চে গেভারা: রোম্যান্টিক, বিপ্লবী, শহীদ, কিংবদন্তি

0
41
পলাশ মন্ডলঃ

মাথায় কালো বেরেটের নীচে ঝাঁকড়া চুল, চোখ যেন কোন সুদূরে, গোঁফ-দাড়ি মিলিয়ে এক রোম্যান্টিক বিপ্লবীর এই ছবিটি যেন সকলের মনেই গাঁথা হয়ে গিয়েছে৷ পঞ্চাশ বছর আগে ঘাতকের গুলিতে নিহত হন চে গেভারা৷

কিংবদন্তি

এর্নেস্তো ‘চে’ গেভারার জন্ম ১৯২৮ সালের ১৪ই জুন, আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের একটি বিত্তশালী পরিবারে৷ পরে তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে কিউবার বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন৷ কিউবায় কমিউনিস্ট স্বৈরতন্ত্র সম্পর্কে মতদ্বৈধ থাকলেও, চে যে নির্বিশেষে এক কিংবদন্তি, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷

গেরিলা যোদ্ধাদের মধ্যে ডাক্তার

চে গেভারা (বাঁয়ে) ও ফিদেল কাস্ত্রো (বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয়), এই দু’জনের প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৫৫ সালে, মেক্সিকোয়৷ দু’জনে তখন কিউবার একনায়ক বাতিস্তার বিরুদ্ধে গুপ্তপ্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট৷ ১৯৫৮ সালের এই ছবিটিতে চে ও কাস্ত্রো অন্যান্য গেরিলা যোদ্ধাদের সঙ্গে শলাপরামর্শে রত৷ বাতিস্তা কিউবা ছেড়ে পালান ১৯৫৯ সালের পয়লা জানুয়ারি৷

বিপ্লবী নেতা

কাস্ত্রো আইন করে ‘কমান্দান্তে’ চে-কে কিউবার নাগরিকত্ব প্রদান করেন৷ চে প্রথমে কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ও ১৯৬১ সাল থেকে কিউবার শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ সরকারি যোজনা ও পাঁচশালা পরিকল্পনার পক্ষপাতী ছিলেন চে৷ তাঁর আমলে কিউবায় মার্কিন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় ও গ্রামাঞ্চলে বসতিনির্মাণ ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সংক্রান্ত কর্মসূচি চালু করা হয়৷ বড় বড় ভূস্বামীর জমি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়৷

গরীবের বন্ধু

ডাক্তারি পড়াশুনার সময়েই চে দক্ষিণ অ্যামেরিকার বিভিন্ন দেশ সফর করেছিলেন৷ এই যাত্রায় তিনি যে দারিদ্র্য, অভাব-অনটন ও দুর্নীতি দেখেন, তা তাঁকে সারা জীবনের জন্য প্রভাবিত করেছিল৷ কখনো-সখনো তিনি কুষ্ঠাশ্রমেও ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছেন৷ শিল্পমন্ত্রী হিসেবেও তিনি নিজেই হাত লাগিয়েছেন৷ ১৯৬১ সালে হাভানায় সস্তার বাড়ি তৈরির প্রকল্পে মজদুরদের সঙ্গে একদিন কাটান চে ৷

বিপ্লব ছড়ানোর কাজে

১৯৬৫ সালে চে সম্ভবত কাস্ত্রোর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে কিউবা ছেড়ে কঙ্গোয় চলে যান৷ চে-র মিশন ছিল, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি গুপ্তপ্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলা৷ সে কাজে তিনি সফল হতে পারেননি৷

কঙ্গোর পর বলিভিয়ায়

এখানেও চে-কে অনুরূপ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়৷ দেখা যায়, চাষিরা বিপ্লবে যোগদান করতে নারাজ; কাজেই চে ও তাঁর যোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন৷ গ্রামাঞ্চলের মানুষ তাদের সাহায্য করেনি, বরং শত্রুতা করেছে৷ ১৯৬৭ সালে তাঁর খচ্চর চিকো-র সঙ্গে চে-র এই ছবিটি তাঁর শেষ ছবিগুলির মধ্যে গণ্য৷

বিপ্লবী থেকে শহীদ

১৯৬৭ সালের ৮ই অক্টোবর ক্যাপ্টেন গ্যারি প্রাদো-র সৈন্যরা লা ইগুয়েরা-র কাছে চে-কে গ্রেপ্তার করে৷ তার একদিন পরে চে-কে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ হত্যার নির্দেশ সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এসেছিল বলে প্রাদো পরে দাবি করেন৷ বলিভিয়ার জেলখানাগুলো থেকে প্রায়ই বন্দিরা পালানোর চেষ্টা করতো, সেই কারণেই চে-কে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রাদো জার্মান ডিপিএ সংবাদ সংস্থার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন৷

ফেরা

অর্ধশতাব্দী আগে বলিভিয়ায় ভাইয়েগ্রান্দে শহরের হাসপাতালের এই কাপড় ধোয়ার ঘরটিতে চে-র মরদেহ রাখা ছিল৷ পরে তাঁকে কোনো অজ্ঞাত স্থানে সমাধিস্থ করা হয়৷ ‘‘তোমাকে মাটিতে পুঁতেও ওরা আমাদের তোমাকে খুঁজে পাওয়া আটকাতে পারবে না,’’ ঘরের এক কোণে দেয়ালে লেখা রয়েছে৷ কথাটা সত্যি, কেননা, ৩০ বছর পরে চে-র দেহাবশেষ কিউবায় নিয়ে যাওয়া হয়৷

অমর চে

২০০৮ সালে চে-র ৮০-তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাঁর জন্মের শহর রোজারিও-তে চে’র একটি মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়৷ মূর্তির উন্মোচন উপলক্ষ্যে হাজার হাজার মানুষ রোজারিওতে গিয়েছিলেন৷ চে’র জীবনীকার হর্হে কাস্তানিয়েদার মতে, চে তাঁর ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের কারণে পশ্চিমা জগতে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়ে আধুনিকতার একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন৷

বাণিজ্যিক

চে’র প্রতিকৃতি আজ সর্বত্র৷ টি-শার্ট থেকে শুরু করে দেয়ালে টাঙানোর পোস্টার বা চায়ের কাপ, বিয়ারের বোতল কিংবা ছাতা – সব কিছুর উপর চে’র মুখ৷ এই নিছক পুঁজিবাদি ‘মার্চেন্ডাইজিং’ কমান্দান্তে চে’র ভালো লাগতো কিনা বলা শক্ত৷