গাছেরা যদি ভূমিকম্প থামায়

34
126

ওয়েব ডেস্ক:

বনজঙ্গলের গাছপালা কি ভূমিকম্পের তীব্রতা কমানোর ক্ষমতা রাখে? ফরাসি বিজ্ঞানীরা মাঠে ও জঙ্গলে কম্পনের তরঙ্গ নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে সেই প্রশ্নেরই উত্তর পাবার চেষ্টা করছেন৷

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের মিমিজঁ গ্রামের কাছে একটি পাইন গাছের বন৷ বিজ্ঞানীরা এখানে সাইসমিক ওয়েভ বা ভূকম্পনঘটিত তরঙ্গের ওপর গাছেদের প্রভাব নিয়ে একটি বড় মাপের পরীক্ষা চালাচ্ছেন৷

বিজ্ঞানীরা এসেছেন ফ্রান্সের অপর প্রান্তে গ্রেনোব্লে শহরের ‘আইএস-ত্যার’ ভূবিজ্ঞান ল্যাবরেটরি থেকে৷ প্রতিষ্ঠানটির পদার্থবিদরা একটি চমকপ্রদ আবিষ্কার করেছেন৷ ভূকম্পনের অনুকরণে একটি এক্সপেরিমেন্টে তারা একটি ধাতব পাতে কম্পন সৃষ্টি করেন: প্লেটটিতে লম্বা লম্বা ধাতব রড লাগানো ছিল৷ মাটিও রুপ্যাঁ আর ফিলিপ রু দেখেন যে, রডগুলো যেখানে মেটাল প্লেটটিতে জোড়া লেগেছে, সেখানে কম্পনের মাত্রা অনেক কম৷

দুই বিজ্ঞানী মুক্ত প্রকৃতিতে তাদের এক্সপেরিমেন্টের পুনরাবৃত্তি করার সিদ্ধান্ত নেন – রডের বদলে গাছ দিয়ে; গাছের নীচে মাটি বা জমিটা হবে যেন ঐ ধাতব প্লেট৷ গাছেরা কি মাটিতে ভূকম্পনের বিস্তার রোধ করতে পারে?

প্রস্তুতি

প্রথমে বিজ্ঞানীরা একটি পরিখা খুঁড়ে মাটির ধরন ও পদার্থবিদ্যাগত গুণাগুণ সম্পর্কে আরো বেশি জানবার চেষ্টা করেন, কেননা প্রথমেই প্রশ্ন ছিল: মাটি নিজেই ভূকম্পনের তীব্রতা অংশত শুষে নেয় কিনা৷ বিজ্ঞানী ফিলিপ রু বললেন, ‘‘সেটাই হলো আসল চ্যালেঞ্জ৷ আমাদের ফিল্ড এক্সপেরিমেন্ট দেখাবে যে, আমরা যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছি, তা কোনো বিশেষ পদার্থের ওপর নির্ভর করে না৷ বাহ্যিক পার্থক্য সত্ত্বেও, তরঙ্গের বিস্তার সংক্রান্ত পদার্থবিদ্যাগত ঘটনা কি একই থাকে?”

বিজ্ঞানীরা প্রথমে রাডার দিয়ে জমিটা সার্ভে করে নেন, যাতে পরে আঁকাজোকা করার সময় ফ্যাক্টর হিসেবে জমির উঁচুনীচু বৈশিষ্ট্য পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে৷ রাডার তরঙ্গ দু’মিটার পর্যন্ত মাটিতে ঢুকে যায়৷

বিজ্ঞানীরা মাটিতে প্রায় ১,০০০ সাইসমিক সেন্সর বসিয়েছেন – তাদের অর্ধেক জঙ্গলে আর বাকি অর্ধেক কাছের একটা খোলা মাঠে৷ তারা গাছেও সেন্সর লাগিয়েছেন, ফিলিপ জুজঁ যার দায়িত্বে ছিলেন – তিনি একজন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ৷ জুজঁ সাধারণত বাড়িঘরে সেন্সর লাগিয়ে থাকেন, সাইসমিক ওয়েভ বা ভূকম্পনের তরঙ্গে বাড়িঘরের কি প্রতিক্রিয়া হয়, তা দেখবার জন্য৷

আরটুডিটু

সব ক’টি সেন্সর বসাতে ও পরীক্ষা করতে প্রায় তিন দিন সময় লেগে গেছে৷ এবার চাই সাইসমিক ওয়েভ৷ ভূকম্পনের তরঙ্গের নকল করবে একটি বহনযোগ্য ভাইব্রেশান জেনারেটর৷ তার ৭০ কিলোগ্রাম ওজনের সিলিন্ডারটি সুইচ টিপলে ওঠানামা করে, যার ফলে ভাইব্রেশান বা কম্পন সৃষ্টি হয়৷ বিজ্ঞানীরা বস্তুটির নাম দিয়েছেন আরটুডিটু৷ ভাইব্রেশান জেনারেটরের পক্ষে সত্যিই একটা ভূমিকম্প সৃষ্টি করা সম্ভব নয় – তবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য এই মাত্রার কম্পনই যথেষ্ট৷

আরটুডিটু চালু করার পর সেন্সরগুলি তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করে৷ দেখা যায়, খোলা মাঠে কম্পনের বিস্তারের নকশাটি স্বাভাবিক ও একটানা হলেও – জঙ্গলে তা অনেক কম! তাহলে কি এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে আশাজনক ফল পাওয়া গিয়েছে? ফিলিপ রু বললেন, ‘‘আমরা এখনো সব তথ্য বিশ্লেষণ করিনি৷ কিন্তু আমরা যে ফলাফল দেখার আশা করছিলাম, তার কিছুটা আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি৷ প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে বনজঙ্গল সত্যিই রেজোনেটর হিসেবে কাজ করে ও কম্পনের মাত্রা কমিয়ে দেয় – এমনকি পুরোপুরি রোধ করে দিতে পারে৷”

মুশকিল আসান?

এই গবেষণার ফলে হয়ত ভূকম্পন রোধের নতুন পন্থার উদ্ভব হতে পারে… এমনকি ভূমিকম্পের সময় মানুষের জীবন বাঁচাতেও সাহায্য করতে পারে৷ ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ফিলিপ জুজঁ জানালেন, ‘‘ভূকম্পনে শহর এলাকার বাড়িগুলো ঠিক গাছের মতোই আন্দোলিত হয়৷ অনেক বাড়ি থাকার ফলে তারা সাইসমিক ওয়েভগুলোর তীব্রতা প্রশমন করতে পারে৷ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পরিকল্পনা হল, আমরা এখানে অরণ্যে যা পর্যবেক্ষণ করছি, তা নগর পর্যায়ে ব্যবহার করা যায় কিনা… এমন সব বাড়ি বা বাড়ির সমষ্টির কথা ভাবা যায় কিনা, যা শহরকে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে৷”

শুনতে তো ভালোই লাগে – তবু এ দূর ভবিষ্যতের স্বপ্ন৷ মিমজঁ-র পাইন ফরেস্ট থেকে আগামীর সেই ভূমিকম্প প্রতিরোধী নগরসভ্যতা এখনও অনেক দূর৷

34 COMMENTS