গনমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা থাকা উচিত

12
249

বরুণ ব্যানার্জী :

সংবাদপত্র সমাজের আয়না। সাংবাদিকতা একটি মহান ও পবিত্র পেশা। আয়নায় যেমন নিজের চেহারা প্রতিবিম্বিত হয়, তেমনি দেশ, জাতি, সমাজ এমনকি সমকালীন বিশ্বের চলমান ঘটনা, জীবনযাত্রা, চিন্তাচেতনা, জাতীয় স্বার্থ ও দিকনির্দেশনা সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয়। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা জাতির জাগ্রত বিবেক এবং পাঠকরাই হচ্ছে সংবাদপত্রের প্রাণশক্তি। সামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সত্য-সুন্দর এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। আর পেশার মানদণ্ডে সাংবাদিকতা একটি মহৎ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সম্মানজনক পেশা।

সংবাদপত্রের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আদিযুগে পাথর বা শিলালিপিতেই সংবাদ প্রচার করা হতো। তখন সম্রাট বা শাসকের রাজনৈতিক ঘটনাবলি, যুদ্ধের বিবরণ, প্রজা বা নাগরিকদের প্রতি বার্তা প্রচার করা হতো। হরফ বা মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃৃত হয় মধ্যযুগের ১৪৪০-১৪৫০ সালে; ইউরোপের জার্মানিতে। তখন খবর বলতে যুদ্ধ, আজব ও গুজব ছাপা হতো। ১৭০২ সালে প্রথম এক পাতার ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি কারেন্ট’ প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ড থেকে। তখন খবর বলতে চটকদার অপরাধ, কেচ্ছা, নিলাম আর নিষেধাজ্ঞা ছাপা হতো। ভারতে প্রথম পত্রিকা বের হয় কলকাতা থেকে ২৯ জানুয়ারি ১৭৮০ সালে। পত্রিকার নাম ‘বেঙ্গল গেজেট’। টিকেছিল মাত্র দুই বছর। বাংলায় সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের ১৪ মে। পত্রিকার নাম ‘বাঙ্গাল গেজেট’। প্রকাশক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। এই পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতো সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, জন্ম-মৃত্যু, বিয়ের খবর। সতীদাহ নিয়ে এ সময় আরো দুটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সাপ্তাহিক সমাচার ও মাসিক দিগদর্শণ। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকার নাম ‘জ্যোতি’। বেরিয়েছিল ১৯২১ সালে, চট্টগ্রাম থেকে। দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালের ১৮ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম পত্রিকা বেরোয় চট্টগ্রাম থেকে। নাম ‘পয়গাম’। ঢাকা থেকে বের হতো জিন্দেগি, সপ্তাহে মাত্র দুটি সংখ্যা। মাওলানা আকরাম খাঁর সম্পাদনায় ‘আজাদ’ কলকাতা থেকে বেরিয়েছিল ১৯৩৬ সালে। পত্রিকাটি ঢাকায় আসে ১৯৪৮ সালে। ১৯৪৯ সালে বের হয় ‘দ্য পাকিস্তান অবজারভার’ ও ‘দৈনিক সংবাদ’। পরে দৈনিক পাকিস্তান হয়ে যায় দৈনিক বাংলা। ১৯৬৪ সালে আসে পূর্বদেশ, মর্নিং নিউজ। ১৯৭২ সালে সরকারি মালিকানাধীন সাপ্তাহিক বিচিত্রা।

সংবাদপত্র যে প্রকৃত পক্ষে ‘ফোর্থ স্টেট’ এ ধারণাটিও মূলত শতাব্দী পুরনো। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গ্যালারিতে উপস্থিত সংবাদপত্র প্রতিনিধিদের লক্ষ করে রাষ্ট্র্র্র কাঠামোতে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বোঝাতে এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন, তারা এই রাষ্ট্রের ‘ফোর্থ স্টেট’। তাই চলমান জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিহার্য। সংবাদপত্র পৃথিবীকে মানুষের মুঠোর মধ্যে দিয়েছে। স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার উন্নয়নে ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ভূমিকার বিষয়টি আমরা আরও বেশি অনুধাবন করতে পেরেছি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে মানুষের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন সংগ্রামের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।

সংবাদপত্র একটি দেশ ও জাতিকে যেমন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আবার জাতির সর্বনাশও করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংবাদ পরিবেশনই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ খবর সমাজে শান্তি আনে, আর খারাপ খবর কখনো সমাজকে বিষিয়ে তোলে, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। সেহেতু সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সতর্ক হয়েই লিখতে হয়। সংবাদপত্রে যে সংবাদ সেখানে বিধৃত হবে, সে সংবাদের নানাবিদ উপাদান পাওয়া যাবে সমসাময়িক সমাজ ও সমাজভূমি থেকে। রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় চরিত্র, যা সেই রাষ্ট্রের সমাজ অর্থনীতি ও জীবন ব্যবস্থার প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে অনিবার্যরূপে, তার অপ্রতিরোধ্য প্রভাব সংবাদপত্রের ওপরও বর্তায়।

সংবাদপত্র এমন একটি দলিল যা যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণ করে রাখা যায়। সংবাদপত্রকে গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষার বিকল্পহীন প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কারণেই গণতন্ত্র বিপন্ন হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিপর্যয় ঘটে আবার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হলে গণতন্ত্রও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। সংবাদপত্র মূলত পাঠকের জন্য এবং সে পাঠক অবশ্যই সমাজমনষ্ক পাঠক। সংবাদপত্র যখন সমাজের অবিকৃত নানা ঘটনার একটি নিরপেক্ষ সংবাদচিত্র পাঠকদের উপহার দিতে পারে, তখন সে সংবাদপত্র শুধু পাঠকের খোরাক জোগায় না, একজন সাধারণ পাঠককেও সপ্রতিভ নাগরিক করে তোলে। একজন নাগরিক রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হলে সে যেমন জাতির কল্যাণ সাধন করতে পারে না, তেমনি নিজের কল্যাণ সাধনও তার পক্ষে সার্থকভাবে করা সম্ভব নয়। নাগরিকদের রাজনৈতিক জ্ঞান অর্জনের যত উপায় আছে, তার মধ্যে সংবাদপত্রের স্থান শীর্ষে। সংবাদপত্রের জগতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় এবং পৃথিবীর গণমাধ্যমগুলো অতিবৈজ্ঞানিক ত্বরিত সেবা প্রদান করতে সক্ষম হওয়ায় সংবাদপত্রের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে সাংবাদিকরা দুই জায়গায় দায়বদ্ধ। একটি বিবেক, অন্যটি সমাজ। কলমই হলো সাংবাদিকদের প্রধান অবলম্বন। সাংবাদিকদের অনেক কষ্টের মধ্য দিয়েও সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হয়। মিথ্যা সংবাদ কিছুক্ষণ বা কয়েকদিনের জন্য কারো কারো কাছে বাহবা কুড়াতে পারে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা যারা সত্য জানেন তাদের কাছে চিরদিনের জন্য ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকে। সাংবাদিকদের লিখনী আমাদের দিকনির্দেশনা দিক। সবাই উন্নয়ন সম্পৃক্ত হই। শুধু আমাদের ভুলত্রুটি লেখাই সাংবাদিকদের কাজ নয়। বরং আমাদের উন্নয়নের চিত্রও জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। একজন সাংবাদিক কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে লড়ে সীমিত অধিকার, চাপ ও মৌলিক অধিকার হরণকারী ভীতির মধ্যে সংবাদকর্মীদের সবসময় কাজ করতে হচ্ছে। একটা সংবাদের পেছনে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেধায় আমাদের সবার সামনে সত্য প্রকাশ হয় তাদের সম্পর্কে এখনো আমরা যত্নশীল নই।

খবর বিষয়টি আসলে কী? সংবাদ কেন এবং কার জন্য? সংবাদ কিভাবে লিখতে হয়? অনেক পত্রিকার সম্পাদকও এ বিষয়ে কতটুকু জানেন, বিতর্ক আছে। আমি সে বিতর্কে যেতে চাই না। এ বিষয়ে শুধু এটুকুই বলা যায়, একটি পত্রের যেমন নীতিমালা থাকে তেমনি থাকে সংবাদ প্রকাশের নীতিমালাও। কোন সংবাদ বা স্টোরিটি ছাপানো যাবে, আর কোনটা ছাপানো যাবে না তা সংবাদপত্রের সম্পাদককে অবশ্যই জানতে হবে। টাকার জোরে অথবা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য অথবা দুর্নীতি ঢাকা দেবার জন্য অনেকে সংবাদপত্রের মালিক অথবা সম্পাদক বনে যান। এদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। আর এসব পত্রিকায় যারা লেখালেখি করে সাংবাদিকতা শিখছেন-তারা সাংবাদিক না হয়ে প্রকারান্তরে চাঁদাবাজ খ্যাতি পাচ্ছেন। ফলে সাংবাদিক সম্পর্কে সমাজে বা সাধারণ মানুষের কাছে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে। কিছু লোভী মানুষ সাংবাদিকতাকে নিজেদের স্বার্থ গুলজারে সংবাদপত্রকে ব্যবহার করছেন। এটা রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য অশুভ লক্ষণ। ‘যা কেউ কোথাও ধামাচাপা দিতে চায়, সেটাই খবর। বাদবাকি সব হচ্ছে বিজ্ঞাপন’। ১৮৬৫ সালে এই উক্তিটি করেছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক আলফ্রেড চার্লস উইলিয়াম হার্মসওয়ার্থ। ‘কোনো কুকুর যখন একটি মানুষকে কামড়ায় তা খবর নয়। কেননা সেটি হরহামেশা ঘটে। কিন্তু কোনো মানুষ যদি একটি কুকুরকে কামড়ায়-সেটা খবর’। ১৮৩৩ সালে এই উক্তিটি করেছিলেন, নিউইয়র্ক সান পত্রিকার নগর সম্পাদক জন বি বোর্গাট। ‘যা কিছু জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের আগ্রহের নাগাল পায় এবং যা আগে কখনো তাদের গোচরে আনা হয়নি, তা-ই খবর’। ১৮৬৮ সালে এই উক্তিটি করেছিলেন, নিউইয়র্ক পত্রিকার সম্পাদক চার্লস এ ডানা।

সাংবাদিকতার প্রথম দায়বদ্ধতা সত্যের কাছে। সাংবাদিকতার প্রথম আনুগত্য নাগরিকজনের প্রতি। সাংবাদিকতার সার কথা হচ্ছে সুশৃঙ্খল যাছাই। যেমন যৌনতা, সন্ত্রাস, সহিংসতা ও বীভৎসতার উৎকট বা নগ্ন প্রকাশ নয়, মৃতের প্রতি সম্মান, লাশের ছবি না ছাপা, খারাপ ভাষা পরিহার, নিজের অবস্থান পরিষ্কার রাখা, ঘটনা বলবেন না-দেখাবেন, এটাই প্রকৃত সাংবাদিকতা। অন্যান্য পেশার মতো সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও কতক গুণ বা যোগ্যতা থাকা দরকার।শেষ করতে চাই এই বলে, যারা সাংবাদিকতাকে একটি মিশন বা মহান পেশা হিসেবে বিবেচনা করেন, তাদের কাছে দলীয় সঙ্কীর্ণতার ওপর পেশাগত সততা এবং আদর্শ বড় বলে বিবেচিত হয়। দল ও দলীয় নেতা ভুল করলে তারা তাও তুলে ধরেন। দলীয় আনুগত্যের চেয়ে দেশপ্রেমকে বড় করে দেখেন। সংবাদপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা হলো সাংবাদিকদের। সেজন্যই সাংবাদিকদের সমাজের অতন্দ্র প্রহরী বলা হয়। সাংবাদিক সমাজ জাতির বিবেক হিসেবে চিহ্নিত; যারা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষকে নিঃস্বার্থ ও নিরলসভাবে সেবা করা উচিত। কিন্তু আজকাল সাংবাদিক পেশায় নয়ছয় ঢুকে গেছে বলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দলবাজীর অভিযোগ উঠছে। বিভিন্ন ঘরানার সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিকরা দ্বি-বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তা ছাড়া অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হলুদ সাংবাদিকতার অভিযোগ উঠছে। অনেকেই পক্ষপাতদুষ্ট। যা কারো কাছে কাম্য নয়।

12 COMMENTS