প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যা বললেন আইনমন্ত্রী

0
66
অনলাইন ডেস্কঃ
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার ছুটি বিষয়ে রবিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়া সম্পর্কিত দু’টি চিঠি তিনি পড়ে শোনান। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন তিনি।
প্রশ্ন-উত্তর পর্বে সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পর তিনি নৈতিক স্খলনের দায়ে শপথ ভঙ্গ করেছেন কিনা? শপথ ভঙ্গ করলে তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে কিনা, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করবেন কিনা?’ এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে, আইন অনুযায়ী, যদি কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ওঠে, তার কিন্তু একটা প্রসেস আছে। এক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এলিগেশন যেহেতু উঠেছে, সেহেতু অনুসন্ধান করতে হবে। অনুসন্ধান করার পর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে নিশ্চয়ই পরবর্তী পদক্ষেপ যা হওয়া উচিত, সেই ব্যবস্থাই নেওয়া হবে। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, কেউ কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাই আইনে যা বলা আছে, সেটাই করা হবে।’
‘অভিযোগ ওঠার একদিন পরে সুপ্রিম কোর্ট বিবৃতি দিয়েছেন। এই অভিযোগ প্রধান বিচারপতির চলে যাওয়ার পর উঠলো কেন’—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন সুপ্রিম কোর্ট যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। সুপ্রিম কোর্ট যে বিবৃতি দিয়েছেন, সে ব্যাপারে আমি বিশেষভাবে কোনও কথা বলতে চাই না।’
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে থাকা প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১১ টি অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আরেক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে,  ‘১ অক্টোবর আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি বৈঠকে বসে ওই ১১টি অভিযোগ বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন। এরপর এসব গুরুতর অভিযোগ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেন এই পাঁচ বিচারপতি। তিনি ওই সব অভিযোগের ব্যাপারে কোনও সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হলে তার সঙ্গে বিচারালয়ে বসে বিচার কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এমন সিদ্ধান্তের পর ওইদিনই বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার হেয়ার রোডের বাসায় সাক্ষাৎ করে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেন ওই পাঁচ বিচারপতি। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পরও তার কাছ থেকে কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এরপর প্রধান বিচারপতিকে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, অভিযোগগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে বিচার কাজ পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা জানান, তিনি পদত্যাগ করবেন।’ এই যদি বিচারপতিদের বক্তব্য হয়, তাহলে আপনাদের প্রশ্নের জবাবে আমি বলব, যতক্ষণ পর্যন্ত এই ১১ এলিগেশনের ব্যাপারে সুরাহা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা হয়তো প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বেঞ্চে বসবেন না। তাহলে তিনি কী করে  এখানে এসে বসবেন? কারণ সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগের একক বেঞ্চের কোনও নিয়ম আছে বলে আমার জানা নেই।’’
আরেক প্রশ্নের জবাবে  আনিসুল হক বলেন, ‘এসব অভিযোগের বিষয় দুদক দেখবে। এই যে, তার বিরুদ্ধে এলিগেশনগুলো, এই এলিগেশনগুলোর যদি অনুসন্ধান হয়, সেখানে যদি এলিগেশনগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে তার ইনভেস্টিগেট মামলা হবে। মামলা হলে ইনভেস্টিগেশন হবে। ইনভেস্টিগেশন হওয়ার পরে প্রশ্ন আসবে—প্রধান বিচারপতির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সেক্ষেত্রে এই আইনে যা আছে, সেটাই করা হবে।’
সুনির্দিষ্ট আইনের পদক্ষেপটা কী হবে, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আইনের পদক্ষেপ কী হবে, তা কিন্তু প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আমি বলে দিয়েছি।’ তদন্ত কে করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, সব দুর্নীতির ইনভেস্টিগেশন কে করে। আমাকে কি বলে দিতে হবে এন্টি করাপশন কমিশন ২০০৪ সালের আইনে একটা ইনডেপেন্টে এন্টি করাপশন কমিশন আছে?’
এই অভিযোগগুলো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শুনবে কিনা—জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে কিনা, সে ব্যাপারে যে দ্বিমত আছে, তা আপনারা জানেন। এছাড়া আপনাদের আরেক প্রশ্নের জবাবে আমি বলেছি, ষোড়শ সংশোধনীর যে রায় হয়েছে, তার রিভিউ করব। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কিন্তু এই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে পুনস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমার আগের প্রেস কনফারেন্সে রি-অ্যাকশন দিয়েছিলাম। সেখানে বলেছি, এটা সঠিক হয়নি। এ ব্যাপারে একমাত্র আইন করতে পারে একমাত্র সংসদ। আমরা সেই বিষয়েই রিভিউ করব। এটা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যাপার বলে মনে হয় না।’
‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নেই আবার সংসদও নেই। এ সময়ে প্রধান বিচারপতি আপরাধী হলে তার বিরুদ্ধে কে ব্যবস্থা নেবে, আদৌ নেওয়া হবে কিনা’, এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এখানের একটা ব্যাপার আছে। এখানে একটা ব্যাপার হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির কিছু অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে। তিনি সেটা ব্যবহার করতে পারেন।’
প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও তাকে দেশের বাইরে কেন যেতে দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যেতে দেওয়া হলো কেন, প্রশ্নটা আমি তো বুঝলাম না। তিনি বিদেশে গেছেন, এখনও বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। নিজের নিজের মুখে তিনি বলেছেন যে, আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরেও আসবেন। আপনাদের এটা স্বীকার করতে হবে যে, প্রধান বিচারপতির আসন একটা প্রতিষ্ঠান। তাকে যদি কোনও ব্যাপারে অভিযুক্ত করতে হয় বা তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হয়, তাহলে সম্পূর্ণ আইনি-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। খামখেয়ালিভাবে একজন প্রধান বিচারপতি বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়াটা  উচিত হবে না।’
তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলো সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশ করাটা ঠিক হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যারা পাবলিক করেছেন, তাদের জিজ্ঞসা করুন।’
সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতির কারণে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যদি সুপ্রিম কোর্টকে নিয়ে কোনও বিতর্ক সৃষ্টি হয়, আমার মনে হয়, আইন ও প্রিন্সিপাল অব ন্যাচার অব জাস্টিস বলে, সেই প্রতিষ্ঠান একটা জবাব দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই বক্তব্য যারা দিয়েছেন, তারা এই ব্যাপারে এই বক্তব্য দিতে পারেন।’ এ সময় রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পাওয়া ১১ অভিযোগের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন,  ‘এসব বিষয়ে  ইনকোয়ারি হতে পারে, ইনভেস্টিগেশন হতে পারে। এসব ব্যাপারে আমি কোনও বক্তব্য দিতে রাজি নই।’
এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি ছুটি চেয়েছেন। তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন তিনি অসুস্থ। অবসাদগ্রস্ত। তিনি বিদেশ যেতে চান। তাকে বিদেশ যাওয়ার পারমিশন দেওয়া হয়েছে। তাকে কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। তাকে কেউ বলেনি, তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন।  তাহলে তো এসব প্রশ্নেরও কোনও সুযোগ নেই। আমি বলতে চাই, দেখুন টক-শোতে অনেকেই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অ্যাটাক করে কথা বলছেন, বলেছেন আমি নাকি মিথ্যা বলি। সেই ক্ষেত্রে সে সব অর্বাচীনকে আমি বলব, মিথ্যা না বলাটাই আমার অভ্যাস।’