কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি মাটির উপর

1
68

বরুণ ব্যানার্জী:

উর্বরতা মাটির প্রাণ। এই প্রজনশীলতা না থাকলে সেই মাটি অসার। বাংলাদেশের মাটির উর্বরতা এদেশকে ফসলে ফসলে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছে। মানুষ নিজেকে মাটির সন্তানই মনে করে। তাই মাটিকে মায়ের মতো মর্যাদায় মহিমান্বিত করা মানুষের রীতি। আমরা কথাতেই বলি, মা-মাটি-মানুষ। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই চলে। সৃষ্টি করে বহুমুখী বিকাশ, উদ্ভাবন, নবায়ন। আসলে সর্বংসহা মাটিকে আশ্রয় করেই চলে মানুষের জীবন, ক্রমবৃদ্ধির বৃত্তায়ন। নানাভাবে অত্যাচারিত মাটি এখন অপুষ্টির শিকার। আমাদের কৃষিজ উৎপাদনের বেশির ভাগ ভরসা মাটির উপর। শিল্পায়নের প্রচেষ্টা এদেশে বেশ কিছুকাল ধরেই চলছে। তা সত্ত্বেও এদেশের জলবায়ুর প্রকৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান দেশটাকে কৃষি-নির্ভরতার সুবিধাটুকু হারাতে দেবে না। কৃষিপণ্য উৎপাদনের আজকের বহুমুখী ব্যাপকতা অব্যাহতই থাকবে। এদেশের মানুষের সম্পর্ক যন্ত্রের সাথে যতোই বাড়–ক, বিজ্ঞানের আবিষ্কার আর উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সুযোগ গ্রহণ করে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে মাটির সৃজনশক্তির সাথে এদেশের মানুষের বিচ্ছিন্নতা কদাপি ঘটবে না। ফসলের আবাদ নিবিড় ও বহুমুখীকরণের দিকেই ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকবে। আর, তা হবে এদেশের মাটির উর্বরতার প্রভাবেই। অতএব, এখনও এদেশের সবচেয়ে বড়ো প্রচেষ্টা হলো আমরা দেশের উর্বর মাটির সর্বোত্তম ব্যবহারের মধ্যদিয়েই আমাদের কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি তাদের হাতেই তুলে দিতে চাই। এটা করতে হলে এই ফলবতী মাটিকে সদা-সর্বদাই উত্তম পরিচর্যার মধ্যদিয়ে সহজ-প্রসবী উর্বরতায় সমৃদ্ধ করে রাখতে হবে। রাসায়নিক সার ও ক্ষতিকর কীটনাশকের সংস্পর্শমুক্ত রাখতে হবে। এ কারণেই আজ এদেশের সচেতন চিন্তাবিদের কাছ থেকে সাধারণ জনদের কাছে বার্তা পাঠানো হচ্ছে, মাটি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে দেশ ও জাতি বাঁচবে। তাই জমিতে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হলে ফসলী ক্ষেতের মাটি পরীক্ষা করে তাতে প্রয়োজনের সুষম সার ব্যবহার করতে হবে। এদেশে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মৃত্তিকা পরীক্ষার জন্য গবেষণাগার আছে। সেখানেই যোগাযোগ করে কৃষি বিভাগের পরামর্শকদের মাধ্যমে কৃষকরা তাদের জমির মাটির পরীক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। মনে রাখতে হবে সুষম সার ব্যবহারেই মাটির স্বাস্থ্য ভাল থাকে এবং ফলন বাড়ে অধিক হারে। চাষাবাদের মাটি পরীক্ষা করালে মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি-উপাদানের পরিমাণ জানা যায়। জানা যায়, কোন্ পুষ্টি উপাদানের অভাব রয়েছে। এর মাধ্যমে মাটিতে কোন্ পুষ্টি উপাদান এবং কোন্ সার কি পরিমাপে সরবরাহ করতে হবে তা নির্ণয় করা যায়। জানা যায়, মাটির উর্বরতার পরিমাণ এবং কি পরিমাণ জৈব পদার্থ আছে তাও। মাটির অম্লমান/অম্লত্ব/লবণাক্ততা পরিমাণ জানা যায়। মাটিতে উপস্থিত ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণও নির্ণয় করা যায়। এভাবে,মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় কথাটা হোল, সার প্রয়োগ করা যায় ফসলের চাহিদা অনুযায়ী। অতএব, এদেশে খাদ্য উৎপাদনের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখতে হলে এসবই হলো মাটির পরিচর্যা কিংবা সুরক্ষার উপায়। আমাদের চাই ফসলদায়িনী উর্বর মাটি।