তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা…

12
409

অভিজিৎ বসু :
নগরের চারপাশে নমর রোদ কড়া হতে শুরু করল। সময়, তারিখ সঠিক আবারো না হলে বড্ড ক্ষতি তাতে। আড্ডা, খয়েরি রঙয়ের জিনস এর ট্রাউজার আর ধূসর গেঞ্জি পরা যুবকের চাহনিতে বুকেতে ছ্যাত করে যদি কোন যুবতীর। সূর্য মাঝ আকাশ। কড়া রোদে তেতে উঠছে শরীর। হাবিব তানভিরের ‘চরণদাস চোরের’ নিজেকে মনে হচ্ছে। বড্ড এলোমেলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাস্তার বাঁকে তাকালাম। হঠাৎই কানে এলো বেঢপ হাসির শব্দ। মরার ভান করে সে শুয়েছিল সে উঠে দাঁড়ায়। হুড়মুড় করে আরো কয়জন চলে তার সাথে। গাড়ির লাইন নড়ছে না। বলা ভুল। গড়িয়ে গড়িয়ে এগোচ্ছে। আচ্ছা মুখগুলো কী চেনা? দুপুর গড়িয়ে রাত নামলো শহরের বুকে। রাস্তার ডানপাশে ল্যাম্পপোস্টের আলো কেমন প্রিয়মান। ল্যাম্পপোস্টের তলায় সবুজ ঘাসের বুকে পড়ে আছে।একজন মানুষ। জীবিত না মৃত। না রক্ত মাংসের মানুষটাকে তো এর আগে কখনো দেখিনি। আর মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল অন্য এক নাটক। আর বেশির ভাগ। নাটক দেখি আধখানা, সিকিভাগ।ওই মানুষটার মতো মৃত। ছায়ার মতো করে আমরাও দিব্যি অভিনয় চালিয়ে যাই। আত্ম প্রতিবিম্বের মতো করে বোহিমিয়ানিজম বৃত্তের মতো ঘুরে ঘুরে একাকার। ছোট ইস্যু। আঞ্জলিক ইস্যু। মাইক্রো পলিটিক্স। উঠোনো ঢুকে ছায়ারা অসম্ভর নৃত্য করে। হোমি ভাবা যেমন জানেন, পোস্ট কালোনিয়ালিটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় এবং মাল্টি ন্যাশনাল শ্রম বিভাজন মধ্যকার বিদ্যমান নিও কলোনিয়াল সম্পর্ক মনে পড়ায়। ফুকো যেমন বলেন,‘ ডিসকোর্সের সম্পর্ক যুদ্ধের স্বরূপই’। চমস্কির ভাবনা আবার, ‘সংগ্রামের লক্ষ্য হবে সুন্দর সমাজের প্রতিষ্ঠ’া। কিন্তু ফুকো আর চমস্কি বলেন ভিন্ন কথা কেননা ফুকো যেখানে বলছেন ক্ষমতার কথা। চমস্কির মূল প্রতিপাদ্য সেখানে ছিল ন্যায় বিচার। চিন্ময় গুহের সাথে ২০১১ এক সাক্ষাৎকারে মহাশ্বেতা দেবী বলেন তাঁর মা সম্বন্ধে। মা পার্লবাক এর উপন্যাস পড়তে ভালবাসতেন। পার্লবাকের সাথে ১৯৩৪ সালে বোম্বে গিয়ে দেখাও করেছিলেন। তিনি ঐ সাক্ষাতকারে বলছিলেন, দারিদ্রতা আমার সংসারে দেখেছি বিজনের সঙ্গেঁ বিয়ে যখন হয় তখন, আর সেই বিজন ভট্টাচার্যের সাথে ছাড়াছাড়ি হলে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন। তিনি স্পষ্ট করে জানালেন নান্দনিকতাকে প্রাথমিক শর্ত হিসেবে মানেন না। জীবনের ভেতর যতই প্রবেশ করেছেন তত দেখেছেন এতো এতো লেখার জিনিস। চিন্ময়কে বলেন ভূতের গল্প লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন জিম করবেটের লেখা আর শিবরামের লেখা অসম্ভব ভালোবাসতেন। ‘বসাই টুডু’ বেশি প্রিয় তার। অবলম্বন খুঁজে পাওয়া আর প্রতিবারই প্রতারিত হওয়া। ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন কবি আর কবিতা। মানুষের গন্ধ, নেশার ফোয়ারা, পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে সারি সারি উপরে উঠা রক্তক্ষরণ বুকে নিয়ে পার্থক্য করছি, প্রকট আর প্রচ্ছন্নের পুষ্কর দাশ গুপ্তের ‘সারারাত সারাদিন’ কবিতার লাইনের মতো, একটা কুকুর সারারাত ধরে ডাকে/ একটা বাড়ি সারারাত ধরে জ্বলে/ একটা মানুষ সারারাত জেগে থাকে/ সারারাত সারাদিন কুকুরটা ডাকেনা/ সারাদিন বাতিটা নেভানো থাকে। সারাদিন লোকটা পথে পথে ঘোরে। সারাদিন—————”নিয়তি সেটা আঁকড়ে ধরে স্থানু, নত মস্তক। চুল্লির গনগনে আগুন নীরব দর্শকের কাছে সূতোয় বাঁধা প্রশ্নের সমাধান করতে থাকে। তাই স্বরগ্রাম যত। উচ্চ ও আবেগঘন, তত নিম্ন আর আত্মমূখী হতে থাকে। অমোঘ সত্য মাঝে মাঝে উসকে দেয় সব। আগুন ধীরে ধীরে ছড়ায়। স্তিমিত হয়ে আসে আর তেজ, আর বাড়তে থাকে দহন জ্বালা। এখানে লক্ষ্যভেদী জতুগ্রহের ইতিহাস, আর অশ্বত্থামা বুঝিয়েছেন কৃপাচার্যকে , “কে কবে ন্যায়পথে যুদ্ধে জেতে বলো”। অন্তর্ঘাত স্তিমিত হলে নিয়তি থেকে অশ্রু বেয়ে পড়ে। সেই জলরেখা পড়ে থাকতে থাকতে ঘোলাজল হয়ে যায় আর আমরা ব্যাকুলতা নিয়ে উত্তরের অপেক্ষা করি। শহীদ কাদরী দূর পরবাস থেকে ফিরে আসেন। আমরা তার কফিনের দিকে তাকিয়ে দেখি, হৈ হৈ করে আঙুলের ভাঁজে সিগারেটে টান দেওয়া আর তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমার কবি চুপ। জার্মানীর কোলনের রাস্তায় সুমনের সাথে আড্ডার মশগুল মানুষটা আমেরিকাতে গিয়েও তিনবেলা ভাত খেতেন আর মস্তিষ্কের সমস্যা নিয়ে তার সামনে যখন দাঁড়াতেন তার স্ত্রী তখন বিষন্ন, বিধ্বস্ত, অভিমানী কবি কী বলে উঠতেন, ‘তোমার মুখর আঁধারে আমার মুখ/ ডিসেম্বরের শীতেও কী উন্মূখ/ ওল্টানো চাঁদ, বিপরীত রতি তার/ এই দ্যাখো নির্মাণ’।আমরা খুঁজি শাকিব খানের বুবলির প্রতিটানের খবর কারিনা কাপুরের অনাগত সন্তানের ব্রেকিং নিউজ, শ্রাবন্তীর বিয়েতে শাড়ির কালার, ফেসবুকের মহাকাশে স্যাটালাইট পাঠানোর ব্যর্থ মিশন, দ্য টাইম্স অব ইন্ডিয়া ২ সেপ্টেম্বরের নিউজ ‘হোয়ারস জিকা গোয়িং নেক্সট, মে বি ইন্ডিয়া অর চায়না।’ বি বি সি জানায়, “জ্যাকি চান টু গেট লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অস্কার।” আর এই সব মনে করতে করতে আপনি ক্লান্ত। কম্পিউটার, টিভি, ফেসবুক এবং বিজ্ঞাপনের শিকার আপনি। আপনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। চোখ খুলে হঠাৎ দেখলেন এক অপ্সরা আপনার মুখের ওপর ঝুঁকে। তার চোখ, আপনার চোখের ওপর। তার ঠোঁট আপনার ঠোঁট প্রায় স্পর্শ করতে চলেছে। বাইরে তখন আলোয় উদ্ভাসিত রাত্রি, আপনি ক্লান্ত, অবসন্ন, তবুও সেই মায়াবী স্পর্শ আপনাকে ঘোরের মধ্যে ফেলেছে। জাঁ ব্রোদিয়ার অন্তত তিনটি মৃত্যু ঘোষনা করলেন, “আধুনিকতার মৃত্যু, বাস্তবতার মৃত্যু এবং যৌনতার মৃত্যু। কিন্তু শহীদ কাদরী তছনছ করে সামনে চললেন, ‘ আমি এমন ব্যবস্থা করবো / নৌ , বিমান আর পদাতিক বাহিনী / কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-ঘিরে / নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা’। সুমনের গানটা আমার রক্তকে গরম করে। গোধূলীর হাওয়া এক ঝটকায় স্বপ্নগ্রস্ত করে তুলছে আমায়।
লেখক ও গল্পকার

12 COMMENTS