দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে

0
85

বরুণ ব্যানার্জী:

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানোর কারণে ঘুষের রেট বেড়ে গেছে। আগে যেখানে ১০ টাকা নেওয়া হতো, এখন সেখানে নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা। কারণ, যারা ঘুষ নেয়, তাদের প্রতিনিয়ত গ্রেফতার করা হচ্ছে। তাই তাদের রিস্ক বেড়ে গেছে। এ কারণে তাদের ঘুষের অঙ্কও বেড়েছে। কথাগুলো আমার নয়; দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের। চেয়ারম্যান আরও বলেছেন, দুর্নীতির পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরা খুব কঠিন। দুর্নীতি দমন এবং প্রতিরোধে সবাই ঐক্যবদ্ধ না হলে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। দুদক চেয়ারম্যান সবাই বলতে কাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলেছেন, তা পরিষ্কার করেননি। তবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বিষয়টিকে কিছুটা হলেও খোলাসা করেছেন। পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনোক্রমেই সমাজের এসব আবর্জনা পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থাকতে হবে এবং দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

এরপরও বলতে হয়, কোনোকিছুরই প্রয়োজন পড়ে না, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন থাকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় আমাদের মতো আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশে তা কতটুকু বাস্তবসম্মত। রাজনীতি করে যারা ক্ষমতায় থেকেছেন, থাকছেন এবং আগামীতে থাকার কথা ভাবেন, তাদেরকে দলের জন্যই বেনিফিশিয়ারি তৈরি করতে হয়। সেসব বেনিফিশিয়ারিই দলকে আর্থিকসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। তারা তো নিজের পকেট থেকে টাকার জোগান দেন না। সেই টাকা তাদেরকে জোগাড় করতে হয়। আর সেই টাকা জোগাড়ের পথ কখনোই সরল অঙ্ক নয়। তাদেরকে সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মধ্য দিয়েই এ টাকা উপার্জন করতে হয়। সুতরাং সমাজ যখন তার সামাজিক কারখানায় অনৈতিক মানুষ উৎপাদনের দায়িত্ব নেয়, তখন দুর্নীতি রোধের বিষয়টি সম্পর্কে সভা-সেমিনারে যারা বলেন, ঐক্যবদ্ধভাবে এর মোকাবিলা করতে হবে, তখন সেই আলাপচারিতাকে কেবল কুঁজোকে চিত হয়ে শোয়ার আহ্বানের মতোই শোনায়। আমরা মনে করি, দেশ যারা পরিচালনা করবেন, তাদেরই পুরো দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা, তারা এই কাজের মাধ্যমে দেশকে সুন্দর ও উজ্জ্বল করে তোলার ওয়াদা দিয়েই মানুষের কাছে ভোট চেয়েছেন। মানুষ তাদের বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছে, দেশ পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। যদি এই কাজে তারা ব্যর্থ হন, তাহলে ওয়াদা ভঙ্গের দায় পড়বে তাদের ওপর।

আমরা মনে করি, দুর্নীতি রোধ করার জন্য প্রথমেই রাঘববোয়ালদের দিকে নজর দিতে হবে কমিশনকে। এই কর্মটিও সহজ নয়। তবে উদ্যোগ নিতে দোষ কোথায়? দোষ-নির্দোষ প্রমাণের আগে একবার ভেবে দেখা দরকার, ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’ কমিশন কি সেই শক্তি সংরক্ষণ করে? আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, কমিশনের সেই শক্তি নেই। ইতিপূর্বে আমরা আকাশছোঁয়া দুর্নীতির বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি, কিন্তু কোনো কমিশনই তার কোনো কিনারা করতে পারেনি। তদন্তের পর্যায়ে গিয়ে তা আবার ডিপ ফ্রিজে আশ্রয় নিয়েছে। কোনোদিন সূর্যের আলোর সঙ্গে আর সাক্ষাৎ ঘটেনি। পত্রপত্রিকায় ঘুষ-দুর্নীতিবিষয়ক আলোচনা-পর্যালোচনা পড়তে পড়তে মানুষ ক্লান্ত হয়ে একসময় তাদের মাথা থেকে গোটা বিষয়টি ডিলিট করে দিয়েছে। অনেকের মতে, যারা এসব নিয়ে বেশি আলোচনা করেছেন, তাদের একসময় হতাশায় ডুবতে দেখা গেছে। আবার অনেককে বলতে শুনেছি, জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে এর মোকাবিলা করতে হবে। তাই আবারো বলতে হচ্ছে, জনগণের এখানে কিছুই করার নেই। সরকারকেই এর জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।