বন্যা মোকাবেলায় যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে

0
56

বরুণ ব্যানার্জী:

আবহাওয়া দপ্তর থেকে দেশে আগস্টের মাঝামাঝি বড় আকারের বন্যার একটি পূর্বাভাস ছিল।কিন্তু তা এতটা বড় এবং ভয়াবহ হবে, তা ধারণার বাইরে ছিল। বুধবার সরকারের তরফে দেশেরবন্যাপরিস্থিতির যে চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে তা এক কথায় উদ্বেগকর বলতে হবে। এখন পর্যন্তদেশের ২১ জেলায় ৩২ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি জেলায়বন্যাপরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নতুন নতুন জেলা আক্রান্ত হচ্ছে। তবে, আরো ভয়াবহ বন্যারবিপদের মুখে আছে বাংলাদেশ। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও তিস্তা অববাহিকায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি এবং চীনও ভারত যে মাত্রার বন্যার মুখে পড়েছে, ভাটির দেশ হওয়ায় তার চরম নেতিবাচক প্রভাব খুবশিগগির বাংলাদেশে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এরকম হলে পরিস্থিতি যে শোচনীয় আকারধারণ করবে, তা বলাই বাহুল্য। এ অবস্থায় জানমাল রক্ষার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে বন্যা একটি প্রাকৃতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশ নামের এই বদ্বীপ জনপদটি গঠিত হয়েছেবন্যাসৃষ্ট পলিমাটি দ্বারা। সংগত কারণে হাজার বছর ধরে বন্যার সাথে আমাদের বসবাস। বর্ষায়বর্ষণ টানা রূপ নিলে কিংবা ভাটির দেশ হিসেবে ভারতের বন্যার পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করলে ফিবছরই এই জনপদ বিশেষত উত্তরাঞ্চল বন্যা কবলিত হয়। সেই হিসেবে বন্যা আমাদের অস্তিত্বেরইঅংশ। এ দেশের জনগণও নিজস্ব কৌশলে বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় পারদর্শী।তবে, কোনো কোনো সময় পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। সে ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ ওক্ষয়ক্ষতিও পৌঁছে চরম পর্যায়ে। এ বছর টানা বর্ষণ ও উজানের পানির প্রবল চাপে সারা দেশেরবন্যাপরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি হিসেবে গত বুধবার পর্যন্ত বন্যায় ১০৭জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব এলাকায় ভেঙ্গে পড়েছে সড়কযোগাযোগ ব্যবস্থা। বাড়ি–ঘর ও রাস্তা–ঘাটপানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বন্যা কবলিত এলাকার মানুষদের। দুর্গতঅঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত পথ্যের অভাবে আমাশয়, পেটেরপীড়া, সর্দি–কাশি–জ্বরের প্রকোপও বেড়ে যাচ্ছে। খাদ্য, সুপেয় পানি, পানিজনিত রোগের চিকিৎসাসহ মৌলিক চাহিদাপূরণ না হওয়ায় বন্যাদুর্গত এলাকায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। সরকার বন্যার্তদের সাহায্য–সহযোগিতা করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে বানভাসি মানুষজন দাবি করছে। এ অবস্থায়বন্যাপরিস্থিতির মোকাবিলায় জোরালো সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পানিবন্দি মানুষের কাছে দ্রুতত্রাণ পৌঁছানোর বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও জোরালো হওয়াদরকার।
সম্প্রতি দ্য ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম–রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্ট (ইসিএমডব্লিউএফ)বলেছে, বাংলাদেশে এবার গত ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বন্যা হতে পারে। ভারত, নেপাল ওচীনে ভয়াবহ বন্যার কারণে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভাটির দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশে এবারেরবন্যা ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের বন্যার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। এ অবস্থায় বন্যা মোকাবেলায় যথাযথপ্রস্তুতির বিকল্প নেই। বন্যা মোকাবেলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতি ও সামর্থ্য প্রশংসনীয়।বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়সহ নানা দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা অভিজ্ঞ। এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টবন্যা এবং আরো বড় বন্যার মোকাবেলায় সে অভিজ্ঞতার আলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বন্যামোকাবেলায় আমাদের সর্বব্যাপ্ত ও বহুমাত্রিক প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ থাকলে জনদুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতিঅনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। উপকূলীয় বাঁধ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা ও সময়মতোসংস্কারের বিষয়টিও ভাবতে হবে। গৃহপালিত পশুপাখিগুলোর সুরক্ষার দিকেও নজর দিতে হবে।গণমাধ্যমে বন্যার সঙ্গে বসবাসের নিয়ম ও উপায়গুলো প্রচার করতে হবে। পানি নেমে যাওয়ারপরে কৃষি, অর্থনৈতিক কাজ–কারবার, যোগাযোগ, পড়ালেখা পূর্ণোদ্যমে চালু করার আগামপ্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে হবে। বন্যার পরে যাতে ডায়রিয়া বা পানিবাহিত রোগ ছড়াতে না পারে সেপদক্ষেপও নিতে হবে এখনি। পুনর্বাসন কাজও চালাতে হবে ত্রুটিহীনভাবে।