মহাশ্বেতা দেবী টিকে থাকবেন মানুষের মন ও মননে

0
132

অরুণ ব্যানার্জী :
বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল তারকা মহাশ্বেতা দেবীর দেহাবসান ঘটেছে চলতি বছরের ২৮ জুলাই। উভয় বাংলা, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, বিহার ও উড়িষ্যার বাংলা ভাষাভাষী নর-নারী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ সারা বিশ্বের কোটি কোটি সাহিত্যামোদী মানুষ তার মৃত্যুতে হয়েছেন শোকাভিভূত। মহাশ্বেতা দেবী বসুন্ধরার মুক্ত আলো-বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন ৯০ বছর। সময়ের অবয়বে সময়টা নিতান্ত অপ্রতুল নয়। কিন্তু প্রত্যেক গুণীজনের মৃত্যু তার গুণগ্রাহীদের কাছে অকাল মৃত্যু। তাই সময়ের মাপকাঠিতে তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু বলে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ্বের অগণিত ভক্তদের মাঝে মহাশ্বেতা দেবীর আকস্মিক মৃত্যু অকাল মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হয়। মহাশ্বেতা দেবী ঢাকায় ১৯২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃকুল ও মাতৃকুল ছিল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। তার বাবা মনীশ ঘটক কল্লোল যুগের বিখ্যাত কবি ও ঔপন্যাসিক। কাকা ঋত্বিক ঘটক সাংস্কৃতিক জগতের প্রবাদপুরুষ। বড় মামা অর্থনীদিবিদ Economic and Politics পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা শচীন চৌধুরী। মহেশ্বতা দেবীর মা ধরিত্রী দেবী ছিলেন একজন লেখিকা ও সমাজকর্মী। মায়ের মামাতো ভাই কবি অমিয় চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে প্রচণ্ড রাবীন্দ্রিক সে াতের বিপরীতে জোটবদ্ধ এক বলিষ্ঠ ও সাহসী কবি। মহাশ্বেতা দেবীর পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনায়। মহাশ্বেতা দেবীর শৈশব কেটেছে ঢাকায়। লক্ষ্মীবাজারে তাদের বাসা ছিল। পরে ছিলেন জিন্দাবাহার রোডে চলে আসেন। ঢাকায় ইডেন স্কুলের মন্টেশ্বরী ক্লাসে তার বাবা ভর্তি করে দেন তাকে। সেখানে শেখানো হতো ছড়া, গান ও নাচ। বাবা ছিলেন এসডিও। বদলিসূত্রে ঢাকায় ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে চাকরিস্থল স্থানান্তরিত হয় কলকাতায়। এসময় তার বাবা মহাশ্বেতা দেবীকে ভর্তি করে দেন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন স্কুলে। তখনও জীবিত ছিলেন কবিগুরু। সেখানে তিনি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েন। তখনো শান্তিনিকেতনে সহ-শিক্ষা ছিল। ছিল লেখাপড়ায় চমৎকার পরিবেশ।

একইভাবে ১৯৫৬ সালে সাগরময় ঘোষের অনুরোধে তিনি ধারাবাহিকভাবে দেশ পত্রিকায় লিখতে থাকেন ‘ঝাঁসির রানি’। এই প্রথম উপন্যাসই সাহিত্য অঙ্গনে এনে দেয় তাঁর ব্যাপক পরিচিত ও সুখ্যাতি। এরপর থেকে তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে তাঁর নিপুণ হাতের যাদুস্পর্শে প্রকাশিত হয়েছে ‘সুরুজ পাগরাই’, ‘জটায়’, ‘বেহুলার বারোমাস্যা’, ‘সাধু কানুয় ডাকে’, ‘৬ই ডিসেম্বরের পর’, ‘স্তন্যদায়িনী’, ‘বিবেক বিদায় পালা’, ‘অগ্নিগর্ভ’, ‘হাজার চুরাশির মা’, ইত্যাদি। সাহিত্য সাধনার এই পরিক্রমায় মহাশ্বেতা দেবীর জীবনবোধ নানা সমস্যায় কণ্টকিত হয়েছে বারবার। ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করে তিনি অধ্যাপনা পেশায় যোগদান করেন বিজয়গড়ে জ্যোতিষ রায় কলেজে। তার আগে ১৯৩৯ সাল থেকে রংমশাল কাগজে ছোটদের জন্য লেখালেখি শুরু করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর নবান্নের রূপকার বিজন ভট্টাচার্য্যরে সাথে তার বিয়ের সে সময়টা ছিল তাঁর জীবন সংগ্রামের কঠিন সময়। সংসার চালাতেন কখনো টিউশনি করে। আবার কখনোবা বিক্রি করতেন সাবানের গুঁড়ো। মাঝে একবার আমেরিকায় বাঁদর চালান দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু তার ভাগ্যলিপিতে সাফল্য ধরা দেয়নি। ’৪৭-এ দেশবিভাগের বছরে তার মালাবদল হয় বিজন ভট্টাচার্যের সাথে। কিন্তু মাত্র ১৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের মাঝে বেজে ওঠে বিচ্ছেদের সানাই। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে একমাত্র পুত্র নবারুণকে মহাশ্বেতা দেবী তাঁর বাবার কাছে রেখে চেয়ে চিন্তে একটি ক্যামেরা সংগ্রহ করে উঠে পড়েছিলেন আগ্রার ট্রেনে। তন্ন তন্ন করে রানির কেল্লা, মহালক্ষ্মী মন্দিরে ঢুকলেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে টাঙাওয়ালা, কাঠ কুঠোর আগুনঘিরে বসা কিষাণ মেয়েদের কাছ থেকে গল্প শুনলেন- ‘রানি মরেননি। কুন্দল গড়ের মাটি আর পাহাড় আজও ওকে লুকিয়ে রেখেছে’। প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের পর লেখক অসিত গুপ্তের সাথে তার দ্বিতীয় বিবাহ হয়। কিন্তু সে দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটে ১৯৭৬ সালে।

২০০৬ সালে ভারত সরকার তাকে Second Highest Creation Award দেন। ২০০৭ সালে তিনি সাহিত্যে SAARC পুরস্কার পান। ২০০৯ সালে তাকে সম্মানিত করা হয় Short listed for the Man Booker International Prize দিয়ে। এরকম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পুরস্কার দিয়ে তার লেখক ও সামাজিক সত্ত্বার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল বাতিঘর। কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় দীর্ঘ রোগভোগের পর। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় দিল্লি থেকে ২৮ জুলাই রাতেই কলকাতায় ফিরে আসেন। ২৯ জুলাই সকালে কলকাতার পিস হেভেন থেকে তার মরদেহ রবীন্দ্রসদনে আনা হয়। সেখানে অগণিত সাধারণ মানুষসহ মুখ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীসভার সদস্য কলকাতার মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় বিভিন্ন দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দুপুর ১-৫৮ মিনিটে তার শোকযাত্রা শেষ হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে, এরপরই কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে গান-স্যালুট দিয়ে তাকে অভিবাদন জানানো হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পন্ন হয় শেষকৃত্য। মহাশ্বেতা দেবী তার সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড দিয়ে বেঁচে থাকবেন বাঙালি ও নির্যাতিত মানুষের মনে ও মননে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

LEAVE A REPLY