বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের জন্য জরুরি

0
57

বরুণ ব্যানার্জী:

চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা আমাদের সংবিধান খুব স্পষ্টভাবেই প্রত্যেক নাগরিককে দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে ‘…জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ-সাপেক্ষে’র কথাও লেখা আছে । চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার কথা যে বলা হয়েছে তা দুটি আলাদা শব্দ হলেও তার মর্মার্থ এক। অবাধ অর্থাৎ যা খুশি তা-ই চিন্তা করে তা প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, বিবেকসম্মত চিন্তার স্বাধীনতার কথাই বলা হয়েছে। বিবেকসম্মত চিন্তা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। বিবেকসম্মত চিন্তার সংজ্ঞা হচ্ছে সর্বসম্মতভাবে মানুষ যে কাজটি ‘ভালো’ এবং যে কাজটি ‘মন্দ’ বলে মনে করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো সেখানে মত প্রকাশের অধিকার থাকবে এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের অধিকার সুনিশ্চিত। কোনো মতামতে কারও ব্যক্তিগত অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। তিনি সংক্ষুব্ধ হতে পারেন। কিন্তু কারও মনে আঘাত লাগবে বলেই সে সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে বা লিখতে পারবে না, তা আমাদের বা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানই বলে না। বাংলাদেশে প্রায়ই কোনো নেতা বা ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে কটাক্ষ বা সমালোচনা করার দায়ে মানহানির মামলা হয়ে থাকে। তাতে অভিযুক্তের হয়রানির শেষ নেই। দিনের পর দিন আদালতে ঘুরতে হয়। একপর্যায়ে গিয়ে একটা মীমাংসা হয় বটে, কিন্তু বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষেরই অর্থ ও শ্রমের অপচয় হয়।
পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তির স্বাধীনতা বিষয়টি খুবই সুরক্ষিত। বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও সর্বোচ্চ। কিন্তু উপমহাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পক্ষেই অসহিষ্ণুতা অতি বেশি, যা আদালতে মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়ায়। আমাদের দেশে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বিভিন্ন দিক থেকে আসে। কোনো সংবাদ, তা যতই জনস্বার্থের পক্ষে হোক, কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই সাংবাদিকদের আসামি করা হয়। সংবাদ বা প্রতিবেদন ভুল বা মিথ্যা হলে তা সংশোধনযোগ্য। প্রতিবাদের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু আজকাল সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। অভিযোগ নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত না করিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে থাকে। সম্পাদক ও সাংবাদিকদের নাকে দড়ি দিয়ে দেশব্যাপী ঘোরানো হয়। অর্থাৎ অভিযোগ প্রমাণের আগেই শাস্তি।
কথায় কথায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কারণে মামলা, মানহানির মামলা বা আদালত অবমাননার মামলা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাউকে অসম্মান বা অমর্যাদা করাকে সমর্থন করতে পারে না। আদালতের মর্যাদা সমুন্নত রাখা নাগরিকদের কর্তব্য। নির্বাহী ও আইনপ্রণেতাদেরও দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের ও নাগরিক সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে না দেওয়া। স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার যেখানে স্বীকৃত, সেখানে তার অপব্যবহার হতেও পারে। তবু সেই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না।

LEAVE A REPLY