জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মোকাবিলায় কাজ করতে হবে

0
65

বরুণ ব্যানার্জীঃ

দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর—কবির এ উক্তিতে প্রতীয়মান হয়, বহুকাল ধরেই মানুষ সেই গাছপালা ঘেরা সবুজ পরিবেশে ফিরে যেতে চায়। পরিবেশ বিপর্যয়ের বহু ইতিহাস আছে। বহু জনপদ, শহর, প্রাণীকুল তাদের অস্তিত্ব হারিয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে। সারভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট কথাটি ইংরেজিতে বহুল প্রচলিত। সারভাইভ তারাই করবে যারা প্রকৃতিকে ভালোবেসে নিজের পারিবারিক সদস্য হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। আর যারা পারবে না তারা হারিয়ে যাবে প্রাকৃতিক নিয়মেই।

পরিবেশ বিপর্যয়ের এই ধারাবাহিকতায় আমাদের মতো নিচু দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশের ঝুঁকি সবচেয়ে ভয়াবহ। অসংখ্য জীবন ও আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও হাজার হাজার নিঃস্ব মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছে বাতাসে। নদী ভাঙন, বন্যা, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় বা হালের বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের সমাজের একটি বিরাট অংশের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। সব হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। শহরের ওপর চাপ বাড়ছে। সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছি আমরা। যদি তা হয় তাহলে আমাদের দেশের একটা অংশ ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু আমরা এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত নই।

গত ত্রিশ বছরের মধ্যে দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে এপ্রিল মাসে। আর তার পাশাপাশি রয়েছে মে মাসের গত বিশ বছরের তাপমাত্রার রেকর্ড। ভারতে তো পিচঢালা রাস্তায় ডিম ভাজার দৃশ্য পরপর দুই বছরই হয়ে গেল। অতীতের প্রায় ত্রিশ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে কালবৈশাখী, টর্নেডো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আঘাত করেছে। সেসব এলাকার অনেক মানুষ আজ গৃহহীন। পরিবেশবিদরা বলছেন, আবহাওয়ার চরিত্র অনেক বছর যাবৎ বদলাচ্ছে। ষড়ঋতুর এই দেশে এখন ছয়টি ঋতু আলাদা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। চারটি ঋতু স্পষ্ট হলেও হেমন্ত আর শরৎকে রীতিমতো নাম গুণে বের করতে হয়। কারণ, যখন যে আবহাওয়া থাকার কথা তখন তা থাকছে না। শীতের সময়ে খুব অল্প সময় শীত অনুভূত হয়। যখন গরম আসার কথা তখন শীত থাকে। অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি তো আমাদের লেগেই আছে। প্রকৃতি তার চরিত্র পাল্টাচ্ছে। আমরাও প্রকৃতির খেয়ালের সঙ্গে নিজেদের প্রস্তুত করে নিচ্ছি। কিন্তু ক্ষতি পোষাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশ্বের ৪০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হলো চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। আমরা মূলত এ রকম বড় বড় শিল্পোন্নত দেশের কার্বন উৎপাদনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার। তার সঙ্গে রয়েছে নিজেদের ভারসাম্যহীনতা।

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে পালিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ২০১৫ সালে সম্পাদিত বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো আশাবাদী ছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে আমরা পাশে পাব। যদিও এই জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের দেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও আমরাই বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছি। বিশ্বের ১৮০টি দেশের সমর্থনে করা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির শর্তানুসারে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার কথা। যে অর্থ ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করতে পারে। তবে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে এই জলবায়ু চুক্তি আজ ঝুঁকির মুখে।

অনেক দিন থেকেই শোনা যাচ্ছে, পৃথিবীর আবহাওয়া বিরূপ হতে শুরু করেছে। বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণগুলো ক্রমেই প্রকৃতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবেশ বিপর্যয়জনিত কারণে সবচেয়ে দুর্ভোগে যে দেশ পড়বে তার মধ্যে প্রথম সারিতেই বাংলাদেশের নাম রয়েছে। আমাদের দেশ নিয়ে চিন্তা তো আমাদেরই। তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে প্রবণতা তার জন্য সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার মতো হুমকি বহন করছে। ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে।

পৃথিবীতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে যে প্রভাব পড়ছে তার কিছুটা নমুনা আমরা দেখতে পাই প্রতিবেশী দেশ ভারতে। সেখানে তাপদাহের তীব্রতা এত বেশি যে বহু মানুষ মারা যায়। আমাদের দেশেও গরমের তীব্রতা গত বছর অনেক বেশি ছিল। হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আমরা যখন পরিবেশ ধ্বংস করি, তখন এই প্রকৃতির কথা মাথায় রাখি না। কিন্তু প্রকৃতি যখন নিজেই তার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, তখন আমাদের আর করার কিছুই থাকে না। ফলে দুর্ভাগ্যের শিকারে পরিণত হতে হয় অসহায় কিছু মানুষকে। আর তারাই বছরের পর বছর এর ক্ষত বহন করে চলে। সেই ক্ষত মোছানোর জন্য কাউকে পাশে পাওয়া যায় না।

LEAVE A REPLY