কলারোয়া ৫০ শয্যা হাসপাতালে ডাক্তার ২ জন ! বন্ধ বহির্বিভাগ

0
162
ইয়ারব হোসেন:
ডাক্তার সংকটে বন্ধ রয়েছে কলারোয়া সরকারি ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগ সেবা। উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার দিয়ে জরুরী বিভাগের সেবা চালু থাকলেও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র গুলিতেও ডাক্তার না থাকায় অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় মুখ থুবড়ে পড়েছে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা। বিপাকে পড়েছে  প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। এদিকে দীর্ঘ দিন এ ঘটনার সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ ও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উপজেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। অবিলম্বে তারা ডাক্তার সংকটের সমাধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা অবৈধ ক্লিনিক বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
কলারোয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানায়,  ৫০ শয্যা হাসপাতালে ডাক্তারের ৩৪টি পদ থাকলেও ৩০টি পদই শূন্য। বাকী ৪ জন ডাক্তারের মধ্যে দুইজন ঢাকায় অবস্থান করায় বর্তমানে কর্মরত আছে মাত্র ২ জন ডাক্তার !! এমওডিসি ডা. মেহেরুল্যাহ গত ৯ তারিখ থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং মেডিকেল অফিসার ডা.গোপাল চন্দ্র ১৪ তারিখ থেকে ঢাকায় প্রশিক্ষণে নিচ্ছেন। বর্তমানে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিকুল ইসলাম ও মেডিকেল অফিসার তন্দ্রা ঘোষ জরুরী বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ভর্তিকৃত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, হাসপাতালে জরুরী বিভাগে ডিউটি, বহির্বিভাগে ও ভর্তিকৃত রোগীদের সেবা দিতে ২জন ডাক্তারকে চব্বিশ ঘণ্টায় ডিউটি করেত হচ্ছে। একই সাথে  চার জন উপ-সহকারী মেডিকেলর অফিসার তাদের সার্বিক সহযোগিতা করছে।
এদিকে, হাসপাতালের দ্বিতীয় শ্রেণির ২৬ পদের মধ্যে ২ পদ শূন্য রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির ১২১টি পদের মধ্যে ৪০টি পদ শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির ২৫ পদের মধ্যে ৬টি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ হাসপাতালে ২০৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদের বিপরীতে ৭১টিই শূন্য।
এমন পরিস্থিতিতে দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত গর্ভবতী মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশন কার্যক্রম ডাক্তার সংকটের কারণে প্রায় ২ বছর বন্ধ রয়েছে। অযন্তে পড়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি। সরকারের  কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখাগেছে, উপজেলা সদর থেকে ১৮/২০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগী এসে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ডাক্তারের সাথে দেখা করতে পারছে না। এর ফলে অধিকাংশ রোগী বিরক্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন পৌরসদরে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা ব্যঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা বেসরকারি ক্লিনিকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলারোয়া হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী জানান, কলারোয়া সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের তীব্র সংকটের সুযোগে পার্শ্ববর্তী উপজেলা বা জেলা সদর থেকে বিভিন্ন ডাক্তার এসে বেসরকারি ক্লিনিক, নার্সিং হোম, প্যাথলজি সেন্টার এবং ফার্মেসিতে এসে প্রাকটিস করছেন। আর তাদের গলাকাটা ফিস দিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রামের অসহায় রোগীরা। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দরকারের বাড়তি ওষুধ লেখারও অভিযোগ করেন বহিরাগত এসব ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। তারা আরও জানান, হাসপাতালের নিজস্ব প্যাথলজি বিভাগ ও এক্সরে ব্যবস্থা থাকলেও ডাক্তার না থাকায় এসব বিভাগও অচল হয়ে পড়েছে। যার কারণে রোগীরা বেসরকারি প্যাথলজি সেন্টারে মোটা অংকের টাকা দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ সিজারিয়ান অপারেশন, ডেন্টাল বিভাগসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারের উন্নত মানের কয়েক কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা বলেন, হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা তিনটির মধ্যে দুটিই অচল হয়ে পড়ে আছে, বাকী একটি চালু থাকলেও চালক না থাকায় সেটিও এক বছর যাবত পড়ে আছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, গত কয়েক বছর যাবত কলারোয়া সরকারি হাসপাতালটি ডাক্তার সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে সেবা বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এবিষয়টি জেলা সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বরং বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, উপজেলার এক মাত্র ভরসা এই হাসপাতালটিতে আজ মাত্র ২জন ! ডাক্তার চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। এটাই কি আমাদের ডিজিটাল চিকিৎসাসেবা ? চালক না থাকায় হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্সগুলি বিকল হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতালে অপারেশনের সকল যন্ত্রপাতিসহ ব্যবস্থা থাকলেও ডাক্তার সংকটে গত দুই বছর অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ধ্বংস হচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ। অথচ উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিকে মোট অংকের টাকা নিয়ে বহিরাগত ডাক্তাররা সিজারিয়ান অপারেশনসহ সকল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপজেলার সাধারণ জনসাধারণ। তারা ক্ষোভের সাথে বলেন, কলারোয়া হাসপাতালে এখন চিকিৎসাসেবার জন্য কেউ যায়না। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রত্যায়ন নিয়ে থানায় মামলা করার জন্য কিছু মানুষ হাসপাতালের বেডে বসে থাকে। উপজেলার অসহায় মানুষের এক মাত্র চিকিৎসা সেবার ভরসা  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি সচল করে উন্নত সেবা প্রদানের জন্য এসব মানুষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
কলারোয়া হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাক্তার শফিকুল ইসলাম চিকিৎসা সেবার করুন অবস্থার বিষয়টি সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চাহিদার তুলনায় এত কম ডাক্তার দিয়ে হাসপাতাল চালানো পরিচালনা করা কঠিন। বর্তমানে আমরা দুই জন ডাক্তার প্রতিদিন আউট ডোর, ইনডোর, জরুরী বিভাগের চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের কি বিশ্রামের প্রয়োজন নেই ?
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামরুল ইসলাম ডাক্তার সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রশাসনিক কাজে আমাকে অধিকাংশ সময় হাসপাতালের বাইরে থাকতে হয়। তারপরও আমি হাসপাতালে রোগী দেখছি। তিনি ডাক্তার সংকট সমাধানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। তবে বহির্বিভাগে (আউটডোর) চিকিৎসাসেবা বন্ধ করার বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য না করে জরুরী মিটিং আছে বলে চলে যান এবং এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান।