রমজানেও যানজট কমছে না

0
92

বরুণ ব্যানার্জীঃ

রাজধানীর মানুষ নানা দুর্ভোগ নিয়ে বাস করে। এরমধ্যে প্রতিনিয়তই ভয়াবহ যানজটের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাজধানীবাসীর জন্য যানজট খুব চেনা দৃশ্য হলেও, রমজান মাস এলেই এ চিত্র আরো ভয়াবহ হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও তেমনটাই লক্ষ করা যাচ্ছে। অথচ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন। ঈদ ও রোজাকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির দরিদ্র মানুষ রাজধানীতে আসে উপার্জনের আশায়। তাদের একটা অংশ হঠাৎ করেই রিকশা চালায়। এসব নতুন আগন্তুকের নেই শহরের পথঘাট চেনা। জানা নেই সড়কে গাড়ি চালনার ন্যূনতম বিধি। এরা রোজার মাসে যানজটকে বাড়িয়ে দেয় আরেক ধাপ। এবার রোজা শুরুর আগেই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজট দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাফিক বিভাগ চেষ্টা করলেও অনেক ক্ষেত্রে সফলতা আসেনি। তাই এবারও রোজায় যানজট থেকে নিস্তার পাওয়ার ভরসা করতে পারছে না নগরবাসী।

দেশের অবকাঠামো দুর্বলতা, শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। প্রতিবছর দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অবৈধ পথে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশে বিনিয়োগে অনাস্থা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার পেছনের কারণগুলোর সঙ্গে সুশাসন ও জননিরাপত্তায় আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ব্যর্থতার পাশাপাশি বন্দর, সড়ক-মহাসড়ক ও নগরীতে যানজট পরিস্থিতি অন্যতম অনুঘটক। গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও ফুটপাতের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখার পেছনে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের দুর্নীতিবাজরা সর্বদাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব খাতে বছরে ১৮২৫ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়ে থাকে বলে বিআইজিডির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছুটির দিনগুলোতেও যানজটের নিয়তি এড়ানো নগরবাসীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মহাসড়কগুলোতে প্রায়ই লেগে থাকে মহাযানজট। দেশের অগ্রগতি থামিয়ে দিচ্ছে এ ভয়ঙ্কর সমস্যা। সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড় সমান কথা। সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য বসে থাকে না। যানজটের কারণে যে সময় নষ্ট হচ্ছে অর্থনীতির বিচারে তা ভয়াবহ। এ সমস্যা উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দেশের রফতানি-বাণিজ্যকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বিদেশিরা বাংলাদেশের রাজধানীকে অস্বস্তির দৃষ্টিতে দেখেন যানজটের কারণে। যেসব কারণে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে যানজট তার অন্যতম। এ সমস্যা সমাধানে পূর্বসূরিদের মতো বর্তমান সরকারের উদ্যোগ থাকলেও তার অবস্থা কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই-এর মতো। সরকার রাজধানীর যানজট সমস্যা সমাধানে ফ্লাইওভার চালুসহ নানা প্রকল্প গ্রহণ করলেও প্রতিটি প্রকল্পেই রয়েছে সমন্বয়হীনতা। একই সঙ্গে বলা যায়, রাজধানীর যানজট নিরসনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল নির্মাণই যথেষ্ট নয়, ট্রাফিক ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানীর ফুটপাত ও রাজপথ অবৈধ দখলমুক্ত না হলে যানজটের থাবা ঠেকানো দুরূহ হয়ে পড়বে। যানজট নিরসনে যেখানে সেখানে পার্কিং বন্ধ ও চলাচল ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে হবে। রাজধানীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত এবং যেখানে সেখানে পার্কিংয়ের প্রবণতা রোধ করা গেলে যানজট অন্ততপক্ষে ৯০ ভাগ নিরসন করা সম্ভব হবে। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও ফুটপাত অপদখলের সঙ্গে রাজনৈতিক টাউট, মাস্তান ও প্রশাসনের উৎকোচভোগীদের স্বার্থ থাকায় তাদের নিরস্ত করতে কেউ এগিয়ে আসছে না।

উৎপাদনের জন্য যে সময় ব্যয় হওয়ার কথা তা গিলে খাচ্ছে এ সমস্যা। গত এক দশকে যানজটে অপচয় হওয়া সময় ব্যবহৃত হলে বাংলাদেশ অনেক আগেই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতো। ফলে এ সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিক প্রয়াসই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত।