প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনর শিকার বাংলাদেশ

0
65

বরুণ ব্যানার্জী:

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সফল বাস্তবায়নে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুত সমস্যা সমাধানে বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ হুমকি মোকাবেলায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব সুসংহত করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। সম্প্রতি মরক্কোর মারাক্কেশে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ২২তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের উচ্চ পর্যায়ের অধিবেশনে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। মারাক্কেশে জাতিসংঘ আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ১১৫টি দেশের ৮০ জন রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান এবং মন্ত্রীরা অংশগ্রহণ করেন। জলবায়ুজনিক বাস্তুচ্যুত সমস্যা যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা কখনো অর্জন করা সম্ভব হবে না। বিশ্বের এই মহাসংকটময় সময়ে মারাক্কেশ সমম্মেলনের বিরাট তাৎপর্য রয়েছে। কারণ বিশ্বের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিশ্চয়তা নির্ভর করছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশলে ওপর। এটি কোনো দেশ বা জাতির একক সমস্যা নয়; গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার সমস্যা। গত বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবিলায় অর্থবহ সহযোগিতা গড়ে তুলতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তি চলতি বছর বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।  বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১১৯টি দেশ যদি তাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার পূরণ না করে, তা হলে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বিশ্বে যে পরিমাণে দুর্যোগ বাড়বে, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, তাতে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের প্রায় আট কোটি উপকূলবাসীকে বসতভিটা হারাতে হতে পারে।

জার্মানভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জার্মানি ওয়াচের ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বেশিরভাগই দরিদ্র। বাংলাদেশ ওই তালিকার প্রথম সারিতে রয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী বিগত ১৯ বছরে বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। আর মোট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩১২ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। এদিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পর বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যায় ডুবে যাবে। এতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে যাবে। তাপমাত্রা আড়াই ডিগ্রি বাড়লে বন্যায় প্লাবিত এলাকার পরিমাণ ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। ওই ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকার। ২০৫০ সালের মধ্যে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উপকূল অঞ্চলে আঘাত হানবে। এতে ৯০ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে যেতে পারে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২ কোটি লোক ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। এর মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনর প্রভাবের শিকার।

যতদিন যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ততই প্রকট হচ্ছে। বাড়ছে সমুদ্র উপকূলবর্তী, দ্বীপাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের জীবনমরণ সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অস্তিত্ব ঝুঁকির বিষয়ে সবার আরো বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। জাতিসংঘের মহাসচিবের কথা—সময় এখন আমাদের বিরুদ্ধে। এই পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের এখন এক জোট হওয়া অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY