তালায় এডিপির কোটি টাকার টেন্ডার ভাগ-বাটোয়ারার মহাপরিকল্পনা দরপত্র পাচ্ছে না ঠিকাদাররা, অভিযোগ করেও প্রতিকার নেই

1
493

স্টাফ রিপোর্টারঃ

সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এডিপি’র প্রায় এক কোটি টাকার টেন্ডার ভাগ-বাটোয়ারার পায়তারা চালাচ্ছে একটি মহল। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তালিকাভূক্ত ঠিকাদারদের দরপত্র দেওয়া হচ্ছে না। দরপত্র পেয়েছেন তালা উপজেলার গুটি কয়েক ঠিকাদার এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা। ঠিকাদারদের দাবি, তারা জেলা প্রশাসক, এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে মৌখিক অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। ঠিকাদারদের অভিযোগ, তালা উপজেলায় ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এডিপি’র বরাদ্দকৃত অর্থের আওতায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি নং-০৫/২০১৬-১৭ এর মাধ্যমে ৩৩ (তেত্রিশ) টি এবং দরপত্র বিজ্ঞপ্তি নং-০৬/২০১৬-১৭ এর মাধ্যমে ১ (এক) টিসহ মোট ৩৪ (চৌত্রিশ) টি প্রকল্প গ্রহণ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক আগামীকাল ৪ জুন রোববার দরপত্র বিক্রয়ের শেষ দিন। কিন্তু ১ জুন বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঠিকাদাররা দরপত্র ক্রয়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। শেষ দিনেও ঠিকাদাররা দরপত্র ক্রয়ে সমর্থ হবেন কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ৫ জুন দরপত্র দাখিলের দিন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, এলজিইডি’র তালিকাভূক্ত অধিকাংশ ঠিকাদারকে দরপত্র না দিয়ে তালা উপজেলার গুটি কয়েক ঠিকাদার এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা উক্ত কোটি টাকার কাজ ভাগ করে নেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। ঠিকাদারদের দাবি, আগামীকাল ৪ জুন রবিবার শেষ দিনে সময় মত সকল ঠিকাদারদের মধ্যে দরপত্র বিক্রয় করা এবং সাতক্ষীরা এলজিইডি অফিসে দরপত্র দাখিলের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। এদিকে, উপজেলা পরিষদে সময় মতো প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় তালা উপজেলায় এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) প্রকল্প বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে তালিকা। তড়িঘড়ি করে নামমাত্র প্রকল্পের নাম দিয়ে দরপত্র আহবান করা হয়েছে। অথচ ৩০ জুনের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এনিয়ে গত ২৫ মে বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা পরিষদের হলরুমে অনুষ্ঠিত মাসিক সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এর উপস্থিতিতে বিষয়টি উত্থাপন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এসময় তিনি উল্লেখ করেন, কারও সাথে সমন্বয় না করে উপজেলা চেয়ারম্যান এককভাবে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প তৈরি করেছেন। এক পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উপর ক্ষিপ্ত হন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমার। অথচ নিয়ম আছে, এডিপি প্রকল্প গ্রহণ করতে হলে ইউনিয়ন পরিষদের সকল চেয়ারম্যান-সদস্য, সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ও স্থায়ী কমিটির সুপারিশমতে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও অর্থবছর শুরুর আগেই অনুমোদিত বাজেট হতে প্রকল্প গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। অথচ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিয়ম না মেনে এককভাবে প্রকল্প তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে যাচাই-বাছাই কমিটির কোন সভাও আহবান করা হয়নি। তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফরিদ হোসেন জানান, উপজেলা চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত এডিপি প্রকল্পের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। সেই অনুসারে রেজুলেশনভুক্ত করা হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে যাচাই বাছাই করা সম্ভব হয়নি। যতটুকু দেখেছি উপজেলা পরিষদের আইন বিধি ও পরিপত্র অনুসারে বিভাজন করা হয়নি। এছাড়া পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে বাজেট অনুসরণ করা হয়নি। তবুও জনস্বার্থে এডিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলমান আছে। তিনি আরও জানান, দরপত্র বিক্রয় না করা সম্পূর্ণ অনিয়ম ও দুর্নীতির সামিল। এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তালা উপজেলা প্রকৌশলী দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর জুন মাসের মধ্যে এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করতে হয়। চলতি বছর তালা উপজেলায় এডিপি প্রকল্পে ৬৭ লক্ষ ৮৮ হাজার ও বিশেষ বরাদ্দে ৩৫ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। যার প্রেক্ষিতে ৯০টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আর ৩৩ প্যাকেজ ইতিমধ্যে দরপত্রও আহবান করা হয়েছে। দরপত্র অনুযায়ী ৪ জুন সিডিউল ক্রয়ের শেষ দিন এবং ৫ জুন দরপত্র দাখিলের দিন। ৬ জুন দরপত্র খোলার দিন রয়েছে। তালার ঠিকাদার কাজী আরিফুল হক জানান, জেলার সব উপজেলায় টেন্ডার হয়ে সব কাজ শেষের পথে। কিন্তু তালা উপজেলায় এখনও টেন্ডার দাখিল হয়নি। তাহলে কিভাবে কাজ বাস্তবায়ন হবে। যেহেতু ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করে বিল উত্তোলন করতে হবে। বাস্তবতায় গতবছরের ন্যায় এ বছরও ঠিকাদারদের বিডি দিয়ে বিল করতে হবে। এমন বক্তব্য আরো অনেক ঠিকাদারের। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, এডিপি’র যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তা কোন প্রকার নিয়ম মেনে করা হয় নি। এতে কোন কোন ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। কোন কোন ইউনিয়নে নাম মাত্র কাজ দেওয়া হয়েছে। বৈষম্য মূলক ভাবে এ বছর এডিপির বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। যা গ্রহণ যোগ্য নয়। তালা উপজেলা প্রকৌশলী কাজী আবু সাইদ মো. জসিম জানান, সংশ্লিষ্টরা প্রকল্প দিতে বিলম্ব করায় দরপত্র আহবান করতে পারেনি। তবে আমাদের অফিস থেকে দরপত্র দেওয়া হচ্ছে। বাহিরে থেকে যদি কেউ সে দরপত্র নিয়ে কোন অনিয়ম করে থাকে সে দায় আমাদের নয়। তালা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমার জানান, প্রকল্প নিতে বিলম্ব হওয়ায় দরপত্র আহবান করতে দেরি হয়েছে। তবে সবাইকে নিয়ে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। এককভাবে কোন প্রকল্প তৈরি করা হয়নি। এ বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, যাতে সকল ঠিকাদার দরপত্র পায় এবং নিরাপত্তার সাথে সে দরপত্র ফেলতে পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।