কবিতা ও গানে মুক্তিযুদ্ধ

0
297

মুনসুর রহমান:
শোষকের বুলেটের আঘাতে যখন নিস্তব্ধ হয়ে প্রাণ কিংবা বাক বিমূঢ় হয়ে যায় কারাগারে শিকলে তখন শোষিতের মুখের প্রতিবাদের ভাষা জ্বলে উঠে কাব্য কবিতা আর গান। যে গানে থাকে জীবনকে বাচাঁনোর অনুপ্রেরণা আর মুক্তির আস্বাদনের সাহসিকতা। এমনি কাব্য কবিতা বাঙালী জাতির সংগ্রামের ইতিহাসের পেছনে কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে যুগ যুগ ধরে। তাই কবিতা ও গানে মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের প্রতিটি বাঙালির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য অধ্যায়। সেদিক থেকে বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বীরত্বগাথা বা মহাকাব্য রচিত হয়নি। যদিও যুদ্ধবিধ্বস্ত দুঃস্বপ্ন, সাহস ও বিক্রমের নতুন মাত্রার শিল্পিত বিবরণ, গৌরব ও আত্মদানের ফলাফল, যুদ্ধবিজয়ের বহুমুখী বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে কবিতা ও গানে। মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও গান এ দেশের কাব্যধারায় স্বতন্ত্র ও যথার্থ কণ্ঠধ্বনির আপসহীন কাব্য নিদর্শন। কবিতা ও গান গুলোয় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গ, ঐতিহাসিক ভিত্তিতে স্বকীয় সত্তায় গৌরবময় মহিয়ান হয়ে আছে। নয় মাসে জীবন ও মৃত্যুর সার্বক্ষণিক দেখা দেয় উপলব্ধিতে। শিল্প-সাহিত্যে এক নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটে চরম অভিজ্ঞতায়। তাই মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও গানে বাংলাদেশের কবিরা সমকালের সংকট ও প্রত্যয়কে শুধু তুলে ধরেন নি বাংলা কাব্য নতুন মূল্যবোধকে তুলে এনেছেন এবং স্থাপন করেছেন নতুন দিক নির্দেশনা। তাই মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও গান মুক্তির চেতনা বিকাশে হয়ে উঠেছে অনিবার্য পংক্তিমালা।

কবি জসীমউদ্দীনের ‘দগ্ধগ্রাস’ কবিতায়-
‘কী যে কী হইল পশ্চিম হতে নরঘাতকেরা আসি/সারা গাঁও ভরি আগুনে জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি।/মার কোল থেকে শিশুরে কাড়িয়া কাটিল যে খান খান/পিতার সামনে শিশুরে কাটিল করিল রক্ত স্নান।/কে কাহার তরে কাঁদিবে কোথায়, যূপকাষ্ঠের গায়/শত সহস্র পড়িল মানুষ ভীষণ খড়গ ধায়’

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বিশাল এলাকাজুড়ে। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, যুদ্ধপ্রস্তুতি, যোদ্ধার ভূমিকা, বর্বর পাক হানাদারের নৃশংসতা, নির্যাতন, আর্তনাদ, অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানসিকতা, পাক বাহিনীর দালালি, মুক্তিবাহিনীকে সমর্থন, মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ সংগ্রাম, মহান বিজয়- এসব ঐতিহাসিক দলিল চিত্র অঙ্কন করেছেন প্রবীণ-নবীন কবিরা। সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায়-

‘তুমি আমার বাতাস থেকে নাও তোমার ধুলো/তুমি বাংলা ছাড়ো’

মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ছিল অধিকভাবে। ফলে মানবাধিকার অন্বেষণ ও মানবতা প্রতিষ্ঠাই ছিল কাব্যের লক্ষ্য। কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য’ কবিতায়-

‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা/তোমাকে পাওয়ার জন্য/আর কত ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?/আর কত দেখতে হবে খাণ্ডব দাহন?’

অবরুদ্ধ দেশে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন আবেগের উচ্চারণ রয়েছে কবির হৃদয়বিদারক আকুতি ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। হুমায়ুন কবিরের কবিতা ‘কারবালা’য় গণমানুষের মানসিকতা ও মুক্তিচেতনার উপস্থাপনা একান্তভাবে এসেছে। কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে মুক্তির বাণী, যুদ্ধের কলঙ্কজনক অধ্যায়। কারবালার সেই যুদ্ধের ভয়াবহতার মুক্তিযুদ্ধকে তুলনায় এনেছে-

‘কারবালা হয়ে যায় সমস্ত বাংলাদেশ, হায়
কারবালা হয়ে যায়’

মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য শহীদ হয়েছে। হারিয়েছে স্বজন। মা হারিয়েছে সন্তান, ভাই হারিয়েছে বোন, সন্তান হারিয়েছে মা-বাবা- এ দুঃখ-পরিতাপগুলো আবুল হাসানের উচ্চারণগুলো শোকের কবিতায় প্রতিফলিত হয়-

‘তবে কি আমার ভাই আজ ওই স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন তিমিরের বেদিতে উৎসব?’

এ দেশের মুক্তিসংগ্রামে, শত্রুমুক্ত করার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারাই এ কোটি মানুষের ভরসা ও আশার আলো। হুমায়ুন আজাদ ‘মুক্তিবাহিনীর জন্য’ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রতি অগাধ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন-
‘তোমার পায়ের শব্দে বাংলাদেশে ঘনায় ফাল্গুন আর ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এই বিধ্বস্ত বাগানে এক সুরে গান গেয়ে ওঠে সাত কোটি বিপন্ন কোকিল’

মুক্তিযুদ্ধ এ ভূমির জাগ্রত অমর কাব্যের পটভূমি, যেখানে আপামর জনসাধারণের সঙ্গে এ দেশের কবিরাও তাদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অসীম সাহার কবিতায় ন্যায়যুদ্ধ, শোকগাথার চিত্র, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যুদ্ধের ভাবনা এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান গভীরভাবে ফুটে উঠেছে-

‘এই যুদ্ধ ন্যায়যুদ্ধ, সকলেই তৈরি হয়ে নাও’

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির গৌরবগাথার ইতিহাস। হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নানা অনুষঙ্গ কবিদের কবিতায় ফুটে উঠেছে। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতায় কবির স্বজন হারানোর ব্যথায় আকুতি অনুভবের প্রতিফলন ঘটে- ‘রক্তের কাফনে মোড়া-কুকুর খেয়েছে যারে শকুনে খেয়েছে সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা’

বাঙালির মুক্তির আকাঙক্ষা ও আত্ম-পরিচয়ের জাগরণ ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অত্যাচার ও মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইতিহাস কবি হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতায় উঠে এসেছে। যেমন- ‘ঝোপঝাড়, নদীনালা, ফসলের ক্ষেত…..সৈনিক, যেন সূর্যসেন, যেন স্পাটাকাস স্বয়ং সবাই ‘

বাংলা কবিতার পাশাপাশি বিশ্বকবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এসেছে ভিনদেশীয় কবিদের কবিতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি অ্যালান গ্রিন্সবার্গ ‘যশোর রোডে সেপ্টেম্বর’ শিরোনামের কবিতায় প্রকৃত চিত্র, জনদুর্ভোগের জীবনযাপন উঠে এসেছে দৃঢ় বলিষ্ঠভাবে-

‘লক্ষ লক্ষ আত্মা উনিশ শ একাত্তর/যশোর রোডে ঘরহীন উপরে সূর্য ধূসর/দশ লক্ষ মারা গেছে আর যারা পারছে/পূর্ব পাকিস্তান থেকে কলকাতার দিকে হাঁটছে।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লেখা চেতনা জাগানিয়া কবিতাগুলো প্রকাশের প্রয়োজন দেখা দিলেও কবির জীবন বিপন্ন হতে পারে এই ভাবনা, ও দ্বিধার থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখালেন মূলত উর্দুভাষী বাঙালি লেখক, সমালোচক, বুদ্ধিজীবী আবু সায়ীদ আইয়ুব। তিনি কবির ছদ্মনামে (মজলুম আবিদ) কবিতাগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন এবং কবিতাগুলো দিয়ে বন্দী শিবির থেকে কাব্য গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ ১৯৭২ সালে পুনেন্দু পত্রীর প্রচ্ছদে অর্চনা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। যেমন-স্বাধীনতা তুমি/রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান/স্বাধীনতা তুমি/পতাকা শোভিত শ্লোগান মুখর ঝাঝালো মিছিল/স্বাধীনতা তুমি/রোদেলা দুপুরে মধ্য পুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।

৭১ মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বন্ধু-শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের ‘ও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ’-এর গানে ভয়াবহতায় নিমজ্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মৃত্যুঞ্জয়ী আত্মত্যাগ ও মহিমা ফুটে উঠেছে। জর্জ হ্যারিসনের গানে-

‘হাজার হাজার সহস্রলোক/মরছে ক্ষুধায়/দেখিনি তো এমন নির্মম ক্লেশ/বাড়াবে না হাত বল ভাইসব/কর অনুভব/বাংলাদেশের মানুষগুলোকে/ও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ/এত দুর্দশা/এ যন্ত্রণার নাই কোনো শেষ/বুঝিনি তো এত নির্মম ক্লেশ’

মুক্তিযুদ্ধ ছিল জীবনের-স্বপ্নের আর রঙধনুময় আগামীর; যেখানে কোন কালোমেঘ থাকার কথা ছিল না। কিন্তু এখনো আছে, কালোমেঘের ঘণঘটা চারপাশে স্বাধীনতার এতদিন পরেও। স্বাধীনতা দিবসের কবিতা মূলত মুক্তিযুদ্ধ কথা ও দেশপ্রেমে আবেগসঞ্জাত বীররসের এক বাণীভুবন। এই ভূবনের বাসীন্দারা স্বপ্ন গেঁথে গেঁথে এগিয়ে চলছে, চলবে আগামীর আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ থেকে। সেই লক্ষ থেকেই কবি হাসান হাফিজ লিখেছেন,  কোথা হইতে আসিতেছ স্বাধীনতা তুমি?/ মানুষের আত্মার অর্গল ভেঙে/ রক্তনদী পার হয়ে/ আকাঙ্ক্ষার পতাকা উড়িয়ে/ মানুষকে শৃঙ্খলিত পদানত/  রেখে  কে আনন্দ লোটে?/ মনুষ্য নামীয় প্রাণী, অন্য কেউ নয়।/ নির্যাতিত শোষিত বঞ্চিত করে/ চরিতার্থ হয় কার মনোবৃত্তি?/ তারাও মানুষ। কলঙ্কিত ঘৃণিত প্রজাতি।/ বাংলাদেশ, তুমি এক আশ্চর্য অঙ্কুর/ লাখো শহীদের প্রাণ, নারীর সম্ভ্রম/ তার মূল্যে সঞ্জীবনী জীবন পেয়েছো/  তোমার তৃষিত সত্তা আত্মার পিপাসা/ মিটিয়েছে শোণিতের সুউষ্ণ এ পুণ্যধারা/  সেজন্যেই এতোটা মহার্ঘ তুমি…

সদ্য প্রয়াত দেশ বরেণ্য কন্ঠশিল্পী আজম খানের একটি লেখার শিরোনাম। তিনি এই লেখায় লিখেছেন, ‘এক এক রাউন্ড গুলি বেরুচ্ছে আর তার ছন্দে আমি গেয়ে চলেছি। সারাদিন বিভিন্ন অভিযান শেষে ক্লান্ত হয়ে ক্যাম্পে ফিরেছি  কেবল। ক্যাম্পে ফিরলে আমার একটা অভ্যেস গান গাইতে গাইতে ঘুমিয়ে যাওয়া। ঘুমটা ঠিক হতো না। হয়তো ১০ মিনিটের গভীর নিদ্রা। আবার আচমকা উঠে বসা। ঘুমের ভেতর নিদ্রালু চোখদুটো যেন পাকিস্তান আর্মিদের দেখত। এমনই এক ক্লান্ত ঘুমে আমি তখন। আমার পাশে এক সোলজার হঠাৎ বলছে, ‘স্যার ওরা যাইতাছে।’ কিছুক্ষণ পর আবার উচ্চারণ ‘স্যার ওদের নৌকা যাইতাছে।’

শুধুমাত্র স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নয় তারেক মাসুদ নির্মিত “মুক্তির গান” প্রমাণ্য চলচিত্রে আমরা দেখতে পাই কি করে শিল্পীরা বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন। দেশ মাতৃকাকে ভালবেসে গেয়ে উঠেছেন-
মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।
মোরা একটি হাসির জন্য যুদ্ধ করি

কবিতা ও গানে মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জাতির ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তাই এ সম্পর্কে সকলের সম্যক ধারণা রাখা উচিত। যাতে করে সেই গৌরবময় অধ্যায় থেকে ভবিষ্য প্রজন্ম নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখার অনপ্রেরণা পেতে পারে। আর এর জন্য চাই ভাষার সুন্দর ও সাবলীল উপস্থাপনের মাধ্যমে আপামর জনতার কাছে সেই ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরা।

LEAVE A REPLY