রাগ দিপক গায়ো, তেথি মারানা পায়ো কিংবদন্তি ওস্তাদ তানসেন

0
186
প্রথম ছয় মোগল সম্রাট শিক্ষা ও সংস্কৃতি, বিশেষ করে চিত্রকলা বিকাশের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। হুমায়ূন এর সূচনা করলেও সত্যিকারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আকবর। আকবরের প্রতিষ্ঠিত ফতেহপুর সিক্রি ছিল শিল্পী ও গুণী ব্যক্তিদের জন্য আদর্শ স্থান।
ওই সময়ের বিখ্যাত ইতিহাসলেখক আবুল ফজল তার আকবর নামা ও আইনে আকবরির মাধ্যমে আকবরের রাজসভার গুরুত্বপূর্ণ চিত্র স্থায়ী করে গেছেন। আকবর অনেক প্রতিভা আকৃষ্ট করেছিলেন। চিত্রকলার প্রতি যে আকবরের বিশেষ আকর্ষণ ছিল, সেটা আবুল ফজল তার আইনি আকবরির একটি বিশেষ অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। সেরা দুই চিত্রকর ছিলেন আবদুস সালাদ ও মির সৈয়দ আলী। দুজনই ছিলেন ইরানি। বাকির ছিলেন প্রধানত হিন্দু। শিল্পীরা মিনিয়েচার আর্টের দুটি শাখায় বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। এ দুটি হচ্ছে: বইকে চিত্র দিয়ে সাজানো এবং প্রতিকৃতি আঁকা। প্রতিকৃতি আঁকার সময় শিল্পীর প্রধান লক্ষ্য ছিল মিল রাখা। এই প্রেক্ষাপটেই আকবরের দরবারে দ্যুতি ছড়ানো নবরত্নের অঙ্কিত বর্ণনা পেয়েছি। এই নবরাত্নের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ তানসেন। আইনি আকবরিতে রাজদরবারের শিল্পীদের নিয়ে একটি পুরো অধ্যায়ই রয়েছে।
তিনি বলেছেন, এসব লোকের জাদুকরি শক্তির কথা বলে শেষ করা যায় না। অনেক সময় অন্তরের অন্তঃস্থলে সৃষ্ট অপূর্ব সৃষ্টি জিহ্বা দিয়ে বের হতো, অনেক সময় হাত আর কার্ডের মাধ্যমে আবির্ভূত হতো। সুরের ঝঙ্কার কানের জানালা দিয়ে প্রবেশ করে আবার আগের জায়গায় ফিরে যেত। শ্রোতারা তা শুনে তাদের বোঝার শক্তি অনুযায়ী দুঃখে কাতর হতো, কিংবা আনন্দে ফেটে পড়ত।
সম্রাট আকবর সঙ্গীতের প্রতি অনেক নজর দিতেন, শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তার দরবারে হিন্দু, ইরানি, তুরানি, কাশ্মিরি, নারী, পুরুষ – অনেক শিল্পী ছিলেন। দরবারে সঙ্গীতজ্ঞদের সাতটি বিভাগ ছিল। প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত ছিল এক দিন করে।
আবুল ফজল তার রচনায় মিয়া তানসেনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গোয়ালিয়রের মিয়া তানসেন। তার মতো শিল্পী ভারতবর্ষে দুই হাজার বছরের মধ্যে দেখা যায়নি।’
তানসেনের জন্ম তারিখ নিশ্চিত নয়। তবে কিংবদন্তি রয়েছে, তিনি আকবরের আগে মারা গিয়েছিলেন। তার স্মরণে সম্রাট নিজে একটি দোহা লিখেছিলেন বলে প্রচার রয়েছে।
তানসেনের প্রাথমিক জীবন ও ক্যারিয়ারও রচনা করা কঠিন। তার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় খুবই কম। বাদাউনি লিখেছেন, তানসেনের হাতেখড়ি হয় মোহাম্মদ আদিলের (তিনি আদালি নামেই বেশি জনপ্রিয় ছিলেন) কাছে। এমনও বলা হয়ে থাকে, বান্ধগড়ের রাজা রামচাঁদ তার সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে একটি স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিয়েছিলেন।
আকবর নামায় আবুল ফজল লিখেছেন, গোয়ালিয়রের কলাবন্তদের মধ্যে তানসেনের খ্যাতি একপর্যায়ে রাজদরবারে পৌঁছে। তিনি তাকে দরবারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন।
মোগল রাজদরবারে তানসেনকে নিয়ে অনেক কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে। আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীরও অনেক কিংবদন্তি লিখে রেখেছেন।
আবার স্বামী হরিদাসের সাথে আকবর ও তানসেনের সাক্ষাতের বর্ণনাও রয়েছে। তখন নাকি তানসেন ভুল করেছিলেন, হরিদাস তা ঠিক করে দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তানসেন বলেছিলেন, ‘জাঁহাপনা, আমি গান গাই রাজদরবারে, আর আমার শিক্ষক গান খোদার দরবারে।’
অনেকে এই নাটকীয় ঘটনাকে সত্যি বলে মনে করে। এ নিয়ে ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কৃষানগড় মিনিয়েচারও তৈরি হয়ে যায়।
নয়া দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে তানসেনের যে প্রতিকৃত আছে তাতে তাকে লম্বা, কালো বর্ণের, তীক্ষ্ণ নাসিকার লোক হিসেবে দেখা যায়। তার হাত দুটি ছোট, আঙুলগুলো স্পর্শকাতর। মনে হচ্ছে সুরে বিভোর।
বোম্বাইয়ের প্রিন্স অব ওয়েলস মিউজিয়ামে আরেকটি প্রোট্রেট দেখা যায়। সেখানে তাকে গান গাইতে দেখা যায়। প্রোটেটে পারসি ও হিন্দিতে পরিচিতি দেওয়া রয়েছে। পারসিতে লেখা রয়েছে: সাহিব তানসেন কলাবন্ত আজদিল্লি মারফাত মাহানাথ। অর্থাৎ এটা তানসেন কলাবন্তের ছবি। দিল্লি থেকে এটি এনেছে মহানাথ।
হিন্দি লেখাটি আরো মজার। এতে কলাবন্ত তানসেনের কথা বলে একটি শ্লোক লেখা রয়েছে: রাগ দিপক গায়ো, তেথি মারানা পায়ো (তানসেন রাগ দিপক গাইলেন, তার চমৎকার গানে তার দেহে আগুন ধরে গেল।)