বাংলাদেশের প্রতি বজ্রপাত প্রকৃতির একটি নির্দয় প্রতিশোধ

0
52

বরুণ ব্যানার্জী:

‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’! প্রবচন যেন সত্যি হয়ে আসছে। মেঘ বৃষ্টি ছাড়াও বজ্রপাত হচ্ছে অহর্নিশ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আবহাওয়া সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বজ্রপাত! ভয়ংকর খবরটি হচ্ছে-প্রতিবছর বিশ্বে বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যায় তার এক-চতুর্থাংশ মারা যায় বাংলাদেশে। দুর্যোগ তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ মৃত্যুর দেশ। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালে ২৪৫ জন, ২০১৫ সালে ১৮৬, ২০১৪ সালে ২১০, ২০১৩ সালে ২৮৫, ২০১২ সালে ৩০১, ২০১১ সালে ১৭৯ জন বজ্রপাতে নিহত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর, বুয়েট, দুর্যোগ ফোরাম, গণমাধ্যমের তথ্য ও একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হিসাব মতে, গত ৬ বছরে সারাদেশে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। বজ্রপাতের এমন আচরণই বলে দিচ্ছে মানবজাতির কার্যক্রমের ওপর প্রকৃতি কতটা নাখোশ। মানুষের অধিক চাহিদা আর লোভে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্টের খেসারত হিসেবেই কি প্রকৃতির প্রতিশোধ এই বজ্রপাত? বিষয়টি এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে। বলা হয়ে থাকে বজ্রপাত প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি। তবে এটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর একটিও বটে। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে বজ্রপাতের ও প্রাণহানির সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। এই অস্বাভাবিকতার কারণ হচ্ছে বায়ুম-লে কালো মেঘের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝড়ো বাতাসেও ঘটছে বজ্রপাত।

বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে নানা তথ্য বেরিয়ে আসছে। দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে এখন মোবাইল ফোন আছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ার রয়েছে। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সন্ধ্যার পরে মানুষের ঘরের বাইরে অবস্থান বাড়ছে। বেশিরভাগ বজ্রপাতই হয় সন্ধ্যার দিকে। নদীর নব্যতা বিনষ্ট, জলাভূমি ভরাট, গাছ, বন-জঙ্গল ধ্বংস হওয়ায় দেশের তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বর্ষা আসার আগের মে মাসে তাপমাত্রা বেশি হারে বাড়ছে। এতে এই সময়ে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্দ্র বায়ু আর উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে বজ্রঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। যদিও বজ্রপাতে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচা খুবই কঠিন। তবে সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। একসময় দেশের বেশিরভাগ গ্রাম এলাকায় বড় গাছ থাকত। তাল, নারিকেল, বটসহ নানা ধরনের বড় গাছ বজ্রপাতের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে নিত। মনে রাখতে হবে আমরা বজ্রপাতের আওয়াজ শোনার আগেই তা মাটি স্পর্শ করে। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করাও বিপজ্জনক। শুকনো কাঠ দিয়ে ধাক্কা দিতে হবে। তালগাছ বজ্রপাত ঠেকায়! দেশের প্রায় সর্বত্রই তালগাছসহ বড় বড় গাছের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। জনমনে প্রচলিত আছে, আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনো বড় গাছের ওপর পড়ত। বজ্রপাতের রশ্মি গাছ হয়ে তা মাটিতে চলে যেত। এতে জনমানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আমরা এর দ্রুত বাস্তবায়ন কামনা করি।

LEAVE A REPLY