প্রয়োজনে কঠোরও হবেন মাহমুদ

0
41
অনলাইন ডেস্ক:
তিনি কোনো গড়পড়তা ক্রিকেটার নন। তাঁর ক্রিকেট জীবনালেখ্যও এক্সট্রা অর্ডিনারি! আজ কালজয়ী ইনিংস খেলছেন তো কালই আবার দলে অপ্রয়োজনীয় তিনি। নাম তাঁর মাহমুদ উল্লাহ। ঐতিহাসিক শততম টেস্টে ব্রাত্য তিনিই ঘটনাচক্রে আজ বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিতে নামছেন চট্টগ্রামে। কে জানে, আর কত শত রোমাঞ্চকর মোড় পাড়ি দিতে হবে মাহমুদকে!প্রশ্ন শুনে তিনি হাসেন, তবে বলেন চোয়ালবদ্ধ দৃঢ়তায়, ‘ক্রিকেটারের জীবনে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। এটাই স্বাভাবিক। চ্যালেঞ্জ জেতার এটা একটা সুযোগও।’ নেতাকে তো আর নিজেরটা নিয়েই ভাবলে চলে না, দলই সবার আগে। ব্যক্তিগত প্রশ্নেও তাই মূহূর্তে বাঁকবদল মাহমুদের লক্ষ্যে, ‘আমাদের জন্য তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ এই সিরিজটা।’অধিনায়কের টুপি মাথায় মঞ্চে বসা মাহমুদের সঙ্গে ড্রেসিংরুমের ‘রিয়াদ ভাই’কে মেলানো কঠিন। ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি নিয়মিত অধিনায়ক। তবে জাতীয় দলে অধিনায়কের সহকারী হয়েছেন দুই দফায়। দলের পাঁচ সিনিয়রের একজন হিসেবে অনেক দিন ধরেই ‘লিডারশিপ গ্রুপ’-এর একজন, কিন্তু সে অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ছিলেন না কখনোই। বরং দলের সর্বমহলে মাহমুদ একজন নির্বিবাদী ভদ্রলোক, যাঁকে দলের প্রয়োজনের কথা বলে ‘কুইনাইন’ও গেলানো যায়। যেভাবে তাঁকে বিভিন্ন সময় বাদ-টাদ দেওয়া হয়েছে আর কি! এই মাহমুদ মাঠে শান্ত, তবে ড্রেসিংরুমে ভীষণ আমুদে। তাঁর ‘স্টেপস’ অনুসরণ করেন অনেকেই!সেই তিনি আচমকা নেতা, যাঁকে সময়ে সময়ে কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে। পারবেন? খুব পারবেন মাহমুদ, ‘আমি যখন আমার বিজনেসে থাকব, তখন কোনো কিছুতেই আমি ছাড় দেব না। দলের ভালোর জন্য সব করব, অনুপ্রেরণা দিয়ে প্রয়োজনে কঠোর হয়ে; সব দিক দিয়েই চেষ্টা করব। সব কিছুর আগে বাংলাদেশের ক্রিকেট। বাংলাদেশ দলকে ভালো কিছু দিতে হবে। এটাই আমাদের দায়িত্ব, এটাই আমাদের কর্তব্য।’এই দর্শনে বাড়তি কোনো চটক নেই। পেশাদার ক্রিকেটে দলটাকে এক সুতায় গেঁথে প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেবেন অধিনায়ক—এ তো আর নতুন কিছু না। একই রসায়নে ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন অধিনায়কত্ব করে যাওয়া মাহমুদকে অধিনায়ক করার চিন্তাভাবনাও পুরনো। গত সব শেষ নিউজিল্যান্ড সফরের মাঝপথে তো তাঁকে তিন ফরম্যাটেই অধিনায়ক করার আলোচনা উঠেছিল বিসিবির অন্দরমহলে।তবে অবশেষে, বাংলাদেশের হয়ে টস করার প্রথম সুযোগটা মাহমুদ পেয়েছেন কিছুটা দৈবক্রমে। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ফিল্ডিংয়ের সময় আঙুলের চোট নিয়ে কার্যত শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ থেকেই ছিটকে গেছেন সাকিব আল হাসান। বোর্ড কর্তারাও এবার ট্র্যাক না বদলে টেস্টে সাকিবের সহকারীর ওপরই আস্থা রেখেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এভাবে পাওয়া নেতৃত্বটা উদ্বাহু উদ্‌যাপনও করছেন না মাহমুদ, ‘যেভাবে পেয়েছি, সেভাবে পেতে চাইনি অবশ্যই। সাকিব আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়। ওকে হারানো আমাদের দলের জন্যই বড় বিপর্যয়। ওর মতো টপ ক্লাস ক্রিকেটারকে মিন করা দলের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। এর পরও আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করছি। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারাও একটা সুযোগ। আর ব্যক্তিগতভাবে সবারই স্বপ্ন থাকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার…দেশকে লিড করা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে অবশ্যই এটা আমার জন্য দারুণ ব্যাপার।’ক্রিকেট অধিনায়কত্বের সিংহাসন যতটা মর্যাদার, ঠিক ততটাই উৎকণ্ঠার। চুন থেকে পান খসলেই যে সমালোচনা তাড়া করবে মাহমুদকে। তিনি মাশরাফি বিন মর্তুজা কিংবা সাকিব-তামিম ইকবাল নন, ফ্যান বেজ অতটা শক্তিশালী নয়। তাতে সমালোচনার তীব্র বিষে নীল হওয়ার সম্ভাবনা তো থাকছেই। আর ইদানীং আমজনতার প্রতিক্রিয়ার প্রভাব যে হারে পড়ছে বোর্ড কর্তাদের ওপর, তাতে এই সিরিজের অধিনায়ক মাহমুদের সামনেও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই।কঠিন চ্যালেঞ্জ বলেই মাহমুদকে ঘিরে আশার বাতাবরণ। ২০১৫ বিশ্বকাপে নড়বড়ে ৩ নম্বরে দুটি সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন তিনি। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আইসিইউতে ঢুকে পড়া বাংলাদেশ দ্রুতই বিছানা ছেড়েছিল মাহমুদের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে, যাঁর জীবনাচরণ ও দর্শনে আক্রমণাত্মক মেজাজের কোনো স্ফুরণই নেই।তবে সহকারী আর কর্মাধ্যক্ষের কার্যপরিধি তো এক নয়। একাদশ গঠন থেকে শুরু করে গেম প্ল্যান—প্রতিটা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মাহমুদকেই। পাঁচ দিনের ক্রিকেট হামেশাই রং বদলায়। সেই রঙের পোঁচ নিজের মনের মতো করার স্ট্র্যাটেজিস্ট হলেন ক্রিকেট অধিনায়ক। নির্ঝঞ্ঝাট ব্যাটসম্যানশিপের জীবনে সামনে এসে পড়া ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পাড়ি দেওয়ার একটা ফর্মুলাই জানা মাহমুদের, ‘মাঠে অধিনায়ককে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আপনি যদি শান্ত না থাকতে পারেন, তাহলে সিদ্ধান্তগুলো এদিক-সেদিক হয়ে যেতে পারে। এটা আমি বিশ্বাস করি। কুল থাকতে পারলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ। এটা আমি সব সময় করি। আমি যখন ঘরোয়া ক্রিকেটেও অধিনায়কত্ব করি, তখনো যতটা সম্ভব কুল থাকার চেষ্টা করি।’ছটফটানির টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও তো ধীরস্থির মাহমুদকে দেখা গেছে বিপিএলে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, সেটাও সাকিবের মতো শীর্ষ অলরাউন্ডারকে ছাড়া ম্যাচে ধীরস্থির থাকাটা মাহমুদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জই।আশার কথা তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। তাঁর অতীত তাই ভরসা জোগায়ও।