পারিবারিক সংহতি ফিরিয়ে আনতে হবে

0
102

বরুণ ব্যানার্জী:

সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে সুখের ঘরে ঢুকে পড়ছে দুঃখের আগুন। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। ভেঙে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে প্রথমে ধরা হয় পরকীয়ার বিষয়টি। এ ঘটনায় একের পর এক তছনছ হচ্ছে সাজানো সংসার। বাড়ছে খুনোখুনির ঘটনাও। বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহের জেরে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু-সন্তানরা। পরবর্তীতে এ শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। শিশুকাল থেকে পিতৃ-মাতৃহীনতার কারণে ঢুকে যাচ্ছে অন্ধকার জগতে। তারা আক্রান্ত হচ্ছে নানা মানসিক রোগে এবং ঝরে পড়ছে বিদ্যাপীঠ থেকে।সম্প্রতি প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়, রাজধানীর দুটি সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন অস্বাভাবিক হারে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। তালাক দেওয়ার দিক থেকে এগিয়ে নারীরা। মোট তালাকের ৬৮ দশমিক ১৯ শতাংশ স্ত্রী এবং ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ স্বামীর পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে। গত ছয় বছরে ঢাকা মহানগরীতে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৩০ হাজার ৮৫৫টি। দৈনিক হিসাবে প্রতিদিন রাজধানীতে প্রায় ১৪ দম্পতির মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। মহানগরের ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এমন চিত্র পাওয়া যায়।

গত ছয় বছরে দুই সিটিতে বিবাহবিচ্ছেদের নোটিস পড়েছে ৩৬ হাজার ৩৭১টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৩০ হাজার ৮৫৫টি। স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে তালাকের নোটিস পড়েছে ২৪ হাজার ৮০৩টি এবং স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাকের নোটিস ১২ হাজার ১৮টি। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি, মাসে ৪২৯টি এবং বছরে ৫ হাজার ১৪৩টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। এসব নারীর বেশির ভাগের বয়স ৩০-৩৫ বছর। এ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নারী বেশি। তালাকের ক্ষেত্রে বিবাহের মাত্র এক বছরের মাথায় বিচ্ছেদের ঘটনাই প্রবল।কিন্তু কেন এই বিচ্ছেদ? অপরাধ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মোবাইল ফোন, চ্যাটবক্স, ফেসবুক, যৌতুক, নেশার উন্মাদনা, বিপরীত লিঙ্গ থেকে যৌন চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, আর্থিক দৈন্য, বিদেশি (বিশেষ করে ভারতীয়) টিভি চ্যানেলের নাটক-সিনেমার প্রভাবসহ মানসিক হীনম্মন্যতার কারণে বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। ফলে ভাঙছে সংসার। বিষয়গুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হলেও মূল বিষয় কয়েকটি। পরকীয়া, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও দাম্পত্য যৌনজীবন। পরকীয়ার বিষয়টি সবার ওপরে। মোবাইল ফোন আর ফেসবুকের মাধ্যমে দিনে দিনে মানুষ এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই অপরাধকে উসকে দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ করে বিদেশি টিভি চ্যানেলের নাটক ও সিনেমা। বিষয়গুলো যে শুধু পারিবারিক বাঁধনই ছিন্ন করছে তা নয়, আত্মহত্যার মতো অসংখ্য ঘটনারও জন্ম দিচ্ছে। আমাদের উদার মানসিকতায় ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন রকমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। শুধু যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন তা নয়, সন্তানরাও হরহামেশা ঘটিয়ে যাচ্ছে এই অপরাধ।পারিবারিক এ ভাঙনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল থাকে, সেখানকার সন্তানরাও মানসিক সমস্যায় ভোগে। ভবিষ্যতে ওই সন্তান জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থায় অনেকেই প্রেমে জড়িয়ে পড়ে গোপনে বিয়ে সেরে ফেলছে। এরপর কয়েক বছর যেতে না যেতেই পরিবারের মনরক্ষা অথবা নানা দৈন্যদশায় পড়ে তারা তালাকের দিকে যাচ্ছে।

মূলত শহরকেন্দ্রিক বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনাই বেশি। শহরের তুলনায় গ্রামে এই ঘটনা কম। গ্রামের মানুষ শহরের মতো এতটা প্রযুক্তিনির্ভর নয়। টেলিভিশন, ফেসবুক কিংবা ডিজে পার্টি গ্রামে নেই বললেই চলে। যৌথ পরিবারের সবাইকে নিজেদের মধ্যেই আনন্দগুলো ভাগ করে নিতে হয়। তুলনামূলক বিচারে এদের বন্ধন শহরের থেকে আলাদা। অন্যের সঙ্গে রাতে ঘুরে বেড়ানো কিংবা নিজের ব্যক্তিগত ছবি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করার চিন্তা খুব কমই আসে। তারপরও শহরের ছোঁয়া গ্রামে লাগাতে এখন গ্রামেও বিচ্ছিন্নভাবে অনেক ঘটনাই ঘটছে। তবে সার্বিকভাবে বলতে গেলে, এভাবে আমরা যদি আমাদের বন্ধনগুলো হারিয়ে ফেলি তাহলে আমাদের মানবিক বোধেরা নিজেদের বিকলাঙ্গ ঘোষণা করে চলে যাবে মহাকালের অতল গহ্বরে। যেখান থেকে আর কোনো দিন ফেরার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হওয়াই হবে সময়ের দাবি।