ডুমুরের আয়ু : ধানপাতায় গোপন আনাজ

0
80

অনলাইন ডেস্ক:

যদি অনন্ত কবিতার কাছে প্রশ্ন করি, কবিতা কি কিছু ছুঁতে চায়? কবিতা কি ছুঁতে চায় রাত? নগ্ন নির্জন হাত? পৃথিবীর গুহ্য প্রপাত? কবিতা কি কৃষ্ণচূড়ার লাল— সৌন্দর্যে হৃদয় উদ্বেল! কবিতা কি ছায়া? দুর্গম? নোনা? অন্ধকার? কবিতা কি শরীর— ছুঁয়ে যায় নীরার আঙুল! মাটির আশ্চর্য মাদুর পাতা— ডুমুরের ছায়া? হৃদয়? অদৃশ্য? অনন্ত? অস্তিত্ব? বিবিধ জলপাই ফুলের বাগান?
সর্বোপরি কবিতা কি প্রেম? রাত্রির কোমলগান্ধার? গান?
আর যিনি কবিতা সৃষ্টি করেন তিনি কে? তিনি কি সমাজসংস্কারক? নেতা? ধার্মিক? দার্শনিক? প্রেমিক? কেননা কবিতায় তো কবি কখনো কখনো সমাজসংস্কারক হয়ে ওঠেন, ‘ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র, রুদ্র আলোকে এসো।’ রাজনৈতিক সঙ্কট মুহূর্তে নেতা হয়ে আবির্ভূত হন, ‘আমাদের হৃদভর্তি বর্ণমালা এবং বাংলাদেশ’—‘কার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে হে গিরগিটি গুপ্তঘাতক?’ একনিষ্ঠ ধার্মিকের স্বভাবও একজন কবি পেয়ে থাকেন আর তা পালনও করেন এবং শ্রেষ্ঠ দর্শনটি কিন্তু আমরা কবির কবিতা থেকেই পাই। কিন্তু তবু এইসব একক সীমাবদ্ধ পথ কবির নয়। শুধু সমাজসংস্কার কবির উদ্দেশ্য নয়, নিছক ধর্মবয়ানও সে করে না অথবা শুধু দর্শন রচনা করাও কবির কাজ নয়। অথচ এ সমস্ত মিলেই একটি কবিতার পথ— কিন্তু তবু কবির পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নন্দনের পথ। তার ভেতর দিয়ে ধর্ম, দর্শন সর্বোপরি নৈমিত্তিক জীবনবোধের যে উপাখ্যান পাই তার উৎকৃষ্ট আস্বাদন কবিতা ছাড়া আর কোথায় মেলে?
কবিতা তাই মহানুভব— জন্ম, জীবন ও ভূমির আরাধ্য ঠিকানা এক। অমৃত সমান তার স্থায়িত্ব। এখানে অনন্ত পিপাসার পানপাত্রে ঠোঁট ডুবিয়ে নিজস্ব অভিজ্ঞতার অঞ্চলে ঢুকে পড়ি। অশরীরী আর অনভিজ্ঞ শব্দগুলো হয়ে ওঠে মানসপ্রতিবিম্বের অনবরত প্রতিলিপি— কবিতা।

ডুমুরের আয়ু : প্রাকপ্রারম্ভিককথা
‘তবে শুরু হোক সেই নিশ্চুপ রাতের গল্প/ডালপালা মেলে ধরুক এক তরুণ ডুমুর।’ কবি শামীম হোসেন শূন্য দশকের একজন তরুণ কবি। ২০১৭ বইমেলায় বেরিয়েছে তার ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ডুমুরের আয়ু। কবিতা যখন নানামুখী উদ্ভাবন ও প্রয়োজনীয়তার গতর খুঁড়ে চলেছে— সাঁই সাঁই গতির ছোবলে দরকারি তন্দ্রা খুন হয়ে যাচ্ছে— আকুতি হাঁপিয়ে উঠছে— মন মায়াঘাস খুঁজছে অথবা হৃদয়ের পরিবর্তনগুলো বড় বেশি কামুক শরীর খুলে দিচ্ছে, হাত থেকে সর সর পড়ে যাচ্ছে মুঠোর বাঁধন— তখন উত্তরাধুনিক চাতালে কবিতা ঝাপটানো ডানা। নিশ্চয়ই পরিস্থিতির এইসব চাহিদা মেটাবে কবিতা— দর্পণে চোখ রেখে বুঝে নেব সুখ কিংবা মানুষের অনভ্যস্ত গভীর অসুখ— এ থেকে এ সময়ের মানুষের পালাবার পথ কোথায়?
কবি শামীম হোসেনের দৈনন্দিনতা এসবের কতটা নিকটে— নিকট দূরে জানি না কিন্তু কবিতায় তার যে অবস্থান সেখানে সময়ের গড় প্রজেকশন, নাগরিক সংবেদনা, ভাষার ভঙ্গিমা, চাওয়া ও চরিত্রগুলো উত্তরাধুনিক চাতাল থেকে প্রায় দূরে, মফস্বল শহর থেকে নদীর নিকটে, মাটিলগ্ন লোকালয়ে, পাহাড় ও প্রত্যন্তে। সেখানেই তিনি তার কবিতার আবাস বানিয়েছেন। ঘুরে বেড়ান, জেগে ওঠেন, বিপন্ন হন প্রেমে ও পতনে, ক্ষয় ও ক্ষরণে, কাম ও কামনায়, পথে ও প্রান্তিকতায়। পাঠক আসুন ক্ষয় ও ক্ষরণের অনুভবলগ্ন সেই গ্রন্থ ডুমুরের আয়ু কাব্যগ্রন্থের কিছু পঙক্তির ভেতরে প্রবেশ করি

পায়ে পায়ে মধু লেগে থাকে রূপপুরের ঘাটে
মধুগ্রাম— দূর মাঠে আলিফ লায়লার টি-শার্ট, কাকতাড়ুয়া। কবি সে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। কবিতা তো পরিভ্রমণের পথ আর কবি সেও। চোখের নাগাল থেকে বাদ যায় না বাতাসের শরীরও। আর কবি শামীম হোসেন ঢুকে পড়েন নিকট একটি সময়কালের ভেতরে— যেখানে ইতিহাসের অন্নদাসুন্দরী মেলে, চেনাপথঘাট, মহুয়াবাগান মেলে, বিলাসী রমণীদের মাটি দিয়ে চুল ধোঁয়ার আখ্যান মেলে। এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায় কবি বলেন, ‘এ গ্রামে রমণীরা বাঁশফুল মাথায় গোঁজে আর/ মাটি দিয়ে চুল ধুয়ে রাখে!’, ‘এ গ্রামে মধু ঠোঁটে নয়—/ পায়ে লেগে থাকে।’
এরপরে কবি ভ্রমণেই থাকেন। কবির কৃষিগন্ধা হাত খুঁজে পায় কাঙ্ক্ষিত বধূ— তার মাটিমগ্ন মৌনতা। কবি বলেন, ‘অনেকটা পথ হেঁটে এসে আমরা/ বসি। যিশু বসেন। মৃদু হাসেন।’, ‘তোমার ধ্যান ও ধারণায় আমি/ নতুন কোনো গল্প হয়ে যাই।’, ‘ক্ষয় ও ক্ষরণের আগে ভাবমিলনের ছায়া/ উড়িয়ে নেয় গতজন্মের পাতার জীবনী।’
সুন্দর শব্দবন্ধন! স্মৃতির স্টেশন। স্মৃতিরও স্টেশন হয়। হ্যাঁ, স্মৃতি তো জমা হয়, ঘন হয়, মনোভূমে স্টেশন হয়। কবি বলেন, ‘রেলপথ বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে/ খুঁজে আনে রূপগন্ধ হারানো সন্ধ্যা।’

মায়া ও মাধবীতে যতটা নৈঃশব্দ্যের ঋণ
কবি কি অতীতচারী? আমরা কি অতীতচারী নই? অথবা আমরা কি ফেলে আসি অনুভবের সুতোর মতো মিহিন কোনো অন্ধকারে? কবি এখানে বলেন, ‘অন্ধকারে ফেলে গেছি রূপকের বীজ।’ কবি হারিয়েছে রূপগন্ধ, রূপকল্পের বীজ। সময় তো নিজেকে ছাড়ায় নিজেকে হারায় প্রতিমুহূর্ত। অতীত মানে তো নিজেরই প্রতিবিম্বে গমন— অধিগমন!
আর বর্তমান সেতো কেবলই এক পতনের আশঙ্কা! মৃত্যু ও ভয়ের অবগাহন! কবি বলেন, ‘মায়া ও মাধবীতে যতটা নৈঃশব্দ্যের ঋণ/ কেবলই আগুন হয়ে জ্বলে উঠছে এখন।’
তাই অন্ধকার প্রতিমার সামনে দাঁড়াই। ‘কে আমাকে আজ দাঁড় করিয়েছে/ শশ্মানের মতো নীরব এই ভিটের ওপর/ সামনে আঁধার প্রতিমা/ আলোর বিপরীতে আত্মহননের পথ।’
স্বপ্ন বিপন্ন হলে আত্মহননের পথ এগিয়ে আসে। শুধু কি স্বপ্ন থেকে? এ বিপন্নতার শুরু তো দৈনন্দিনতা থেকেই। এই বিপন্নতা আমরা কবি জীবনানন্দে দেখেছি, ‘জীবন ধোঁয়ার মতো— জীবন ছায়ার মতো ভাসে/ যে অঙ্গার জ্বলে জ্বলে নিভে যাবে— হয়ে যাবে ছাই— সাপের মতো বিষ লয়ে সেই আগুনের ফাঁসে/ জীবন পুড়িয়া যায়— আমরাও ঝরে পড়ে যাই!/ আকাশে নক্ষত্র হয়ে জ্বলিবার মতো শক্তি— শক্তি তবু চাই’ (ধূসর পাণ্ডুলিপি)।
আমরা তো কেউ কেউ পুলসিরাতের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকি। নিচে আগুনের কুণ্ডলি— ভয় বাড়ে যেকোনো সময়…! তবু প্রাণ আছে যতক্ষণ মানুষের ভেতরে অলৌকিক সান্ত্বনা আসে। হয়তো এ সঞ্জীবনী— এ শক্তি জীবিত প্রাণে কোথাও লুকিয়ে থাকে। কবি শামীম হোসেনও ক্ষয় ও ক্ষরণের পথে দুর্বিনীত হন। শক্তি সঞ্চয় করেন। কবি বলেন, ‘ইতিহাসে কলাপাতা আছে তাই ধানপাতায় মুড়িয়ে রাখি গোপন আনাজ।’ কলাপাতা, ধানপাতা, গোপন আনাজ— চমৎকার সংযোজন! কবিতার শব্দে ও বাক্যে, উপমা ও যোগ্যতায়, বিনয়ে ও গাঁথুনিতে মুগ্ধ হয়ে উঠি। কবির সুসংহত পরিমিতিবোধ লক্ষ করি।
এই যে বিপন্নতার কথা বললাম, অন্ধকারের সামনে আঁধার প্রতিমার কথা বললাম, এমন অবসন্ন ক্ষণে ‘সব পাখি কি নদীর কিনারে যায়?’ আমরা জানি, নদী হলো জলের শরীর, অবগাহন মনের। আর নিঃসঙ্গের অপার তীর্থ। এখানে আকাশকে প্রসারিত পাওয়া যায়। জলে ও সীমানায় নিজেকে সমর্পণ করে স্নাত হওয়া যায়। আমাদের তাই নদীর দিকে ঝোঁক। কবি বলেন, ‘সমূহ যাপনের ভার নৌকার গলুই ধরে পাড়ি দিচ্ছে শরীরের পথ। আমি যখন ডুমুরের কথা বলি— ভেসে ওঠে মাকড়ির দুল! সোনালুর ডাল ধরে পাখা নাড়ে বিরহী কোকিল।’ কিংবা ‘আরোগ্য হাওয়ার ভেতর তৈরি করো পরাবাস্তব পথ— ঈশ্বরীপুরের সন্ধ্যায় পুনরায় শিশু হয়ে উঠি।’ একা একা ঝিঁঝি ডাকা বিন্দুর মতো শুয়ে থাকে দূর অরণ্যের পথ।
বাস্তবিকই কোনো আরোগ্য হাওয়ার ভেতর ছবি হয়ে ফোটে দূর অরণ্যের পথ। তৈরি হয় পরাবাস্তবতা। তৈরি করে প্রাকৃতিক মন। বিষাদে ভরে উঠলে এলিয়ে দেই প্রাকৃতিক শরীর। সব পাখি অবশ্যই নদীর কিনারে যায়। সব পা পায়ে পরে বিরহী ঘুঙুর। ‘খাদের গভীরে ঘুটঘুটে আঁধারে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি।’

কৃষ্ণের জ্বর হলে রাধা পোড়ে শীতের আগুনে
প্রেমতো মৃত্যুর মতো— মৃত্যুর অধিক ব্যঞ্জনা। কেননা প্রেম ‘নিশ্বাসের বায়ুজুড়ে খেলা করে বুকের ভেতর।’ প্রেম এক অসহনীয় মৃদুমন্দ অনুভূতি। সমস্ত শরীরজুড়ে তার বাস। এ অনুভূতি থেকে কোনো প্রাণের কোনো মানুষের রেহাই নাই। প্রেম তাই মিলনের উপাসক— মিলনই তার একমাত্র আরাধনা। কবি বলেন, ‘শত বছরের প্রত্নরাত ঘুম পাড়ে শাড়ির আঁচলে/ কী মায়া বয়ে যায় যোজন হৃদয়ে হৃদয়ে।’ প্রেমের এমন সর্বগ্রাসী মায়াটা টের পাওয়া যায় হৃদয়েই। হৃদয়ে হৃদয়ে তার বিহার। প্রেমে কোনো স্থিতি নাই। তুষ্টি নাই। একক বলে কিছু নেই। হৃদয় বহুগামী— কবির অভিসারি মন তা ভালো জানে। কবি বলেন, ‘পাথরের প্রেম গেছে দেহভর্তি যমুনার জলে/ দেখো, কার সুরে কে নাচে সুদূর মাধবনগরে।’ তবু মানব-মানবীর চিরন্তন লীলা অমর রাধাকৃষ্ণ হয়ে প্রবহমান। এখনও ‘কৃষ্ণের জ্বর হলে রাধা পোড়ে শীতের আগুনে।’, ‘দেবীও প্রতিমা হয়ে বালুচরে ছড়িয়ে যায় মিলনের ডাক।’

আমাদের তৃষ্ণা মেটানো পথ— ছোট হতে হতে পকেটে ঢুকেছে
কবি শামীম হোসেন একজন নিসর্গমগ্ন তরুণ। চোখে পুষে রাখে গভীর কুয়াশা, হাতের পাতায় লেবুপাতার ম্যাপ, প্রজাপতির পাখায় লেখে যাপনের ভার। প্রেম আর রূপকের মায়াবী জগৎ তার জীবনজুড়ে ভর করে আছে— বাস্তবতার প্রগাঢ় গ্রাসে পায়ে পায়ে তার ক্ষরণের ভূমি। কবির নিসর্গমগ্ন চেতনাকে কুরে কুরে আঘাত করে রৌদ্র ঝলসানো পথ। আশঙ্কা ও অশুভ পলে পলে এগিয়ে আসে। কেননা জীবন পরাধীনতার ভাগাড় হলে স্বপ্নেরা ব্যর্থতায় হয় কুটিকুটি। তখন ভাষা হয়ে যায় কংক্রিট— ভয় বাড়ে, বিবিধ প্রপ্রঞ্চ জান্তব হয়ে ওঠে। আকাঙ্ক্ষা কোনোভাবেই আর স্বাভাবিকরূপে আসে না, অসংবৃত আগুনের আঁচ নিয়ে জ্বলে ওঠে। কবি বলেন, ‘বিন্দু আলো থেকে পা সরে যায়… আগুন দেখানো ভয় জন্মের পর ঢুকে গেছে মাথায়।’ কিংবা ‘তূণ ও তৃণের স্বভাব এক হয়ে গেলে কেঁপে ওঠে অর্জুনের হাত।’, ‘সেতারের মন্ত্রে কেন বলো অন্ধ হয় তাজা তাজা চোখ’, ‘উপড়ানো চোখ হাতে নিয়ে—/ কার সামনে দাঁড়াবো এখন।’
এই যে আশঙ্কার দুর্গে বন্দি কবির আত্মতা এর জন্য দায়ী কে? কবি কি নিজেই? কিংবা দায় কখনো একার ফলাফল নয়— এই ভেবে যদি বলি— কবির নিয়তি! কেননা কবি দাউদ হায়দার বলেছেন, ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ।’ সরল পিপাসায় নিশ্চিতভাবে কোনো পাপ থাকে না— কিন্তু পৃথিবী তাতে যুক্ত করে পাপের লালিমা। তা না হলে কারো কারো অন্ধকারে পাপ এত খেলা করে কেন? কেন ‘সুরের উলটো পিঠে বিদ্ধ হয় ক্রুশের হাসি।’ কবি শামসুর রাহমানকে রৌদ্র করোটিতে বলতে দেখি, ‘পাপকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলি হৃদের আলোর/ মতো যদি উৎপীড়িত অন্ধকারে ঘেয়ো ভিখিরির/ ছেঁড়া ন্যাকড়ার ভাঁজে নক্ষত্রের ছায়া দেখি যদি…’
জীবনের আকাঙ্ক্ষা তো সহজ তাই— মনজুড়ে তার সরল লীলায়িত গোপন। কিন্তু পরিপার্শ্ব ধারণ করে বিবিধ জটিলতা, ক্রুরতা! জীবনের সরলতা এতে সংক্রামিত হয়— লোভী হয়ে ওঠে— বিভিন্ন জটিলতায় নিজেকে বন্দি করে ফেলে! তারপর ছাড়া পায়, তৃষ্ণা ছোট হয়, সহজ হয়। একসময় সহজে বাঁচাই আরাধ্য হয়ে ওঠে। কবি বলেন, ‘আমাদের তৃষ্ণা মেটানো পথ— ছোট হতে হতে পকেটে ঢুকেছে।’

আকাশ দুলছে, বোবারা হাসছে
পৃথিবী প্রতিদিন মিথ্যা ঘোষণা করে। অজস্র। ভায়োলেন্স চলছে। অন্ধরা কাঁদছে। ‘দালির হাতঘড়িতে হাহাকার বাজছে…’। একজন ভাড় শার্টের বোতাম খুলে দেখছে। বাচ্চারা ঠোঁট ফোলাচ্ছে। ফিকে হয়ে যাচ্ছে মুদ্রার রঙ। কবি বলেন, ‘মাথা লাফাচ্ছে— ধড় কাঁপাচ্ছে/ ক্ষয়ে যাচ্ছে বিলাসী সাবান।’
বহুজাতিক সাধ আমাদের ভেতরে তিরতির ঢুকে পড়ে, তৃষ্ণার পথ বিবিধ রঙিন করে তুলছে। কবি বলেন, ‘মুঠোফোনের বাটনে লুকিয়ে থাকে সাপ/ ধীরে ধীরে ঢুকে যায় বুকের ভেতরে/ চুমুর কদম থেকে যোনিদেশে ঢুকে যায় সাপ/ বহুজাতিক পাপ।’ কবি আরো বলেন, ‘প্রিন্টারের খুব কাছাকাছি/ ক্লিক করতেই বেরিয়ে আসছে হাওয়ার মানবী…’
রঙিন সেলুলয়েডের সামনে এখন আমাদের বিবিধ চোখ— মগজের ক্যালকুলেটরে চলছে নকশার হিসাব। ভার্চুয়াল অবরোহন-আরোহন বাড়ছে। যাপনের সূত্রগুলো হারিয়ে ফেলছে নিজস্ব শরীরের ভাঁজ। বাৎসায়ন উন্মুক্ত হয় এখন কাচের কার্নিশে। এভাবে তাকালে পৃথিবী ‘এক তরমুজের বন— লালরস রক্তবর্ণ চোখে শুয়ে থাকে।’
আর এই রোগ্য হাওয়ার ভেতরে একমাত্র কবিই আহ্বান করতে পারে জীবনকে সরল লীলার দিকে, মাঠের গল্পের দিকে, সবুজে মাখানো ভাবমিলনের দিকে। ফেরাতে পারে চোখ ঘাসের ক্যানভাসে। কবি ছাড়া আর কেউ বলে না, ‘আমাকে বোঝার আগে বোঝো তুমি খরস্রোতা নদীর দুকূল/ আর পাথরবন্ধনী খুলে মাটির ওপর/ হও আগে জীয়ন্ত মানুষ।’
কবি শামীম হোসেন প্রকৃতই এক রূপমগ্ন নিবিষ্ট পথিক। হুল্লোড়ি চাওয়া ও চাহিদা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। ত্বকে ও তাপে একান্তে লুকিয়ে রাখেন বেদনার বীজ। সেসব বীজ বাস করে একেবারে মাটির অভ্যন্তরে। ডুমুরের আয়ু কাব্যগ্রন্থে মিলবে কবির সেই মাটিগন্ধা অকপট উচ্চারণ। জীবনের সরল কাঙ্ক্ষার কাছে তার সহজ নিবেদন— প্রেমের সঘন আবাহন। কবি বলেন, ‘দেখো, গভীর কুয়াশা আমি চোখে পুষে রাখি/ শীতকালে নদীকূলে তাই কোনো ভণিতা করি না।’

কাব্যগ্রন্থ : ডুমুরের আয়ু
কবি : শামীম হোসেন।
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৭।
প্রকাশক : প্লাটফর্ম।
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ।
মূল্য : ১৬০ টাকা।