জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী

39
214

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর পূর্ব পুরুষ ছিলো বণিক সম্প্রদায়ের। কিন্তু তার ঠাকুরদাদা উত্তম চাঁদ গান্ধী ছিলেন পরবান্দারের দেওয়ান। তিনি ছিলেন একজন আদর্শবাদী মানুষ। ফলে তাকে রাজনীতির শিকার হয়ে ঝুনাগাদ রাজ্যের আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে তিনি তৎকালিন নবাবকে বামহাতে সালাম দেন।এটি উপস্থিত লোকজন খেয়াল করে এবং কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডান হাতটি ইতিমধ্যে পরবান্দারের কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। উত্তম চাঁদ ওরফে উত্তা গান্ধীর প্রথম স্ত্রী মারা যান ফলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে মহাত্মা গান্ধীর পিতা করমচাঁদ গান্ধী ও তুলসীদাস গান্ধী জন্মগ্রহণ করেন।তারা উভয়ে পর্যায়ক্রমে পরবান্দার প্রধানমন্ত্রী হন। মহাত্মা গান্ধীর বাবা করমচাঁদ গান্ধী রাজস্থান কোর্টের মেম্বার ছিলেন। তিনি চার বিয়ে করেন। কারণ তার প্রথম তিন স্ত্রী-ই অকাল মৃত্যুবরণ করেন। মহাত্মা গান্ধী ছিলেন করম চাঁদ গান্ধীর ৪র্থ স্ত্রীর সন্তান। তিনি ছিলেন তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবচে ছোট।১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়ালেখায়ও খুব মেধাবী ছিলেন না। খুব কষ্ট করে গান্ধী নামতা মুখস্ত করতেন। ছোটবেলায় মহাত্মা গান্ধী খুবই লাজুক প্রকৃতির ছিলেন এবং বন্ধুদের সাথে খুব কম মিশতেন। কেউ তাকে বিরক্ত করবে এই ভয়ে তিনি স্কুল ছুটির সাথে সাথে খুব দ্রুত বাড়ি ফিরতেন। তবে তার একটা মহৎ গুণ ছিলো তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলতেন না। হাই স্কুলে প্রথম বৎসরের পরীক্ষার সময় শিক্ষা পরিদর্শক মি. গিলস্ স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন। তিনি ছাত্রদেরকে ৫টি শব্দের বানান লিখতে দেন যার একটি ছিলো কেটলি। গান্ধী এর বানান ভুল করেন।তার শিক্ষক পা দিয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তার ভুল সংশোধন করার জন্য। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর তা বোঝার ক্ষমতা ছিলো না। শিক্ষক তাকে বোঝাতে চাচ্ছিলেন পাশের ছেলেটির কাছ থেকে দেখে দেখে লিখতে। কিন্তু তিনি বুঝে নেন শিক্ষক তাকে নজরদারিতে রেখেছেন, তিনি যেন চুরি করে না লেখেন। পরে দেখা গেল মহাত্মা গান্ধী ছাড়া ক্লাসের অন্য সবাই বানানটি সঠিকভাবে লিখতে পেরেছেন। শুধু তাকেই বোকা বনতে হলো। তার শিক্ষক তাকে বুদ্ধিমান বানানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।তার দ্বারা আর কখনোই চুরিবিদ্যা শেখা হলো না। তিনি ছোট বেলায় যাত্রা দেখতেন। এর মধ্যে একটি যাত্রা তার মনে খুব দাগ কাটে। সেটি হলো রাজা হরিশ্চন্দ্র। রাজা হরিশ্চন্দ্রের সত্যবাদিতা তাকে খুব আকর্ষণ করে। তিনি নিজেকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের মতো সত্যবাদী ও প্রতিজ্ঞা রক্ষাকারী হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। আর এই প্রচেষ্টাই তার চরিত্র গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। স্কুলে পড়াকালিন মহাত্মা গান্ধী বিয়ে করেন। তার দ্বিতীয় ভাই, তিনি এবং তার এক কাকাতো ভাই, তিন জনের বিয়ে একসাথে আয়োজন করা হয়। তার বড় ভাই ছিলেন তার থেকে বয়সে অনেক বড় কিন্তু তার কাকাতো ভাই ছিলেন তার থেকে মাত্র এক বৎসরের বড়।তিন ভাইয়ের বিয়ে এক সাথে আয়োজন করার মূল কারণ হলো তার বাবা ও কাকা দু জনেই বেশ বৃদ্ধ হয়েছেন। এবং তাদের ইচ্ছে তাদের মৃত্যুর আগেই সন্তানদের বিয়ে দেয়া। এছাড়া তার ছিলো ঘরের শেষ সন্তান যাদের বিয়ে হয় নি। ফলে অল্প খরচে এবং জাকজমকভাবে শেষ সন্তানদের বিয়ের আয়োজন করা হয়। তিনি বিষয়টিকে তখন উপভোগ করলেও বড় হয়ে বুঝতে পারলেন কাজটি কতোটা খারাপ হয়েছিলো। এবং তিনি অনুতপ্ত বোধ করেন। এ বিয়ের ফলে তাদের তিন ভাইয়েরই লেখা পড়ার খুবই ক্ষতি হয়।তার বড় ভাই কোনো প্রকারে সামাল দিয়ে উঠতে পারলেও তিনি এবং তার কাকাতো ভাইকে পড়া লেখায় এক বছর পিছিয়ে যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো প্রকারে লেখা পড়া চালিয়ে যেতে পারলেও তার কাকাতো ভাই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে সক্ষম হননি।ভালো হাতের লেখা লেখা পড়ার এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু গান্ধী ছোট বেলায় এ ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেননি। ফলে তাকে বেশ ভুগতে হয়েছে লন্ডনে পড়তে যাবার পর। আফ্রিকায়ও তাকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট ভুগতে হয়েছে। যখন তিনি দেখতে পেলেন ইয়াং উকিলরা সুন্দর হস্তক্ষরে আর্জি লিখছেন তখন তিনি খুব লজ্জিত হতেন। এছাড়া আফ্রিকার শিক্ষিত মানুষদের হাতের লেখাও খুবই সুন্দর ছিল। তখন তার ছোটবেলায় হাতের লেখার প্রতি যে অবজ্ঞা অবহেলা করেছেন তার জন্য খুবই দুঃখ হতো। পরে অবশ্য তিনি নিজের হাতের লেখা সুন্দর করতে সক্ষম হন। সুতরাং সুন্দর হাতের লেখা লেখাপড়ার জন্য এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা একে অবহেলা করে তাদের উচিৎ একে এখনই ঠিক করে নেয়া। এই মহাত্মা গান্ধীই পরবর্তী জীবনে ভারতের জাতির পিতা হিসেবে সম্মানীত হন। কিন্তু তাকে একসময় তার সম্প্রদায়ের মানুষেরাই জাতচ্যুত করে। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং ভাবনগরের সামাল দাস কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু কলেজের পড়া তার কাছে সমুদ্রের ন্যায় ভয়ংকর মনে হতো। তিনি ভাবতেন এই সমুদ্র তিনি কখনোই পাড়ি দিতে পারবেন না। ফলে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা দিয়েই বাড়ি ফিরে যান তিনি।এমন সময় তার এক কাকা তাকে ইংল্যান্ড যাওয়ার প্রস্তাব দেন। আর তিনি তাতেই রাজি হয়ে যান। যেহেতু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এ দেশে পড়ালেখা কন্টিনিউ করা তার পক্ষে মোটেও সম্ভব নয়। তিনি কোনোভাবে তার পরিবারকে রাজি করাতে পারলেও এ ব্যাপারে বাধ সাধেন তার সম্প্রদায়ের লোকজন।সম্প্রদায়ের শেঠ জানান এটি কোনোভাবে হতে দেওয়া যায় না। যেহেতু বানিয়ারা সমুদ্র যাত্রায় যায় না এবং ইংল্যান্ডে মদ্য পান ও আমিষ ভোজন করা ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না, সেহেতু তাকে কোনোভাবেই সে দেশে যেতে দেওয়া হবে না। কিন্তু গান্ধী তার সিদ্ধান্তে অনঢ় এবং অটল। তিনি যাবেনই। ফলে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা ঘোষণা দেয় তাকে জাতচ্যুত করা হলো এবং যারা তার সাথে বন্দরে যাবে তাদেরকেও জাতচ্যুত করা হবে!

39 COMMENTS