বিশ্বজিতের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে হাইকোর্টের প্রশ্ন

0
126

অনলাইন ডেস্ক:

পুরান ঢাকায় দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাসকে চাপাতি দিয়ে কোপানোর দৃশ্য গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে সে অনুযায়ী রিপোর্টে তার শরীরে আঘাতের আলামত নেই। সেজন্য তার সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। ফরেনসিক চিকিৎসক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) গাফিলতি আছে কি না তা তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গণমাধ্যমে দেখানো দৃশ্য অনুযায়ী তার (বিশ্বজিৎ) শরীরে অনেক আঘাত থাকার কথা। কিন্তু রিপোর্টে সেই বিষয়টি না থাকায় দুই কর্মকর্তার ‘গাফিলতি’ আছে কি না তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব পালনে তাদের দুজনের পেশাগত অসদাচরণ আছে কি না তাও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের পর সুরতহাল তৈরির তদন্তে ছিলেন সূত্রাপুর থানার এসআই জাহিদুল হক। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ছিলেন মাকসুদ রহমান। সুরতহাল তৈরিকারী পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে পুলিশের একজন ডিআইজিকে ও চিকিৎসকের বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিব, ডেন্টাল কাউন্সিল, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে আদালতকে অবহিত করতে আইনজীবী মনজিল মোরসেদকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পুরান ঢাকায় দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় ঘোষণার সময় এই আদেশ দেন। ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল নজীবুর রহমান  জানান, ‘পুরান ঢাকায় দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাসকে চাপাতি দিয়ে কোপানোর সময় ধারণ করা দৃশ্য মিডিয়ায় যেভাবে দেখানো হয়েছে সে অনুযায়ী তার শরীরে অনেক আঘাত থাকার কথা। কিন্তু ফরেনসিক বিভাগের প্রতিবেদন ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) প্রতিবেদনে তেমন কোনো আঘাতের চিহ্ন উল্লেখ নেই। তাই আদালত তাদের দুজনের বিষয়ে অনুসন্ধান করে তথ্য দেয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের। তদন্তে গাফিলতির কারণে সাজা কমেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান এমনটি নয়। বিভিন্ন কারণে তাদের সাজা কমেছে। তবে মিডিয়ায় যেভাবে কোপানোর দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তাতে তার শরীরে অনেকগুলো আঘাত থাকার কথা। রিপোর্টে সেই বিষয়টি যথাযথভাবে না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বিশ্বজিতের শরীরে একটি কাটা ও দুটি জখমের কথা বলা হয়। আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে একটি কাটা ও একটি জখমের কথা বলা হয়। বিশ্বজিৎ দাসের সুরতহাল প্রতিবেদনে সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল হক লিখেন, ‘কোমরের ওপরে-পিঠে হালকা ফোলা জখম দেখা যায়। ডান হাতের পাখনার (বগলের) নিচে আনুমানিক তিন ইঞ্চি কাটা রক্তাক্ত জখম ও বাম হাঁটুর নিচে ছেঁড়া জখম রয়েছে।’ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক মাসদুল রহমান লিখেন, ‘পিঠে ডান কাঁধের (বগলের) নিচে সাড়ে তিন ইঞ্চি চওড়া দেড় ইঞ্চি গভীর একটি ছুরিকাঘাতের জখম ও বাম হাঁটুর জোড়ায় থেঁতলানো জখম রয়েছে। বগলের নিচে জখমের ফলে তার শরীরের একটি বড় ধমনি কাটা গেছে। শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো স্বাভাবিক ও ফ্যাকাসে এবং হৃৎপিণ্ডের দুটি প্রকোষ্ঠই ছিল খালি। ডান কাঁধের নিচে (বগলে) ও বাম হাঁটুতে জখমের চিহ্ন।’ বিশ্বজিৎ হত্যা নিয়ে সূত্রাপুর থানার পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আইনজীবীদের মিছিল ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া ছাত্রদের একটি মিছিল মুখোমুখি হলে সেখানে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। তখন বিশ্বজিৎ দৌড়ে যেতে থাকলে ২০-২৫ জন মিছিলকারী হাতে চাপাতি, রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করে ভিক্টোরিয়া পার্কসংলগ্ন উত্তর পাশের পেট্রলপাম্পের মোড়ে তাকে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। প্রাণে বাঁচতে বিশ্বজিৎ পাশের একটি মার্কেটের দোতলায় একটি দন্ত চিকিৎসালয়ের বারান্দায় যান। সেখানেও হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। বিশ্বজিৎ নিচে নেমে আসার পরেও তাকে আঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করা হয়। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্রলীগ ক্যাডাররা নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেন দর্জি বিশ্বজিৎ দাসকে। শাখারী বাজারে বিশ্বজিতের দর্জির দোকান ছিল। তিনি থাকতেন লক্ষ্মীবাজার। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর।