প্রতিবাদের অগ্রনায়ক কাজী সাঈদ

0
73
মুনসুর রহমান:
যিনি সাধারণ মানুষের মুক্তির মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে সব সময় কাজ করার চেষ্ঠা করেছেন তিনি হলেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের দুধলি গ্রামের কাজী আশিকুর রহমান ছেলে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)  সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক  কাজী সাইদুর রহমান ওরফে কাজী সাঈদ। তার জম্মস্থান কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা গ্রামে হলেও তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামালনগর গ্রামে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতেন।
তিনি ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসাবে  রাশিয়ায়, মস্কো,  তাসখন্দ, তাজাকিস্তানসহ কয়েক স্থান সফর করে সমাজতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা  অর্জন করেছিলেন । মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর আদর্শ লালনের মাধ্যমে প্রতিবাদের অগ্রনায়ক হয়ে পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে  নির্যাতীত, নিপীড়িত ও অধিকার বঞ্চিত গণ মানুষের কল্যাণে আমৃত্যু রাজনীতি করেছেন তিনি।
তার হৃদয়ে ছিল বাস্তুহারা নারী পুরুষের বেদনা, আর মুখে ছিল প্রতিবাদের ভাষা। তাই তিনি খাস জমি রক্ষা মাধ্যমে ভূমিহীন মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৮৮ তে বাঁকাল ইসলামপুর চরে আন্দোলন শুরু করে। আর সেদিন ভূমিহীনদের অধিকার আদায় করেই  তিনি ফিরে ছিলেন ঘরে।
তিনি চিংড়িখালি, বৈরাগীর চক, বসুখালি,বিনেরপোতা, সাতক্ষীরা শহরের গড়েরকান্দা, শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, যমুনার চরসহ নানা এলাকায় ভূমিহীনদের স্বার্থ রক্ষায় ছুটে বেড়িয়েছেন এবং কর্মসূচি দিয়েছেন। তাদের সমবেত করেছেন বারবার। এবং এই আন্দোলনের জেরে বাঁকাল চর এলাকা ইসলামপুর ভূমিহীনচর নামে পরিচিত লাভ করে।
তার বক্তব্য আঘাত করেছিল দুনীতিবাজদের বুকে। তাই আন্দোলনের জন্য বহুবার কারাবরণ করেছিলেন তিনি। তবুও ক্ষান্ত হননি। তিনি জেল থেকে বেরিয়ে পুন:রায় ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের জন্য মিছিল মিটিং করেছেন। এবং দেবহাটা কালিগঞ্জের ভূমিহীন আন্দোলনে পথিকৃৎ তিনি। তার প্রচেষ্ঠায় আর ভূমিহীনদের সহযোগিতায় সেদিন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল জায়েদানগর।
তিনি কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তার পকেটে পাওয়া যেতো না  দশটি  টাকা।  কয়েক বছর আগে তিনি এক জেলা জজের দুনীর্তির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন। স্বেচ্ছায় কারাবরণ কর্মসূচি ঘোষণা করে সমাজকে সচেতন করে তোলেন তিনি। নানা বিষয়ে তিনি অনশন কর্মসূচি পালন করে অধিকার আদায় করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি মানববন্ধন করেছেন। কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে তার ছিল অনড় অবস্থান। মানববন্ধন সমাবেশ করে তিনি ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তবুও দারিদ্রকে উপেক্ষা করে বিগত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলেও হাল ছাড়েননি তার স্বপ্নের রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির। আর নিজের সামথ্য অনুযায়ী ঈদ পূজা এলে তিনি দরিদ্র মানুষের হাতে তুলে দিতেন কিছু খাদ্য এবং উপহার সামগ্রী। দুর্যোগে তিনি দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তবুও সেদিনের স্মৃতি আজও ভুলা যায় না। কারণ আমি সূর্যের আলো পত্রিকা অফিস থেকে রাত সাড়ে ১০ টায় ফিরে দীপালোক একাডেমী সামনের রাস্তা দিয়ে পাকাপোলের মোড় সংলগ্ন রাজ হোটেলে রাতের খাওয়া সারার জন্য ভিতরে যায় এবং যাওয়ার সাথে সাথে হোটেলের স্টাফ ইসমাইল আমার জন্য রুটি নিয়ে আসল। আমি প্লেটটি হাতে নিয়েই ডানে দেখতে পেলাম কাজী সাইদুর রহমানকে। তিনি আমাকে বললেন, আগামীকাল সকাল ১০ টায় সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সামনে দুনীর্তিবাজ শিক্ষক আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করবো। তুমি অবশ্যই আসবে বলে চলে যাওয়ার সময় হোটেল মালিক টাকা চেয়ে বসলেন। তখন তিনি একটু হাসি দিয়ে বললেন, আজকে টাকা নেই।
আগামী দিন দিব। হোটেল মালিক একটু ক্ষিপ্তি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাকে লাঞ্চিত করল না। তারপর আমি খেয়ে রাতে নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। এবং যথা সময়ে সকাল সাড়ে ১০ টার আগে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সামনে উপস্থিত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে দেখার সাথে সাথে গফ্ফারের চায়ের দোকানে দুাটি চায়ের  অর্ডার দিয়েছিল। গফ্ফার ভাই আমাদের খাওয়ার জন্য চা দিল। চা হাতে নিয়ে মুখে দিতেই ঘটে গেল অঘটন।
আর সে অঘটনের মূল নায়ক হলো সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক গোলাম সরোয়ার। তিনি প্রকাশ্যে কাজী সাইদুর রহমানকে গালাগালি শুরু করে দিল। কিন্তু কাজী সাইদুর রহমান নিরবে তা শ্রবণ করেন। এবং তিনি আমাকে বলেন, দুনীর্তিবাজ শিক্ষক আব্দুর রহমানের কাছ থেকে ওরা কয়েকজন নিয়মিত টাকা নিয়ে আসে। তাই এখানে অনুষ্ঠান না করার জন্য বাঁধা দেয়। কিন্তু কাজী সাইদুর রহমান সকল বাঁধা অতিক্রম করে প্রতিবাদ সভা সম্পন্ন করেছিলেন। আমার সৌভাগ্য সে প্রতিবাদ সভায় আমারও কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন কাজী সাইদুর রহমান। তিনি কখনও মানুষের সাথে খারাপ আচারণ করতেন না। তুবও কিছু কিছু সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ তাকে মূল্যয়ন করত না। তাই সেই দিনের স্মৃতি গুলো যখন চোখের সামনে ভাসে তখন আমি ঘুমাতে পারি না।
সাংবাদিক, শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক তথা অন্যান্য ব্যক্তিদের সাথে তার ছিলো আত্মার সম্পর্ক। কাজী সাইদুর রহমানকে চেনে না ও তার বক্তব্য শোনেননি এমন মানুষ মনে হয় সাতক্ষীরায় নেই। তিনি তার নীতি থেকে সরে দাঁড়ায়নি। সাম্প্রতিককালে  তিনি বিশ্বের  ক্রিকেট বিষ্ময় সাতক্ষীরার মুস্তাফিজকে নিয়ে কবিতার বই লিখেছিলেন। তিনি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন নির্মোহ ও নির্লোভ একজন মানুষ। ‘‘মানুষ মরলে পৃথিবী মনে রাখে না, কিন্তু ভূমি মনে রাখে।’’ অর্থাৎ ভূমিতে বসবাসরত সকল মানুষের অন্তরে সেবার মাধ্যমে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন। এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি,  ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের জটিলতায় ভুগছিলেন ।
তাই প্রায় সময় চিকিৎসা নিতে আসতেন সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ডাঃ এবাদুল্লাহ সাহেবের চেম্বারে। কিন্তু গত রোববার তার অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ  এন্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আর বুধবার বিকাল ৪টায় সকল লাঞ্ছনার অবসান ঘটিয়ে নিভৃতে কেঁদে খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে মারা যান। তার মৃত্যুতে সাথে সাথে সাতক্ষীরায় শোকের ছায়া নেমে আসে। আর সেই শোক ভুলতে না পেরে তার আত্মার প্রতি শান্তি কামনা করে বিভিন্ন সংগঠন দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। তাদের সকলের প্রতি কৃতঞ্জতা প্রকাশ করে আজকের লেখা শেষ করছি।
লেখক : মুনসুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদ সাতক্ষীরা জেলা শাখা।

দৈনিক সাতক্ষীরা/জেড এইচ