা ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল ভগিনী! আমরা আসবাব নই; বল কন্যে আমরা জড়োয়া অলঙ্কাররূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বলো আমরা মানুষ।’ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন স্মরণে বাংলাদেশ সরকার একটি গণউন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে পৈতৃক ভিটায় ৩ দশমিক ১৫ একর ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। এতে অফিস ভবন, সর্বাধুনিক গেস্ট হাউজ, ৪ তলা ডরমেটরি ভবন, গবেষণা কক্ষ, লাইব্রেরি ইত্যাদি রয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের ৭ম বিভাগ হিসেবে রংপুর বিভাগের একমাত্র পুর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ ৮ অক্টোবর ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ হিসেবে তাঁর নামকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম রাখা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় । এছাড়াও, মহিয়সী বাঙালি নারী হিসেবে বেগম রোকেয়ার অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসনের জন্য “রোকেয়া হল” প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাঙ্গালী নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের আজ জন্ম ও মৃত্যুদিন। তাই প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুদিবসকে বেগম রোকেয়া দিবস হিসেবে পালন করা হয়।