পাহাড়ের ক্ষোভ নিবারণে সু-দৃষ্টি প্রয়োজন

1
415

বরুণ ব্যানার্জী:

প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্প্রতি দেশে ঘটে গেছে বিপর্যয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড় ধসের ঘটনায় ১৫৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এতে দেশব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। এই নির্মমতা প্রকৃতির প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আর এজন্য কেবল মানুষই দায়ী। কারণ প্রকৃতিরও একটা নিয়ম আছে। সে আঘাত সইতে সইতে একসময় হুঙ্কার দিয়ে গর্জে ওঠে, ভয়ংকর প্রতিশোধ নেয়। আমরা জানি, পাহাড় হচ্ছে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী পিলার। পবিত্র কোরআনে পাহাড়কে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী ‘পেরেক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করে নিয়েছেন যে, পাহাড় হলো পৃথিবীর ‘পিলার। তাই পাহাড় প্রকৃতিকে তার মতো থাকতে না দিলে প্রতিশোধ সে নেবেই। এই প্রতিশোধ কেবল পাহাড় ধস, ভূমিধস নয় এর ভয়াবহতা আরো ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ মানুষ তার সীমাহীন লোভ ও লাভের লালসায় পাগলপারা হয়ে অকাতরে পরিবেশ নষ্ট করছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন এসব ঘটনা কি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টির আড়ালে হচ্ছে? নিশ্চয়ই নয়। পাহাড় কেটে বসতি, আবাসন, কটেজ বাণিজ্য এমনকি খামারও করা হচ্ছে। এসব কাজ হঠাৎ করে লোকচক্ষুর অন্তরালে করা সম্ভব নয়। প্রশাসন জেনেও কেন নিশ্চুপ থাকছে। বন পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ আইন এবং আমাদের পরিবেশবাদী সংগঠনের নজরের বাইরে কিছুই হচ্ছে না। তার মানে যারা করছেন তারা সরকার যন্ত্রের চেয়েও ক্ষমতাধর। স্থানীয় প্রশাসন কি তাদের কাছে নিতান্তই অসহায়?যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের বলয়ে বড় বড় নেতাসহ সাঙ্গোপাঙ্গরা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এসব অপকর্ম করে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করছেন। আর তার খেসারত দিচ্ছে হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ।পাহাড় রক্ষায় পাহাড়গুলোর ওপর এই অবিচার বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের সরিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে প্রচুর গাছ লাগিয়ে ঘন বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। পাহাড়ে ফলদ, ঔষধি বৃক্ষ হতে পারে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র। পাহাড় আছে এমনসব দেশের মতো পাহাড়ের স্তরে স্তরে টিলা কাটিং ‘স্লোপ’ পদ্ধতিতে পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নিসরণের ব্যবস্থা নিলে ধসের ঘটনা ঘটবে না। আমরা জানি, পাহাড়-পর্বত ও টিলারাশি সুরক্ষায় উন্নয়নে বিশ্বে অতুলনীয় এক নজির স্থাপন করেছে পাহাড়-পর্বতের দেশ নেপাল। দেশটিতে উঁচু পাহাড়-পর্বতের শানুদেশ ও ঢালুতে সিঁড়ির ধাপের মতো ‘স্লোপ’ সৃষ্টি করেছে। নেপালে স্লোপ অ্যাগ্রিকালচার ল্যান্ড টেকনোলজি বা ‘সল্ট’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর মৌসুমি ফল-ফসল, খেত-খামার এবং বনায়ন করা হয়েছে। এতে করে স্লোপের মাটি আলগা বা সরছে না। বরং মাটিক্ষয় কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। স্লোপ অতিক্রম করে বৃষ্টির পানি নিচের দিকে অপসারণ হচ্ছে। সল্টের কারণে পাহাড় রক্ষার পাশাপাশি এর সুফল ভোগ করছে প্রান্তিক কৃষকরা। তাই পাহাড়ের দেশ নেপালে বর্ষায় পাহাড় ধসের ঘটনা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক ধরনের গুল্মজাতীয় গাছ যার গুচ্ছ শেকড় মাটির অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়ে মাটির বন্ধন শক্তিকে আরো মজবুত করে তোলে। এ ধরনের গাছ লাগানোর পাশাপাশি আমাদের দেশীয় তালগাছ লাগানোর কথাও ভাবা যেতে পারে। তালগাছের শেকড়ও মাটির বন্ধন শক্তি বাড়ায়। এছাড়াও তালগাছ বজ্রপাত নিরোধক।

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY