এ নিষ্টুরতা লুকাবো কীভাবে

0
120

বরুণ ব্যানার্জী: মানুষের মধ্যে যে সমস্ত মানবিক গুণাবলীর অভাব একটা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ডেকে আনে সেগুলোর মধ্যে শিশু নির্যাতন অন্যতম। শিশুরা সুন্দরের প্রতীক, পবিত্রতার প্রতীক, নিসর্গ আনন্দের উৎস। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা ও সঠিকভাবে গড়ে উঠার জন্য দরকার তার সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর আদর-ভালবাসা-যথাযথ পরিচর্যা ও সঠিক দিক নির্দেশনা। এক কথায় একটা সুস্থ পরিবেশ ও নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ দারিদ্র-পীড়িত পরিবার তাদের শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে উঠার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনা। এমনকি দারিদ্রের শতমুখী পীড়নে সন্তানের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো আহারও তুলে দিতে পারেনা। বাধ্য হয়ে তারা তাদের শিশু সন্তানকে উপার্জনমুখী কাজে লাগিয়ে দেয়। কিন্তু সেই কর্মস্থল শিশুদের জন্য কতটা নিরাপদ সেটা নিয়ে ভাবেনা কেউ। তার আগে আমাদের জানা দরকার এই শিশু কারা অর্থাৎ বয়সের কোন স্তর অবধি একজন মানুষকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের আইন অনুসারে বার বছর পার না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি মানুষ শিশু। এখন প্রশ্ন এই বয়সের একটা মানুষ কেন নির্যাতনের শিকার হবে ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেই বেরিয়ে আসবে শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন পর্যায়গুলো। অর্থাৎ কোন কোন শিশুরা নির্যতিত হচ্ছে এবং কাদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে ? পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় , এ বছরের প্রথম দেড় মাসে (১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) সারা দেশে বিভিন্নভাবে ৪৫ শিশু খুন হয়েছে। গত বছরের প্রথম দুই মাসে শিশু হত্যার সংখ্যা ছিল ৪৮। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা বলছে, চলতি বছরের প্রথম দেড় মাসে ৪২ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

অপর দুটি সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শিশুদের ধর্ষণের শিকার হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। গত বছর (২০১৬) তিন শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ওই সময়ের মোট ধর্ষণের ঘটনার প্রায় অর্ধেক। ধর্ষণের শিকার শিশুদের অর্ধেকেরই বয়স ১২ বছরের নিচে। এদের মধ্যে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুও রয়েছে।
এ ছাড়া শিশুদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও বাড়ছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। চলতি মাসে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের একটি অপহরণ চক্র ধরা পড়ার পর উদঘাটিত হয়, সাম্প্রতিক সময়ে তারা ১৭টি শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করেছে। শিশু নির্যাতনের প্রসঙ্গে বলতে গেলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে গৃহকর্ত্রী কর্তৃক গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের দৃশ্যপট। শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যাওয়া, কালসেটে দাগ. দগদগে ঘা নিয়ে গৃহকর্ত্রীর কবল থেকে কোনমতে উদ্ধার পাওয়া গৃহকর্মী শিশুদের ছবি আমরা বহুবার দেখেছি, শিহরিত হয়েছি।ওদের উপর অত্যাচারী গৃহকর্তা-গৃহকর্মীদের বিচার চেয়েছি। গৃহকর্মী শিশুদের উপর এদের অত্যাচার অনেক সময় এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে শিশুটির মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। শুধু তাই নয়। এই গৃহপরিচারিকা শিশুরা অনেক সময় গৃহকর্তার দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। অত্যন্ত লজ্জা ও পরিতাপের বিষয় এই যে, শিশু নির্যাতনকারী এসব পাষন্ডদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও ভদ্র সমাজের বাসিন্দা।  শিক্ষিত সমাজ কর্তৃক মানবাধিকার লংঘনের এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর হয়না। এসব শিশু নির্যাতনের যে ভয়াবহতা তা যে কোন সভ্য-শিক্ষিত সমাজের জন্য কলংকস্বরূপ। শিক্ষা-সংস্কৃতির দিক থেকে আমরা যতদূরই অগ্রসর হই না কেন, আমাদের সব অগ্রযাত্রা ম্লান হয়ে যায় এসব নির্যাতনের দৃশ্যপটের সামনে। আমরা চাই দেশে প্রচলিত শিশু নির্যাতনবিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হোক, বন্ধ হোক বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা। আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠুক নিরাপদে-সুস্থদেহে-সুস্থমনে-উজ্জল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে।