চার বিষয়ে বেশি ফেল!

1
132

অনলাইন ডেস্কঃ

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি, উচ্চতর গণিত, ইংরেজি, পদার্থ বিজ্ঞানে ফলাফল খারাপ হওয়ায় এবার কমেছে পাসের হার ও জিপিএ-৫। কক্সবাজারসহ তিন পার্বত্য জেলাগুলোসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এসব বিষয়ে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় ভালো ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়নি বলে শিক্ষকদের অভিমত। আইসিটিতে বেশি খারাপ করেছে মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে এইচএসসিতে এবছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৯৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে পাস করেছে ৮৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। আর মানবিক থেকে পাস করেছে ৭১ দশমিক ০৬ শতাংশ। গতবছর এ বিষয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেছিলো  ৯৭ দশমিক ২০ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৮৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ  ও মানবিক থেকে পাসের হার ছিলো ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গতবছর এ বিষয়ে পাশের হার বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক মিলে ছিলো  ৮৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। ইংরেজি বিষয়ে গ্রুপ ভিত্তিক পাসের হারে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবছর ইংরেজি ১ম পত্রে পাস করেছে ৯৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ইংরেজি ২য় পত্রে পাস করেছে ৯৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ইংরেজি ১ম পত্রে পাস  পাস করেছে ৮২ দশমিক ৭৮শতাংশ ও ইংরেজি ২য় পত্রে পাস করেছে ৬৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
মানবিক বিভাগ থেকে ইংরেজি ১ম পত্রে ৬৪ দশমিক ৩১ শতাংশ ও ইংরেজি ২য় পত্রে পাসের হার  ৪৭  দশমিক ৬৪ শতাংশ। গতবছর ইংরেজি ১ম পত্রে পাসের হার ছিলো ৯০ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও ইংরেজি ২য় পত্রে পাসের হার ছিলো ৬৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। উচ্চতর গণিত  ১ম পত্রে গতবছর ৯১ দশমিক ৪৭ শতাংশ, এবছর ৭১ দশমিক ৪৪ শতাংশ পাস করেছে। উচ্চতর গণিত ২য় পত্রে গতবছর পাসের হার ছিলো ৮৯ দশমিক ২২ শতাংশ ও এবছর পাসের হার ৮৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। পদার্থ বিজ্ঞান ১ম পত্রে গতবছর পাসের হার ছিলো ৮২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এবছর এ বিষয়ে পাসের হার  ৬৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পদার্থ বিজ্ঞান ২য় পত্রে গতবছর পাসের হার ছিলো ৯৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।  আর এ বছর পাসের হার ৯০ দশমিক ৯৩ শতাংশ। জানা যায়, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০১৩-২০১৪ সেশনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে যুক্ত করে সরকার। মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান, তিন বিভাগেই বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকের কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এতে করে ১০০ নম্বরের বিষয়টি নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। শিক্ষকের অভাবে বিষয়টির সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হয়নি। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলছেন, আগে শিক্ষার্থীদের ৫টি আবশ্যিক বিষয়ে পাস করলেই হতো। আবশ্যিক হওয়ায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টিতে ফেল করা শিক্ষার্থীরা পাস করতে পারেনি। পদ সৃষ্টি না করে, শিক্ষক না দিয়ে, কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত না করে এভাবে একটি বিষয়কে বাধ্যতামূলক করার জন্যই ফলাফলে এতো বিপর্যয় বলে মনে করছেন তার মতো অনেক শিক্ষক। এতে বিপাকে পড়ে পরিচালনা কমিটির অধীনে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কোনো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সম্মানজনক সম্মানি ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা না পওয়ায় থাকছেন না শিক্ষকরা। অন্যদিকে, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্য বিভাগের শিক্ষক দিয়ে কয়েকটি ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, দেশের এমপিওভুক্ত ১৬ হাজার ৯টি বেসরকারি স্কুলের মধ্যে সাড়ে আট হাজার স্কুলেই আইসিটির কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষক নেই। মাদ্রাসার অবস্থা আরও করুণ।  সারাদেশে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে ছয় হাজার ৪৭১টি। এর মধ্যে শিক্ষক নেই পাঁচ হাজারটিতে। যা আছে তাদেরও বেতন নেই। এদিকে চট্টগ্রামের কলেজগুলোতে আইসিটি বিষয়ের কোনো শিক্ষক না থাকায় এ বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছে অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা। যাদের আইসিটি বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে কোনো ক্লাসই হচ্ছে না। ফলে এ বিষয়ে কোনো কিছুই শিখছে না শিক্ষার্থীরা। কিছু তত্ত্ব বা থিওরি মুখস্থ করে পাস করলেও বাস্তবজীবনে এর কোনো প্রয়োগও শিখছে না তারা। ফলে বাধ্যতামূলক একটি বিষয় অনেকটা খামখেয়ালির উপরেই চলছে। চট্টগ্রাম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শেখর দস্তিদার জানান, একটি বিষয়কে আবশ্যিক করার আগেই সে বিষয়ের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়। যেমন বাংলা, ইংরেজি বা গণিতের মতো বিষয়ে যদি কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকে তবে তা যেমন সব শিক্ষার্থীর জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তেমনই অবস্থা আইসিটি শিক্ষাতে এখন বিরাজ করছে। তাদের ভাষ্য, এ অবস্থায় চলতে থাকলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন কোনো দিনই পূরণ হবে না।

জানা যায়, ২০১১ সালের আগে কম্পিউটার শিক্ষা নামে একটি বিষয় ছিল যা বাধ্যতামূলক ছিল না। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাইলে পড়াত। কিন্তু বাধ্যতামূলক না হওয়ায় দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বিষয়টিকে পড়াত না। ছিল না কোনো শিক্ষকও। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের বাইরে এ বিষয়ের কোনো অস্তিত্বই ২০১১ সালের আগে ছিল না। শহরেরও হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ ছিল।২০০৮ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) নাম দিয়ে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে সংযোজন করেন। এরপর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের কোনো উদ্যোগ না দেখে নিজেরাই শিক্ষক নিয়োগ দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক নিয়োগ সরাসরি সরকারের কোনো শাখা দেয় না। বরং ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির লোকেরা মিলে স্থানীয় শিক্ষা অফিসের সহায়তায় পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে। স্কুল কলেজগুলো থেকে জানানো হচ্ছে এ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের এটিই নিয়ম। তবে সে নিয়ম মেনে শিক্ষক নিয়োগ দিলেও সরকার ২০১১ সালের পর থেকে বিগত ৭ বছরে এ বিষয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের জন্য কোনো মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (এমপিও)-এর ব্যবস্থা করেনি। ফলে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিল তারাও চাকরি ছেড়ে চলে গেছে বা যাচ্ছে। আর যারা এখনো টিকে আছে, তাদেরও শ্রেণিকক্ষের প্রতি কোনো মনোযোগ নেই। অন্যদিকে উচ্চতর গণিত এবার প্রথম সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। যার ফলে এ বিষয়ে মফস্বল ও পার্বত্য অঞ্চলের পরীক্ষার্থীরা খারাপ করেছে। কারন মফস্বল ও পার্বত্য জেলাগুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে। একই সাথে রয়েছে পদার্থ বিজ্ঞানেসর জটিল প্রশ্নপত্র। যা অনেকে পরীক্ষার্থী আত্মস্থ করতে পারেনি পরীক্ষা হলে। এদিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ বেশি আসার কথা থাকলেও গতবছরের তুলনায় এ বছর তা আসেনি পদার্থ বিজ্ঞান আর উচ্চতর গণিতের জন্যই। এবছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫  পেয়েছে  ছাত্রী ৪৪৩ জন ও ছাত্র ৬৩৬জন।
আর মানবিক বিভাগ থেকে পেয়েছে জিপিএ-৫ পেয়েছে ছাত্র ১৮ জন ও ছাত্রী ১৬ জন। আর ব্যবসায় শিক্ষা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ছাত্র ১১৩ জন ও ছাত্রী ১৬৫ জন।

এবছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী মোট ৮২ হাজার ৪১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫০ হাজার ৩৪৭ জন। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছিলো ১ হাজার ৩৯১ জন। অন্যদিকে গত বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ছিলো ৯৬৭ জন আর ছাত্র ছিলো ৭০৭ জন। মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ছিলো ৩০ জন আর ছাত্র ছিলো ২ জন। আর ব্যবসায় শিক্ষা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ছাত্র ২৪৭ জন ও ছাত্রী ২৭৭ জন। মোট অংশগ্রহনকারী  ৮৬ হাজার ৭১৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫৬ হাজার ১৬ জন। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছিলো ২ হাজার ২৫৩ জন। গত বছর ছাড়াও ২০১৩ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো ২ হাজার ৭৭২ জন, ২০১৪ সালে ২ হাজার ৪৪৬ জন, ২০১৫ সালে ২ হাজার ১২৯ জন।

1 COMMENT