‘মানুষের সেবায় আজীবন নিজেকে বিলিয়েছেন কাজী সাঈদ’

0
138
নিজস্ব প্রতিনিধি:
অন্তহীন শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় আবারও সিক্ত হলেন গনমানুষের নেতা কাজী সাঈদুর রহমান সাঈদ। বুক ভরা ভালাবাসার টান হৃদয় জোড়া মমতা আর শেকড়ের বাঁধনে আটকা  পড়া প্রয়াত সেই মানুষটির নাম উচ্চারণ করেই সবাই বলে উঠলেন, ‘তিনি ছিলেন দরদী মানুষ, যার ভাবনা ছিল দরিদ্র  মানুষকে নিয়ে , যার চেতনা ছিল ঠিকানাবিহীন মানুষের ঠিকানা খুঁজে পাবার দিকে। বারবার তাই কাজী সাঈদ নিজেকে সমর্পণ করেছেন আন্দোলন  সংগ্রামে মিছিলে মিটিংয়ে সমাবেশে। আন্দোলনে দৃশ্যমান সফলতা দেখতে না পেয়ে কখনও কখনও নিজেকে স্বেচ্ছা  কারাবরণের  ঘোষনা দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য জীবনব্যপী সংগ্রাম ও ত্যাগে  প্রস্তুত। আবার আন্দোলনে  শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে কারাবরণ করেছেন প্রখ্যাত ন্যাপ নেতা কাজী সাঈদ।’
শনিবার সকালে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে জেলা নাগরিক কমিটি আয়োজিত এক বিশাল নাগরিক শোকসভায় তার শুভাকাংখীদের  উচ্চারিত ভাষায় এমন চিত্র ফুটে উঠেছিল। প্রেসক্লাব চত্বরে কালো ক্যানভাসে ঘেরা প্রয়াত নেতা কাজী সাঈদের  প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে তারা বলেন ‘তোমার অসমাপ্ত কাজে গতি ফিরিয়ে সম্পন্ন করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আমরা তোমার সেই পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চাই’। এর পরই প্রেসক্লাব মিলনায়তনে তারা সমবেত শ্রদ্ধায় অবনত হন। তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তারা বলেন কাজী সাঈদ দুঃখী মানুষের জন্য যে সংগ্রাম করে গেছেন তা চির স্মরণীয়   হয়ে থাকবে।’
নাগরিক শোকসভায়  গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তার বহুদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী তালা কলারোয়া আসনের সংসদ সদস্য জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি  এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ বলেন, কাজী সাঈদ তার জীবনকে দরিদ্র মানুষের সেবায় উৎসর্গ করে গেছেন। অকৃতদার হিসাবে নিজেকে  পরিবার ও সংসারের কলেবর থেকে দুরে রেখে দুরের লোককে আপন  করে নিয়েছেন। ভূমিহীনদের সুখ দুঃখে তাদের হাসি কান্নায় তিনি মিশে গিয়েছেন। নিজেকে নিয়ে নয়, তিনি ভেবেছেন তাদের ভবিষ্যতের কথা। তাদের অধিকার রক্ষা করাই ছিল তার রাজনৈতিক এজেন্ডা। এজন্য পথে ঘাটে মাঠে তিনি সংগঠিত করেছেন প্রতিবাদী মানুষদের। নিপীড়ণ থেকে তাদের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন তিনি। সংগঠিত করেছেন দরিদ্র নারীদের। তাদের চোখেমুখে দেখিয়েছেন আলোর ঝিলিক। কাজী সাঈদ ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে খাসজমি ভূমিহীনদের হাতে তুলে দেওয়ার আন্দোলন করেছেন। বাস্তুহারা মানুষকে বাস্তুভিটা তৈরি করে দিতে তিনি ছিলেন সব সময় সোচ্চার।  তিনি কথা বলেছেন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে  । আদালত অবমাননার জুজুকে তিনি ভয় পাননি। বরং ন্যায় বিচার আদায়ে কাজ করেছেন। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন গনমানুষের নেতা।
জেলা জাসদ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী রিয়াজ বলেন, ‘কাজী সাঈদ ছিলেন  সাতক্ষীরার সকল গনতান্ত্রিক ও অধিকার আদায় আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। তিনি সাহস নিয়ে কথা বলেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। মানুষের দুঃসময়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর  কাজ করেছেন। নিঃস্বার্থ এই মানুষটির ছিল বহুমুখী  গুন। তিনি সততা ও স্বচ্ছতার সাথে  কাজ করেছেন।’
জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন বলেন, ‘তিনি ছিলেন নিরহংকার মানুষ। তার পোশাকে আশাকে ছিল জীর্নতার ছাপ। তবু তিনি আন্দোলন  সংগ্রামকে প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে গ্রহন করেছেন। জেল জুলুমের পরোয়া না করেই তিনি রাজপথে মিছিল নিয়ে গেছেন। পথসভা করে তিনি মানুষকে জাগরিত করেছেন। তাদেরকে সচেতন করে আন্দোলনে শরিক করিয়েছেন। তিনি অধিকার বঞ্চিত  মানুষকে সঠিক দিশা দিয়েছেন।
জেলা  জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান আশু বলেন, ‘কাজী সাঈদ ছিলেন ভূমিহীন মানুষের নিকট বন্ধু , আর ভূমিখেকোদের প্রতিপক্ষ। তিনি সরকারি খাস জমি জবরদখলকারী ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তাদের তাড়িয়ে  ভূমিহীনদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’
জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পিপি এড. সৈয়দ ইফতেখার আলি  বলেন, কাজী সাঈদ ছিলেন নিরহংকার মানুষ। তার চোখেমুখে ফুটে উঠতো বিদ্রোহের ভাষা । কন্ঠে উচ্চারিত হতো হুংকার। একজন অকৃতদার মানুষ হিসাবে তিনি নিজের পথ খোঁজেননি, তিনি পথ দেখিয়েছেন ভুখানাঙ্গা মানুষদের। তাদের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের ভূমি অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এসব বিষয় নিয়ে ভেবেছেন কাজী সাঈদ। দারিদ্রজয়ী এই মানুষটি কথনও  নিজের সম্পদ বৃদ্ধির চিন্তা করেননি।’
সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সভাপতি এড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কাজী সাঈদ আমাদের গণতান্ত্রিক পথে  হাঁটতে শিখিয়েছেন। তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। জনগনের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা সম্প্রসারণের কাজ করে গেছেন। তিনি সাতক্ষীরার সব আন্দোলনের সাথে নিজেকে একাত্ম করে  নিয়েছিলেন। যেখানে দুর্নীতি সেখানেই কাজী সাঈদের প্রতিবাদ। যেখানে অনিয়ম, ভূমিদখল সেখানেই তিনি হাজির হয়েছেন।  রুখে দাঁড়িেেয়ছেন তার বিরুদ্ধে।’
সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পিপি এড. ওসমান গনি বলেন, ‘কাজী সাঈদ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন । কিন্তু আদালত পাড়ায় কোনো ধরনের ন্যায় বিচারহীনতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি এড. আবুল হোসেন বলেন, ‘কাজী সাঈদুর রহমান ছিলেন দুঃখী মানুষের নেতা। তিনি সাধারন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। কোনো পুরস্কার কিংবা প্রাপ্তির জন্য নয়  মানুষের কণ্যান করাই ছিল তার লক্ষ্য।,
জেলা বাসদ সমন্বয়ক এড. আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, ‘কাজী সাঈদের পরিচয় তিনি গনমানুষের নেতা। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধই ছিল তার রাজনীতি। এর মধ্য দিয়েই তিনি বাস্তুহারা মানুষের ঠিকানা খুঁজে পেতেন।
দৈনিক প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জি বলেন, ‘মন মানসিকতায় কাজী সাঈদ ছিলেন বীরত্বের অধিকারী । তিনি ছিলেন সাহসী ও নির্ভয় মানুষ। কোনো প্রলোভন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি ।’
সদর উপজেলা ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি এড. ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, ‘তিনি ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে জেল জুলুম সহ্য করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল দল ও মতের সাথে ছিল তার ঘনিষ্ঠতা ।’
বাকশিস সাধারণ সম্পাদক মোবাশ্বেরুল হক জ্যোতি বলেন, ‘কাজী সাঈদ সাধারণ মানুষের দুঃসময়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের সহায়তায় নিজের হাত সম্প্রসারিত করেছেন।’
জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইদ্রিস আলি বলেন,  ‘দারিদ্রের মধ্যেও কাজী সাঈদ সব সময় ছিলেন হাসিমুখ। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের ভাষায় অন্যের  মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন  তিনি।’
নারী মুক্তি সংসদের সভাপতি নাসরিন খান লিপি বলেন, ‘কাজী সাঈদুর রহমান তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতি করে বড় হয়ে উঠেছিলেন।  তিনি ছিলেন দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মুখপাত্র। তিনি সব সময় কাজ করেছেন তাদের নিয়ে।’
জেলা মহিলা পরিষদ সাধারণ সম্পাদক জোসনা দত্ত বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন বিরোধী সকল আন্দোলনে আমরা সব সময় পেয়েছি কাজী সাঈদকে। তিনি সমাজের সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সচেতন করে গেছেন।’
জেলা ন্যাপ সভাপতি হায়দর আলি শান্ত বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকে হারিয়েছি। তিনি ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক। সকল আন্দোলন সংগ্রাম ও রাজনৈতিক মাঠে তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণা।  তার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।’
জেলা বাসদ নেতা খগেন্দ্র নাথ ঘোষ বলেন, ‘কাজী সাঈদ নিজেকে কখনও নৈতিক স্খলনের মুখে ঠেলে দেন নি। শতদল একাডেমির সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন কাজী সাঈদ দেবহাটা কালিগঞ্জের ভূমিহীন আন্দোলন আর বাঁকাল  ইসলামপুরে ভূমিহীন আন্দোলন করে জনগনের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন।’
সাংবাদিক এড. এবিএম সেলিম বলেন, ‘কাজী সাঈদ নিজ দল ন্যাপের  মুখপাত্র সাপ্তাহিক নতুন বাংলা পত্রিকা হাতে নিয়ে মানুষের কাছে  গেছেন। তাদের সচেতন করেছেন।’
জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক সাংবাদিক অধ্যক্ষ  আনিসুর রহিমের সভাপতিত্বে  অনুষ্ঠিত নাগরিক শোক সভা সঞ্চালনা করেন কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলি নুর খান বাবুল।
সভাপতি  অধ্যক্ষ আনিসুর রহিম বলেন, ‘তিনি ছিলেন প্রতিরোধ আন্দোলনের পুরোধা। অন্যায় অনিয়ম দুর্নীতি ছিল তার শত্রু। গরিব মানুষের আবাসন, তাদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষা নিশ্চিত করানোই ছিল তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। নতুন বছরের শুরুতেই নতুন বই ও শিক্ষা উপকরণ হাতে নিয়ে সেই মানুষটিকে এখন থেকে আর দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কাছে যেতে দেখা যাবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, কাজী সাঈদ ছিলেন আমাদের রাজপথের সাথী। মানুষের দুঃখ দুর্দশায় তার হৃদয় কেঁদে উঠতো।  তিনি ছিলেন সাহসী পুরুষ। কাজী সাঈদের শুন্যতা তাই পুরণ হবার নয়।
দৈনিক সাতক্ষীরা/জেড এইচ