পাটকেলঘাটায় গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছে

0
120
শেখ রায়হান হোসেন, পাটকেলঘাটাঃ
“ঠিলে ধুয়ে দে বউ গাছ কাটতি যাব, খাজুর গাছে চোমর বারোইছে তোরে আইনে দেব”- গ্রামবাংলার জনপ্রিয় এ আঞ্চলিক গানের কথায় পাটকেলঘাটার গাছিদের ব্যস্ততা এখন বাস্তবে দেখা দিয়েছে। পাটকেলঘাটা এলাকায় খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা। শীতের শুরুতেই খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। খেজুরের রস বেশ সুস্বাদু খাদ্য বলে খেজুরের গাছ থেকে এখন রস সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে।
সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গাছিরা খেজুরের গাছ পরিষ্কার বা তোলার জন্য গাছি দা, পাটের দড়ি তৈরিসহ ভাঁড় (মাটির ঠিলে) ক্রয় ও রস জ্বালানো চুলা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। শীত এলে রসের চাহিদা থাকে তুঙ্গে যার ফলে এর সঙ্গে জড়িতদেরও উপার্জন ভালো। খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের পর তা দিয়ে পিঠা ও পায়েস তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। গুড় ও পাটালি তৈরি করেও বিক্রয় করা হয় যার চাহিদা সরাবছরই থাকে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পাটকেলঘাটায় গাছিরা শীতের শুরুতেই খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছে। শীত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুরগাছ কাটার প্রতিযোগিতায় গাছিরা। শীতের শুরুতেই অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুরগাছের কদর বেড়ে উঠেছে। খেজুর গাছ থেকে মিষ্ট রস জালিয়ে পাতলা, ঝোলা, দান গুড় ও পাটালি তৈরি হয়। যার সাধ ও ঘ্রাণ অন্য গুড়ের থেকে সম্পর্ক ভিন্ন। শীত কালের কথা আসলেই রস-গুড়-পাটালীর কথা চলে আসে। পাটকেলঘাটা অঞ্চলে শীত মানেই রস-গুড়-পাটালী। বহুদিন ধরে পাটকেলঘাটায় খেজুরের রসের সুনাম রয়েছে। প্রকৃতির সৌরভযুক্ত এই রস স্বাদে খুব সুস্বাদু। প্রাচীনকাল থেকেইে শীতকালীন খেজুরের রস এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য তালিকায় উপদেয় ও লোভনীয় খাদ্য হিসাবেই বিবেচিত। যে কোন বয়সের যে কোন রুচির মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয় খেজুরের রস।
শীতের সকালে রস নিয়ে গাছি যখন বাড়িতে আসে তখন রস কার আগে কে খাবে এই খাওয়াকে কেন্দ্র করে শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও লক্ষ্য করা যয়। তাছাড়া রস দিয়ে তৈরি পিঠা ও পায়েস খেতেও মজাদার। পাটকেলঘাটা অঞ্চলের খেজুরের রস তুলনামূলক বেশি মিষ্টি ও সুস্বাদু।
কার্তিক মাসের শেষের দিকে খেজুর গাছকে প্রস্তুত করতে হয় রস আহরণের জন্য। গাছের বাকল কেটে “গাছ তোলা” হয়। গাছ তোলা শেষে গাছ কাটার পালা। কোমরে দড়া  মোটা পাটের (দড়ি) বেধে ধারালো গাছিদা দিয়ে সপ্তাহে নিদিষ্ট দিনে গাছ কেটে রস আহরণ করা হয়। রস পেতে হলে কিছু কাজ করতে হয়। গাছের মাথার নরম অংশকে কেটে সেখানে বসিয়ে দেয়া হয় বাঁশের তৈরি নালা। গাছের কাটা অংশ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রস এনে নল দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হয় ভাঁড়ে। প্রথমের এক দুই সপ্তাহের রস একটু নোনা। গাছি এক কাটের পর বিরতি দেন। নির্দিষ্ট সময় বিরতির স্বাদ নিতেও ভিড় জমায় পিঁপড়া, মৌমাছি, পাখি ও কাঠবিড়ালী।
জুজখোলা গ্রামের গাছি পচু মিয়ার স্ত্রী জানান, পাটকেলঘাটা অঞ্চলের মানুষ রস ও গুড় নিয়ে তৈরি করেন নানা ধরনের পিঠা। পিঠার পাশাপাশি বানানো হয় নানা ধরনের পাটালি। খেজুরের পাটালির স্বাদের দিক দিয়ে থাকে ভিন্নতা। এখানকার মানুষের খেজুরের পাটালি বিশেষ পছন্দের। এই পাটালি পাঠানো হয় তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে।
সরেজমিন তৈলকুপী গ্রামের গাছি মকবুল মোড়ল জানান, এক ভাঁর রস জালানোর পর তাতে গুড় হয় প্রায় এক কেজি। যার দাম এখন থেকে ১২০ টাকা। পাটালীও হয় একই পরিমাণ। এলাকার সর্বত্রই রয়েছে খেজুর গাছের আধিক্য। প্রতিটি গ্রামে দেখা যায় শীত মৌসুমে খেজুর গাছ কেটে রস আহরণের দৃশ্য। এসব খেজুর গাছ থেকে সামান্য খরচে উৎপাদন হয়ে থাকে গুড় ও পাটালী।
তবে গ্রামবাংলার এ দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়েনা। যার প্রদান কারণ বিভিন্ন কারণে খেজুর গাছ নিধন। এতে দিনে দিনে এলাকায় কমছে খেজুরের গাছ। দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে খেজুরের রসও। দিনে দিনে এলাকায় খেজুর গাছ কমতে থাকলেও হারিয়ে  যায়নি। সুস্বাদু ও পিঠাপুলির জন্য অতি আবশ্যক উপকরণ হওয়ায় এখনও খেজুর রসের চাহিদা রয়েছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ হয় না। এখন গাছ যেমন কামে গেছে তেমনি কমে গেছে গাছির সংখ্যাও। শীত মৌসুমে সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে শেষ করা যাবে না। রস আর গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যায় না।