দারিদ্র্য দূরীকরণে যথা উপযোগী সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিতে হবে

0
50

বরুণ ব্যানার্জী:

দারিদ্র্য থেকে দেশবাসীর মুক্তির কার্যকর পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া প্রকৃত সুদিন করায়ত্ত করার অন্য কোনো উপায় নেই। বিশ্বের সব দেশের সরকার তাই স্ব স্ব ভূমিতে কর্মসংস্থানের আয়োজন করে জনগণের সামনে সুযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। নিজেদের পুঁজির বিনিয়োগে শিল্পকারখানা স্থাপনসহ দেশব্যাপী অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে উন্নয়নের পরিবেশ গড়ে তোলে। আমাদের এই বাংলাদেশও আজকাল এই পথের পথিক হয়েছে। দেশের অগ্রযাত্রার হাতিয়ার দারিদ্র্য জয়ের ভাবনায় প্রায় প্রতিটি সরকারই স্ব স্ব শাসনকালে পূর্ববর্তী সরকার সমূহের উদ্যোগ আয়োজনের ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রেখে গেছে। লক্ষ্য করার বিষয় হোল, আমরা সময়ের দাবীর বিপরীতে যেনো কেবল কিছু সীমাবদ্ধতার মাঝেও আবর্তিত হয়ে চলেছি। বছরের পর বছর ধরে উত্তরণহীন অবস্থায় ঘুরপাক খেয়ে চলেছি। অনেক কথাই আমাদের নেতা-নেত্রীবৃন্দ এবং গবেষক মন্ডলীরা সভা-সমিতি ও সমাবেশে বলেন বটে, তবে প্রকৃতপক্ষে আমরা কি চাই কিংবা আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জটা কি সে সম্পর্কে আমাদের জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার জন্য যে সামাজিক প্রেক্ষাপট বা আন্দোলন সৃষ্টি করা দরকার সেই কর্তব্য কর্মটি সাধারণত করা হয় না। তাই, সেমিনার কক্ষের, তথ্য-উপাত্ত-সিদ্ধান্ত-সমাধান ও দিক নিদের্শনাগুলো আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের কাছে এসে পৌঁছে না। প্রতিকার পন্থা কিংবা উত্তরণ-কৌশলপত্র যা-ই পরিবর্তন অনুকূল কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিপন্ন হোক না কেনো, তা দেশের বৃহত্তর অঞ্চলের সেই সমস্ত মানুষেরই অগোচরে রয়ে যায়। আসলে উপরের তলার অবস্থান থেকে আমাদের সকলকেই মাটির পৃথিবীতে নেমে আসতে হবে। চিন্তক ও পরিকল্পক মহলে যতোই সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হোক ক্ষতি নেই, এরও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু মাঠে-ময়দানে কলে কারখানায় এবং সমাজ অঙ্গনের নানান স্তরে যাদের অবস্থান, যারা সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুঘটক হিসেবে সক্রিয় থাকে তাদের সম্পৃক্ত করাটাই, তাদেরই সব সময় করণীয় বিষয়াদি অবহিত রাখাটাই প্রধান কাজ। আমাদের পর্যবেক্ষণে এই বিষয়টিই ক্রমাগত অবহেলিত হয়ে আসছে বলে আমরা উপলব্ধি করি। আমাদের মনে হয় বিশ্বায়নের এ যুগে প্রাপ্ত তথ্য প্রযুক্তি ও উৎকর্ষতা ব্যবহার করে এদেশকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নানান সুযোগ উন্মত্ত হয়েছে। আমাদের দেখতে হবে আমাদের উৎপাদন পর্যায়ের দক্ষশক্তি যেনো একালের এইসব সুবিধা ও তথ্যাদি সম্পর্কে অনবহিত না থাকে, প্রয়োগ-জ্ঞান থেকে বঞ্চিত না থাকে। দারিদ্র্য বিমোচন শব্দটি এখনও কথায় উচ্চারিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা, বিষয়টি এতো বহুল আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা এখনও দারিদ্র্য জয়ের হাতিয়ার অধিকারে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি দেখাতে পারিনি। দারিদ্র্য আমাদের যেনো অক্টোপাসের মতোই ঘিরে রেখেছে। স্বাধীনতার পর এখন চার দশকেরও বেশী কাল অতিবাহিত হয়ে চলেছে। অথচ আমরা এখনও এদেশের মানুষের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার অর্জন সমূহ পৌঁছে দিতে পারিনি। শোষণের শৃঙ্খল থেকে মানুষদের মুক্তির উপায় করে দিতে পারেনি। সমাজের পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় কেবল কিছু মানুষের স্ফীত হতে পারার উপায় উপকরণগুলো সচল থাকায় অপর শ্রেণীর মানুষ অসহায়ভাবে সম্বল হারিয়ে, পেশা হারিয়ে, ঘর-বাড়ি-জমি-জিরেত হারিয়ে ভূমিহীন ক্ষেত মজুর কিংবা শ্রমদাসের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। আমাদের দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত কৃষিপ্রধান এদেশের কৃষিকে আকর্ষণীয় ও বহুমুখী করে তোলা। সেই সাথে পল্লীর জনগণের বেকারত্ব মোচনে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। অর্থাৎ আমাদের নিতে হবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল ভিত্তির উপর স্থাপনের সুচিন্তিত উদ্যোগ। সত্যিকারভাবে দারিদ্র্য দূর করে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ সম্ভব করে তুলতে হলে এমন একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে যেখানে গ্রাম-সমাজের সকল জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা যায়। আসলে, স্বেচ্ছা প্রণোদনায় উজ্জীবিত একটি আত্মনির্ভরতার আন্দোলন হিসেবেই দারিদ্র্য দূরীকরণ কৌশলপত্রকে রূপদানের কথা ভাবতে হবে।

LEAVE A REPLY